রাজীব নুর

মৃত মায়ের বুকের দুধ খাওয়ার চেষ্টা করছিল যে শিশুটি, খুলনার চুকনগর গণহত্যায় বেঁচে যাওয়া সেই শিশুটিই আজকের সুন্দরী দাসী এবং গণমাধ্যমে বারবার আসায় তার কথা আমাদের অনেকেরই জানা আছে। তানভীর মোকাম্মেলের ‘জীবনঢুলী’ চলচ্চিত্রে চুকনগর গণহত্যার দৃশ্যে অভিনয়ও করেছেন তিনি। সুন্দরীর ভালো নাম রাজকুমারী। নামটি রেখেছিলেন তার পালক মা-বাবা মান্দার দাস ও মালঞ্চ দাসী। রাজকুমারী ওরফে সুন্দরী যেন চুকনগর গণহত্যার প্রতীক হয়ে বেঁচে আছেন।

মুক্তিযুদ্ধের আরও অনেক নাম না জানা শহীদের মতো অজানা রয়ে গেছে সুন্দরীর মা-বাবার নাম। তারা কোথা থেকে এসেছিলেন তাও জানা নেই। তবে সীমান্ত অতিক্রম করে যে তারা ভারতে যেতে চেয়েছিলেন, সেটা নিশ্চিত। ভারতীয় সীমান্তের খুব কাছে হওয়ায় মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিভিন্ন স্থান থেকে লোকজন সীমান্ত অতিক্রমের জন্য চুকনগর বাজারে এসে জড়ো হতো বলে জানালেন চুকনগর কলেজের অধ্যক্ষ এবিএম শফিকুল ইসলাম। সেদিনের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী এবং চুকনগর গণহত্যা ‘৭১ স্মৃতি রক্ষা পরিষদের সভাপতিও তিনি।

ভদ্রা, কাজীবাছা, খড়িয়া, ঘ্যাংরাইল প্রভৃতি নদীপথে এবং কাঁচা রাস্তায় দাকোপ, বটিয়াঘাটা, রামপাল, তেরখাদা ও ফকিরহাট উপজেলা থেকে খুলনা-ডুমুরিয়া হয়ে চুকনগর ছিল সে সময়কার বিবেচনায় ভারতমুখী সবচেয়ে নিরাপদ পথ। অধ্যক্ষ এবিএম শফিকুল ইসলাম বলেন, ১৯৭১ সালের মে মাসের তৃতীয় সপ্তাহে আশপাশের সব এলাকা প্রায় একযোগে আক্রান্ত হওয়ায় লোকজন চলে যেতে থাকে শরণার্থী শিবিরের দিকে। ২০ মে ভারতে যাওয়ার জন্য চুকনগরে হাজার হাজার মানুষ অপেক্ষমাণ ছিল। খবর পেয়ে সাতক্ষীরা থেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দুটি দল ট্রাক ও জিপে করে বেলা ১১টার দিকে চুকনগরে আসে। পাতখোলা বিল থেকে তারা গুলি চালাতে শুরু করে এবং পরে চুকনগর বাজারের দিকে অগ্রসর হয়। বিকেল ৩টা পর্যন্ত গুলি চালিয়ে কমপক্ষে ১০ হাজার মানুষকে হত্যা করে তারা।

চুকনগর বাজারের পাশে পাতখোলার বিলে নিজের ফসলের ক্ষেতে কাজ করছিলেন দরিদ্র কৃষক চিকন আলী মোড়ল। সেনাবাহিনীর গাড়ি দেখে হাতের কাস্তে উঁচিয়ে নিজের ক্ষোভ জানাতে চেয়েছিলেন হয়তো। কিন্তু মুহূর্তেই গুলি খেয়ে লুটিয়ে পড়েন। চুকনগর গণহত্যার প্রথম শহীদ হলেন চিকন আলী মোড়ল। গণহত্যা চালিয়ে পাকিস্তানি সেনারা চুকনগর ছেড়ে চলে গেলে চিকন আলীর ছেলে এরশাদ আলী মোড়ল হাজারো লাশের ভিড়ে নিজের বাবাকে খুঁজে পান। অদূরে শুনতে পান একটি শিশুর কান্না। কাছে গিয়ে দেখেন, মৃত মায়ের দুধ খাওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করছে ছয় মাসের একটি কন্যাশিশু। এরশাদ নিজের বাবার মৃত্যুশোক ভুলে পরম স্নেহে কোলে তুলে নেন শিশুটিকে।

