বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণে বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার দিক নির্দেশনা দিয়েছিলেন বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শনিবার বিকেলে ৭ মার্চের ভাষণের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি উদযাপনে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের নাগরিক সমাবেশে এ মন্তব্য করেন তিনি।

৭ মার্চের ভাষণের কথা হলে প্রথমে মায়ের কথা মনে পড়ে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ৭ মার্চে ভাষণ দেয়ার আগে মা বাবাকে শোওয়ার ঘরে ডেকে নিয়ে বলেছিলেন, তুমি ১৫ মিনিট রেস্ট নাও। তখন অনেকের কাছ থেকে অনেক রকম পরামর্শ আসছিলো। মা যখন তাকে ঘরে নিয়ে যান, তখন তার পাশে আমি ছিলাম। তিনি বলেছিলেন, এই দেশের জনগণের জন্য তুমি সারাজীবন সংগ্রাম করেছো, আন্দোলন করেছো। অনেকে অনেক কথা বলবে, কিন্তু তুমি ভাষণে সেই কথাই বলবে, যেটা তোমার মনে আসবে। তুমি ভালো জানো কী বলতে হবে। এই দেশের মানুষের ভাগ্য তোমার হাতে।

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ দীর্ঘদিন দেশে নিষিদ্ধ ছিল উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, পঁচাত্তরের পর যারা অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল শুরু করেছিল, যারা এদেশের মাটিতে জন্মগ্রহণ করেনি, পাকিস্তানের সেই প্রেতাত্মারাই বঙ্গবন্ধুর ওই ভাষণকে মুছে ফেলার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু ইতিহাস মুছে ফেলা যায় না। সেটাই আজ প্রমাণিত।’

এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘যতই মুছে ফেলার চেষ্টা করুক, ইতিহাস তার জায়গা করে নেবে। আজ ইউনেস্কোর স্বীকৃতির মাধ্যমে সেটাই প্রমাণ হয়েছে। আজ যখন ইউনেস্কো এই ভাষণকে বিশ্ব ঐতিহ্যের প্রামাণ্য দলিল হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে তখন কি তাদের লজ্জা হয় না?’

তিনি বলেন, ‘এদেশের মানুষ ২৩ বছর স্বাধীনতার ইতিহাস জানতে পারে নাই। প্রজন্মের পর প্রজন্ম এটা জানতে পারে নাই— এর চেয়ে দুর্ভাগ্যের আর কিছু হয় না।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘এখানে দাঁড়িয়ে আমার সেই দিনটির কথা মনে পড়ে, যেদিন এই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দাঁড়িয়ে জাতির পিতা ৭ মার্চের ভাষণ দিয়েছিলেন। এখানে দাঁড়িয়েই তিনি বলেছিলেন— এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

তিনি বলেন, ৭ মার্চের ভাষণে জাতির পিতা সমগ্র বাংলাদেশের জনগণের ২৩ বছরের বঞ্চনা, শোষণ, নিপীড়নের কথা বলেছিলেন। সেই ভাষণের মধ্য দিয়ে তিনি একটি জাতিকে স্বাধীনতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ করেছিলেন।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইসিহাস বিকৃতিকারীদের বিষয়ে দেশবাসীকে জাগ্রত হওয়ার আহবান জানিয়ে বলেছেন, পাকিস্তানের প্রেতাত্মা, পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর পদলেহনকারী, তোষামোদকারীরা যাতে ইতিহাস বিকৃত করার আর সুযোগ না পায় সেজন্য সমগ্র দেশবাসীকে জাগ্রত হতে হবে।

তিনি বলেন, স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তি ক্ষমতায় থাকলে দেশের, মানুষের যে উন্নতি হয় তা আমরা প্রমাণ করেছি। ২১বছর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরেই এদেশের মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে। যে দেশের মানুষকে ভিক্ষার ঝুলি দিয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হতো। এখন আর ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে ঘুরতে হয় না। এখন আমরা বাজেটের ৯৮ ভাগ নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়ন করতে পারি।

প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বলেন, যারা সারা জীবন বাঙালিকে একেবারে রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে বঞ্চিত করে রেখেছিল। তারা পরাজিত শক্তি। আর আমরা হচ্ছি মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী শক্তি। বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক মুক্তি নিয়ে আসতে। আমরা সেই অর্জনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।

প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উন্নত সমৃদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিজ্ঞা করেন। সমাবেশে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে সভাপতিত্ব করছেন অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের সভাপতিত্বে নাগরিক কমিটির ব্যানারে আয়োজিত সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও বক্তৃতা করেন পাঁচ বিশিষ্ট নাগরিক— অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম, অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবাল, সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ার, শহীদজায়া শ্যামলী নাসরীন চৌধুরী এবং বাংলাদেশে ইউনেস্কোর কান্ট্রি ডিরেক্টর বিট্রিস কালদুল।

সমাবেশে ধন্যবাদ জানিয়ে বক্তব্য দেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। পরে ইউনেস্কোর প্রতিনিধির হাতে একটি ধন্যবাদ স্মারকও তুলে দেওয়া হয়।

নাট্যব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার ও শহীদ বুদ্ধিজীবী ডা. আবদুল আলীম চৌধুরীর মেয়ে ডা. নুজহাত চৌধুরীল সঞ্চালনায় আয়োজনে বক্তব্যের ফাঁকে-ফাঁকে ছিল সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। সেখানে আবৃত্তি করেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর ও কবি নির্মলেন্দু গুণ। একক সঙ্গীতায়োজনে দেশের বিশিষ্ট শিল্পীদের মধ্যে সাজেদ আকবর, শাহীন সামাদ ও চন্দনা মজুমদার সঙ্গীত পরিবেশন করেন।

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here