পুঁজিবাদ একটা পদ্ধতি যা মানুষের দ্বারা উদ্ভাবিত এবং খোদা প্রদত্ত নয়। আর আপনি যখন পুঁজিবাদকে আপনার আর্থ-রাজনৈতিক জীবনধারা হিসেবে মেনে নিচ্ছেন, পুঁজিবাদের মধ্যে খুঁজে পাচ্ছেন জীবনপথের দিশা, পুঁজিবাদই যখন হয়ে দাঁড়াচ্ছে আপনার ভূত ও ভবিষ্যৎ- তখন এই পুঁজিবাদ নিছকই একটা পদ্ধতি থাকছে না, হয়ে উঠছে দেবতাতুল্য, কিংবা দেবতাই, এবং পরম পুজনীয়। বিশ্বের বর্তমান ক্ষমতাধর রাজনীতিওয়ালারা তো বটেই, সাধারণ অনেকেই বিশ্বাস করেছেন পুঁজিবাদই মানবজাতির মুক্তির পথ। বেশ, আমরাও মেনে নিয়েছি বিনা প্রশ্নে। কিন্তু আমরা ভুলে গেছি পুঁজিবাদেরও একটা বিন্দু আছে। সবকিছুরই একটা সর্বোচ্চ বিন্দু আছে। ওই বিন্দুতে পৌঁছানোর পর আর এগোনোর জায়গা থাকে না। আমরা নিশ্চয় বলতে পারি না যে, বাংলাদেশের পুঁজিবাদ তার সর্বোচ্চ বিন্দুতে পৌঁছে গেছে। তার মানে, আমাদের এগিয়ে যাওয়ার জায়গা আছে। কিন্তু আমাদের পুঁজিবাদ এগোচ্ছে কোন পথে? সমস্ত বাস্তবতা থেকে এ নিয়ে আমাদের সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। আমাদের এই পুঁজিবাদ ইউরোপীয় প্রভু-পুঁজিবাদের দাস-পুঁজিবাদ। সুতরাং এর কোনও স্বাধীন পথ নেই। তাহলে যে পথে চলেছে আমাদের পুঁজিবাদ সেটাকে মানসম্পন্ন বলা যাবে না।

নিম্নমানের জিনিস কেমন হয় তা সবাই জানেন। ফলে এখান থেকে আমাদের জীবনধারা, রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে ভাল কিছু না হয়ে খারাপটাই হচ্ছে বেশি। খারাপের ছড়াছড়ি। বিষফোঁড়ার মত ঠেলে উঠছে একেবারে। আর এই নিম্নমানের পুঁজিবাদ থেকে উৎপত্তি ঘটেছে মাফিয়াতন্ত্রের। আমাদের সমাজ, রাষ্ট্র সবই এখন মাফিয়াতন্ত্রের কব্জায়। রন্ধ্রে রন্ধ্রে অনুপ্রবিষ্ট ও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এই মাফিয়াতন্ত্র। আমাদের অবশ্যই প্রশ্ন করা উচিত- কারা প্রতিষ্ঠা করল? উত্তর আমাদের অজানা নয় আর তা বাতাসেও ভেসে যাচ্ছে না। সাহস থাকলে আমরা স্পষ্ট বলতে পারি- এ দেশে মাফিয়াতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছে মাদক-ব্যবসায়ী, চোরাচালানী, গডফাদার-মার্কা লোকেরা। অবশ্যই কক্সবাজারের অমুক কিংবা যশোরের তমুকের মধ্যে আমরা তাদের স্পষ্ট চেহারা দেখতে পাই।

আফ্রিকার দেশ সোমালিয়া অনেক দেশের উদাহরণ হতে পারে বিশ্বের দরবারে। সেটা দাস-পুঁজিবাদের ফলাফলে গড়ে ওঠা এক ভয়ঙ্কর মাফিয়াতন্ত্রের কঠিন উদাহরণ। তার সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া যাবে এ ধরনের অনেক দেশের। সেখানে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঢুকে পড়েছে অসীম দুর্নীতিবাজ, মাদক-ব্যবসায়ী, সবধরনের চোরাচালানী আর গডফাদার-মার্কা লোকেরা, এমপি-মন্ত্রী হয়েছে। দলে এদের মত লোকের সংখ্যা বেড়েছে। এমন নয় যে পুঁজিবাদী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ভালমানুষ নেই, দেশপ্রেমিক নেই। নিশ্চয় আছে। কিন্তু তারা দলের মধ্যে সংখ্যালঘু এবং কোণঠাশা। দলে আধিপত্য মাদক-ব্যবসায়ী, চোরাকারবারিদেরই। ফলটা হয়েছে এই- সোমালিয়ায় রাজনৈতিক দলগুলোই এখন মাফিয়াতন্ত্রের ধারক-বাহক। একজন মাদক-ব্যবসায়ী, একজন দুর্বৃত্ত, একজন দখলবাজ, একজন অর্থপাচারকারী, একজন কালোবাজারী, একজন অস্ত্রবাজ, একজন লম্পট যখন এমপি-মন্ত্রী হয়, যখন রাষ্ট্রযন্ত্রের মালিক হয়ে যায়, তখনই প্রতিষ্ঠিত হয় মাফিয়াতন্ত্র। আমরা সোমালিয়ার এই এমপি-মন্ত্রীদের কাছ থেকে কী আশা করতে পারি?

অপরাধী-দুষ্কৃতীরা আগে সত মানুষদের ভয় পেত, তাদের দেখলে পালিয়ে যেত; আর এখন হয়েছে উল্টোটা- অপরাধীরা বুক ফুলিয়ে প্রকাশ্যে ঘোরে, ভালমানুষেরা ভয়ে পালায়। সম্পূর্ণ বিপরীত। এমন অবস্থার সৃষ্টি হয় রাজনৈতিক মাফিয়াতন্ত্রের কারণে। মাকড়শার জালের মত এতে আটকা পড়ে রাষ্ট্রযন্ত্র। এ অবস্থায় কায়েম হয় পেশীশক্তির রাজত্ব। আমরা বিভিন্ন দেশে তার জলজ্যান্ত দৃষ্টান্ত দেখতে পাই। ভারতের বর্তমান শাসক দল তারই বীভৎস নমুনা।

মোদ্দা বিষয়টা দাঁড়ায়, দেশ আর দেশবাসীর সেবা করবে যে রাজনীতি আর রাজনৈতিক দল তার হদিস পাওয়া দুষ্কর হয়ে ওঠে। পরিস্থিতি নিচের দিকে নেমে যায়। হয়তো সেজন্যই সৎ, দেশপ্রেমিক, রুচিশীল, শিক্ষিত মানুষেরা কেউ রাজনীতিতে যুক্ত হতেই রাজি হন না। তাহলে সোমালিয়ার মত দেশগুলোয় নষ্ট লোকেরা রাজনীতি করবে আর জনগণ তাদের কাছে জিম্মি হয়ে থাকবে?

লেখক : অনুবাদক, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক।

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here