এরশাদ আলী মোড়ল এখন অশীতিপর বৃদ্ধ। বছর দুয়েক আগে চুকনগর গণহত্যা স্মৃতিসৌধ পরিদর্শনের সময় শরণার্থী শিবিরের পথে গণহত্যার শিকার মানুষদের প্রত্যক্ষদর্শী এরশাদ আলী মোড়লের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। এরশাদ বলছিলেন, দুগ্ধপোষ্য শিশুটিকে হয়তো নিজেই লালন-পালন করতেন। কিন্তু ওই দিন শিশুটিকে কোলে নিয়ে ফেরার পথে ওর মায়ের কপালে সিঁদুর ও হাতে শাঁখা দেখতে পেয়েছিলেন তিনি। তাই নিজে না রেখে শিশুটিকে তুলে দিয়েছিলেন মান্দার দাসের কাছে।

২০ মে বেলা ১১টার দিকে হামলা হয়। হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে সকাল ৮টার দিকে চুকনগর ছেড়ে গিয়েছিলেন আবৃত্তিশিল্পী ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়দের পরিবার। ভাস্বরের বড় বোন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী দীপা বন্দ্যোপাধ্যায় ‘খুলনা একাত্তর :আমার মুক্তিযুদ্ধ’ বইয়ে লিখেছেন সেই কথা। তার ওই বইয়ে পাওয়া যায় পলায়নপর মানুষের পথচলার বিবরণ- ‘পথ হারাবার ভয় নেই, মানুষের মিছিল যে পথে চলেছে তাকে অনুসরণ করলেই হলো। দুজনকে বহন করতে হচ্ছে, বয়সের ভারে অর্ধমৃত মৃণালের ঠাকুমা আর শরীরের ভারে হাঁটতে অসমর্থ বাবুলাল মাড়োয়ারি। তাঁদের ডোলার মতো বাঁশে ঝুলিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। একজন কিছুই বুঝতে পারছেন না, বেঁচে থাকার বোধটুকুও তাঁর লোপ পেয়েছে, পথের মধ্যেই তিনি মারা গেলেন। কিছুক্ষণের জন্য আমরা থেমে দাঁড়ালাম। পথ থেকে সরে গিয়ে একটু দূরে তাঁর মৃতদেহ রেখে আবার পথচলা শুরু হলো। শোকের সময় নেই। এ রকম কত মৃতদেহ একাত্তরে সৎকার হয়নি, শিয়াল-কুকুরের খাদ্য হয়েছে, তার সঠিক হিসাব কোনো দিনই হয়তো পাওয়া যাবে না।’ চুকনগর গণহত্যা থেকে অল্পের জন্য বেঁচে যাওয়ার বর্ণনা দিয়ে দীপা বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, ‘২০ মে সকাল আটটার মধ্যে তাড়াহুড়ো করে বাসে না উঠলে পৈশাচিক এক বর্বরতার সাক্ষী হতে হতো, এমনও হতে পারত অসংখ্য লাশের স্তূপের মধ্যে আমাদের প্রাণহীন দেহও হয়তো পড়ে থাকত। দেখিনি, তাই সে দৃশ্যের বর্ণনা দিতে যাব না। যতটুকু শুনেছি, পড়েছি, তা থেকেই তার ভয়াবহতা কল্পনা করে নিতে পারি। চুকনগর গণহত্যা খুলনা অঞ্চলের সব থেকে বড় গণহত্যা।’

‘শুধু খুলনা অঞ্চলেই নয়, মুক্তিযুদ্ধের সময় আর কোথাও চুকনগরের মতো একসঙ্গে এত বড় নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ ঘটেনি’ বলে জানালেন ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির সভাপতি ডা. এমএ হাসান। তিনি বলেন, ‘নিহতের সংখ্যার দিক থেকে দ্বিতীয় হবে চট্টগ্রামের ফয়’স লেক।’ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি, লেখক ও গবেষক মফিদুল হক বলেন, ‘২৬ মার্চের পর যে গণহত্যা শুরু হয়, তা দেখে আতঙ্কিত মানুষ আশ্রয়ের খুঁজে ভারতে যাওয়া শুরু করেছিল। পাকিস্তানি সেনারা যত বেশি গ্রামাঞ্চলে প্রবেশ করতে থাকে, ততই মানুষ পালাতে থাকে শরণার্থী শিবিরের দিকে। পলায়নপর এই সব মানুষকে সর্বত্রই হত্যা করার চেষ্টা করা হয়েছে, সংখ্যায় চুকনগরের সমান না হলেও জয়পুরহাটের পাগলা দেওয়ান এবং রংপুরের ঝাড়ূয়ার বিলেও ঘটানো হয়েছিল ব্যাপক হত্যাকাণ্ড।’

