গভীর ক্ষত আর স্বজন হারানোর বেদনা নিয়ে নেপাল থেকে দেশে ফিরেছেন আরও বিমানযাত্রী। তারা হলেন গাজীপুরের ব্যবসায়ী মেহেদী হাসান, তার স্ত্রী সাঈদা কামরুন্নাহার স্বর্ণা এবং মেহেদীর ফুপাতো ভাইয়ের স্ত্রী আলমুন নাহার অ্যানী। গতকাল শুক্রবার বিকালে বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটে করে তারা ঢাকা পৌঁছেন। এর মধ্যে অ্যানী বিমান দুর্ঘটনায় তার স্বামী ও শিশুকন্যাকে হারিয়েছেন।

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর মেহেদী, স্বর্ণা আর অ্যানীকে রিসিভ করেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। পরে তাদের অ্যাম্বুলেন্সে করে সরাসরি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নিয়ে বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, অ্যানী, মেহেদী আর স্বর্ণাকে আরও ছয় সপ্তাহ হাসপাতালে থাকতে হতে পারে।

ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেন, প্রয়োজনীয় চিকিৎসার জন্য আহত তিনজনকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। যারা মারা গেছেন, তাদের ডিএনএ টেস্ট করা হচ্ছে। এর পরই মরদেহগুলো দেশে নিয়ে আসা হবে। এ ছাড়া ইউএস-বাংলা বলেছে, আহতদের চিকিৎসার সব খরচ তারা বহন করবে। তবে এর বাইরে যদি কাউকে সহায়তা দিতে হয় আমাদের প্রধানমন্ত্রী দেবেন।

এর আগে আহত রিজওয়ানুল হককে সিঙ্গাপুরে ও শাহরিন আহমেদকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়। শাহরিন এখন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন। আহত বাকি যে পাঁচ বাংলাদেশি নেপালে আছেন, তাদের মধ্যে চারজন কেএমসিতে ও আরেকজন নরডিক হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক এএইচএম এনায়েত হোসেন জানান, নেপালে বেঁচে যাওয়া ১০ বাংলাদেশির মধ্যে শেখ রাশেদ রুবাইয়াত, কবির হোসেন ও মো. শাহীন বেপারিও রবিবার দেশে ফিরবেন।

গতকাল ফেরা তিনজনকে হাসপাতালে ভর্তির পর এক সংবাদ সম্মেলনে বার্ন ইউনিটের সমন্বয়ক সামন্ত লাল সেন বলেন, মেহেদীর ঘাড়ের কশেরুকায় ফ্র্যাকচার হয়েছে। আর অ্যানির ফ্র্যাকচার ডান পায়ে। স্বর্ণার কোমরের বাঁ দিকে ব্যথা আছে, সেটা এক্সরে করে দেখতে হবে। তবে কারো বড় ধরনের ‘বার্ন ইনজুরি’ নেই। তার পরও তাদের শঙ্কামুক্ত বলা যাবে না। কারণ শ্বাসতন্ত্রের ইনজুরি রয়েছে। এ ধরনের রোগীদের কোনোভাবেই শঙ্কামুক্ত বলা যায় না। জেনারেলি তাদের অবস্থা স্টেবল বলা যায়।

নেপাল বিমান দুর্ঘটনায় আহত সবার চিকিৎসার জন্য একটি মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করার কথা জানিয়ে সামন্ত লাল বলেন, এ বোর্ড রবিবার দেখে সিদ্ধান্ত জানাবে। শাহরিনসহ গতকাল আনা আহত তিনজনকে ঢামেক হাসপাতালের ভিআইপি ১ ও ২ নম্বর কেবিনে রাখা হয়েছে। এদের প্রত্যেকেই সাইকোলোজিক্যাল ট্রমার মধ্যে আছে। এদের কোনো পোড়া না থাকলেও যেহেতু আঘাত আছে এবং শ্বাসনালির ইনজুরি আছে সেহেতু অর্থোপেডিকস এবং রেসপিরেটরি মেডিসিনের চিকিৎসকদের দেখানো হবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রসঙ্গ টেনে ড. সামন্ত লাল সেন বলেন, প্রধানমন্ত্রী শুক্রবার দুপুরে আবারও ফোন করে বলেছেনÑ এই রোগীদের জন্য যা যা করা দরকার সবকিছুই যেন করা হয়। এ জন্য সরকার সার্বিক সহযোগিতা দেবে বলেও জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

এদিকে অ্যানী, মেহেদী ও তার স্ত্রী স্বর্ণা দেশে ফিরলেও নেপালে পড়ে আছে অ্যানীর স্বামী ফারুক আহাম্মদ প্রিয়ক ও তাদের শিশুকন্যা প্রিয়সী প্রিয়কের মরদেহ। চার দিনের জন্য প্রিয় স্বামী-সন্তানকে নিয়ে হিমালয়কন্যা নেপাল ঘুরতে গিয়েছিলেন তারা। ব্যবসায়ী মেহেদী আর আলোকচিত্রী প্রিয়ক সম্পর্কে মামাতো-ফুপাতো ভাই। তাদের বাড়ি গাজীপুরের শ্রীপুরের নগর হাওলা গ্রামে। মেহেদীর বাবা তোফাজ্জেল হোসেন বলেন, দুই পরিবারের পাঁচজন মিলে গত ১২ মার্চ ইউএস-বাংলার ফ্লাইট বিএস২১১ তে নেপাল যাচ্ছিলেন। কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিমানবন্দরে অবতরণের সময় উড়োজাহাজটি বিধ্বস্ত হলে ৫১ জনের মৃত্যু হয়। দুর্ঘটনার পর উড়োজাহাজটিতে আগুন ধরে যাওয়ায় অধিকাংশ মরদেহ পুড়ে বিকৃত হয়ে গেছে। নেপালের মর্গে প্রিয়ক বা তার মেয়ের লাশ দেখার সুযোগ হয়নি স্বজনদের। দুর্ঘটনার দিন সন্ধ্যা ৭টায় মেহেদীই নেপাল থেকে ফোন করে খবরটা দেয়। ওরা বেঁচে গেছে। কিন্তু প্রিয়কের মা এখন পাগলপ্রায়। মরদেহ কবে আসবে, এ নিয়ে স্বজনদের মধ্যে চরম উৎকণ্ঠা।

প্রিয়কের চাচাতো ভাই লুৎফুর রহমান বলেন, পাঁচ দিনের সফর শেষ করে শুক্রবার তাদের দেশে ফিরে আসার কথাছিল। কিন্তু এক ভাই মেহেদী এবং দুই ভাবি অ্যানী ও স্বর্ণা ফিরলেও ফিরে আসেনি প্রিয়ক ও তার কন্যা প্রিয়সী প্রিয়ক। এখন আমরা তাদের মরদেহের অপেক্ষায় প্রহর গুনছি।

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here