নওগাঁ অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধ গবেষক অধ্যাপক আতাউল হক সিদ্দিকী বলেন, ‘পাগলা দেওয়ান প্রশাসনিকভাবে জয়পুরহাটের একটি এলাকা হলেও নওগাঁর পত্নীতলা থেকে দূরত্ব খুব বেশি নয়। পাগলা দেওয়ান ছিল শরণার্থীদের সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার একটি সহজ পথ। সেখানে কয়েক দফায় শরণার্থীদের হত্যা করা হয়েছিল এবং সব মিলিয়ে নিহতের সংখ্যা হাজার দশেক হবে। তবে ভারতে যাওয়ার পথে এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে আরও অনেক জায়গা পলায়নপর মানুষের ওপর নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়। নওগাঁয় পাকিস্তানি সেনারা এসেছিল ২২ এপ্রিল। এর পরই যত্রতত্র হত্যাযজ্ঞ ও অগ্নিসংযোগ করে। মানুষ প্রাণভয়ে পালাতে শুরু করে। পলায়নপর ওই মানুষগুলোর মধ্যে মাহদেবপুরের দেবীপুর মাঠে ১২ থেকে ১৪ জন, মান্দার মৈনমে ১৫ জন, পত্নীতলার মল্লিকপুর হাই স্কুলে একই পরিবারের ছয়-সাতজন এবং মহাদেবপুরের মহিষবাথান হাটে ৩০ জনকে হত্যা করা হয়। মহিষবাথান হাটে নিহতদের মধ্যে অবশ্য ভারতে পলায়নপর শরণার্থীদের সঙ্গে হাটবার থাকায় বাজার-সদাই করতে আসা লোকজনও ছিল।’

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরে ১৭ জুলাই শ দেড়েক মানুষকে বহন করা দুটি লঞ্চ আটক করা হয়েছিল বলে জানালেন মুক্তিযুদ্ধ গবেষক ও সাহিত্য একাডেমির সভাপতি জয়দুল হোসেন। তিনি এই তথ্য পেয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধা ডা. মতিউর রহমানের কাছ থেকে। জয়দুল হোসেন বলেন, ‘লঞ্চ দুটি ঢাকা অথবা বিক্রমপুর থেকে এসেছিল। তিতাস নদী দিয়ে হয়তো আশুগঞ্জে যাওয়াই ছিল তাদের উদ্দেশ্য। সেখান থেকে হয়তো তারা আখাউড়া কিংবা কসবা দিয়ে ত্রিপুরা যেতে চেয়েছিলেন। শ দেড়েক মানুষের বেশির ভাগই ছিল নারী। নারীদের ধরে নিয়ে গিয়ে কী করা হয়েছিল, তা জানা যায়নি। তবে পুরুষদের সবাইকে পরের দিন ১৮ জুলাই পাশের জেলা কুমিল্লার হোমনায় নিয়ে হত্যা করা হয়েছিল।’ মুক্তিযোদ্ধা মতিলাল বণিক জানান, ত্রিপুরার একেবারে কাছে পৌঁছে যাওয়ার পরও কসবার চণ্ডীদ্বারে ধরা পড়ে গিয়েছিল ৭২ জনের একটি শরণার্থী দল এবং তাদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। এ ছাড়া উজানিসার সেতুর কাছে মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময় পাকিস্তানিরা চালিয়েছিল ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ। উজানিসার ছিল ভারতে যাওয়ার সহজ রাস্তার একটি।

পলায়নোদ্যতদের হত্যা করে শরণার্থী সমস্যা ঠেকানোর চেষ্টা করা হয়েছিল বলে মনে করেন ড. দিব্যদ্যুতি সরকার। এখন পর্যন্ত একাত্তরের শরণার্থীদের নিয়ে একমাত্র পিএইচডি করেছেন নোয়াখালী বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষক। তার বিষয় ছিল ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে শরণার্থী সমস্যা :প্রেক্ষাপট, ব্যবস্থাপনা ও ভূরাজনীতি’। ড. দিব্যদ্যুতি সরকার বলেন, ‘শরণার্থী সমস্যা উদ্ভবের আগ পর্যন্ত বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম ছিল মূলত একটি জাতীয়তাবাদী সংগ্রাম। এর একপক্ষে ছিল পাকিস্তানি সামরিক-অসামরিক রাষ্ট্রযন্ত্র এবং অন্যপক্ষে পূর্ববঙ্গের স্বাধীনতাকামী জনতা। শরণার্থী সমস্যার উদ্ভব না হলে এই দুই পক্ষের বাইরে অন্য কোনো রাষ্ট্র বা শক্তির পক্ষে এতে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিত তৈরি হতো না এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ আন্তর্জাতিক মহলে নিতান্তই পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সমস্যা হিসেবে মূল্যায়িত হতে পারত।’

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here