কোনো ট্রফিতে বড় দলকে হারিয়ে বাংলাদেশ ফাইনালে গেলেই মাথা খারাপ হয়ে যায় ভারতীয় মিডিয়াগুলোর। আর যদি সেই ফাইনালে টাইগারদের প্রতিপক্ষ হয় ভারত, তাহলে তো আর কথাই নেই। সাকিবদের নিয়ে নোংরামির চূড়ান্ত সীমায় গিয়ে পৌঁছায় তাদের সাংবাদিকরা। ভাবখানা এমন যে ক্রিকেট তাদের বাব-দাদার সম্পত্তি, বাংলাদেশ এ খেলা বুঝেই না, তাদের কৃপায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্থান পেয়েছি।

বাংলাদেশকে নিয়ে বিশ্বের সেরা ক্রিকেটাররা প্রশংসায় হয়েছেন পঞ্চমুখ। সবাই বলছেন, বড় দলের মতোই এখন ঘুরে দাঁড়াতে পারে টাইগাররা। তাদের আর ছোট করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। যোগ্য দল হিসেবেই ফাইনালে উঠেছে। আজ সন্ধ্যা গড়ালেই নিদাহাস ট্রফির ফাইনাল। বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ সেই ভারত। কিন্তু শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে টাইগারদের ফাইনালে উঠাটাকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না ভারতীয়রা। তাই তো দেশটির প্রভাবশালী মিডিয়া গ্রুপ আজতাকের সহযোগী সংবাদ মাধ্যম লালানটপে সাকিবদের নিয়ে বাজে প্রতিবেদন করা হয়।

প্রতিবেদক কেতন বুকর‌্যাতের হিন্দি প্রতিবেদনটি বাংলায় হুবহু তুলে ধরা হলো-

শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের ম্যাচ অঘোষিত সেমিফাইনাল। যে জিতবে ভারতের সঙ্গে ফাইনাল খেলবে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ। লঙ্কানরা প্রথম ব্যাট করে ১৫৯ রান তুলে। বাংলাদেশের বোলারদের আটসাট বোলিংয়ে শ্রীলঙ্কা তেমন হাত খুলে খেলতে পারেনি। জবাবে টাইগার ওপেনার তামিম একপ্রান্ত আগলে রেখে ব্যাট করে যান। অপরপ্রান্ত থেকে নিয়মিতভাবে উইকেট পড়তে থাকে। তামিম ৪২ বলে ৫০ রান করেন এবং জয়ের ভীত গড়তে থাকেন। কিন্তু তাকে যোগ্য সঙ্গ কেউ দিতে পারেননি। তামিমের আউট হয়ে যাওয়ার পরই ব্যাটিংয়ে আসেন মাহমুদুল্লাহ। তিনি কোনোকিছু না দেখেই মারতে শুরু করেন। অপর প্রান্তে একটা যায় তো আরেকটা আসে। মাহমুদুল্লাহ ১৮ বলে আক্রমণাত্মক ৪৩ রান করে এক বল বাকি থাকতেই দলকে জয়ের বন্দরে পৌঁছে দেন।

কিন্তু এরই মধ্যে সেই সব ঘটনা ঘটে যায়, যা ক্রিকেট মাঠে মোটেও শোভনীয় নয়। যদিও সেখানে যারা খেলছিল তারা মানুষই ছিল, আবেগের ঊর্ধ্বে নয়। শেষ ওভারে বাংলাদেদেশের জেতার জন্য ১২ রানের দরকার ছিল। বল তুলে দেওয়া হয় পেসার ইসুরু উদানার হাতে। প্রথম বল খাটো লেন্থের ছিল, মোস্তকাফিজুর রহমান পুল করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন এবং বল কিপারের গ্লাভসবন্দি হয়। ক্যাচ আউটের আপিল হয়, যা আম্পেয়ার নাকচ করে দেন। শ্রীলঙ্কা রিভিউ নিলে সেটিও নাকচ হয়ে যায়।

দ্বিতীয় বলটিও খাটো লেন্থর দেওয়া হয়, এবারও ব্যর্থ মোস্তাফিজ। উল্টো তিনি রান আউট হয়ে যান। তবে নো বলের আবেদন করলেও আম্পেয়ার দেননি। মোস্তাফিজুর যখন প্যাভেলিয়নে ফিরত যাচ্ছিলেন তখন মাহমুদুল্লাহর জন্য পানি নিয়ে মাঠে ঢুকেন দ্বাদশ খেলোয়াড় নুরুল হাসান সোহান। তিনি শ্রীলঙ্কান খেলোয়াড়দের কিছু একটা বলেন এবং বাকবিতণ্ডায় জড়ান। অন্যদিকে বাংলাদেশের অধিনায়ক উত্তেজিত হয়ে প্যাভেলিয়ন ছেড়ে বাইরে আসেন। সেই সঙ্গে নো বল না দেওয়ায় চরম অসন্তুষ্টি প্রকাশ করতে থাকেন। তার হিসাবে বল কাঁধের উপরে ছিল। তিনি আচমকা ব্যাটসম্যানদেরকে মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে আসতে বলতে থাকেন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। আম্পায়াররা বিষয়টি ঠাণ্ডা করার চেষ্টা করলেও বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা বাউন্ডারি লাইনের পাশে দাঁড়িয়ে থাকেন। এ সময় দলের ম্যানেজার খালেদ মাহমুদ ব্যাটসম্যান মাহমুদুল্লাহকে বোঝান এবং ব্যাটিংয়ে পাঠান। খেলা আবার শুরু হয়। তখন চার বলে দরকার ছিল ১২ রান। মাহমুদুল্লাহ পরের তিন বলেই সে রান তুলে জয় নিশ্চত করার সাথে সাথেই পুরো বাংলাদেশ মাঠের ভিতর লাফালাফি এবং নাগিন ড্যান্স শুরু করে। আসলে শ্রীলঙ্কাকে এর মাধ্যমে ক্ষেপানো হচ্ছিল।

তাদের নাচে দেখা যাচ্ছিল স্পষ্ট অহঙ্কার ও বেয়াদবী। এর পরও মাঠে ছোটখাট বেশকিছু বাকবিতণ্ডা হয়ে যায়। আবার সেই দ্বাদশ খেলোয়াড়ই (সোহান) শ্রীলঙ্কা দলের মাঝখানে গিয়ে পড়েন। এবার শুরু হয় ধক্কাধাক্কি। এই পুরো ঘটনায় অনেক বড় অবদান রাখেন বাংলাদেশের অধিনায়ক সাকিব আল হাসান। তিনি একদিকে পুরো দলকে উসকে দিয়েছেন, অপরদিকে তার খেলোয়াড়দের মাঠ থেকে ফেরত আনারও পদক্ষেপ নেন। একজন অধিনায়ক হিসেবে তার উপর যে দায়িত্ব ছিল, তিনি তার উল্টোটা করেছেন। তবে এটাই প্রথম নয়, এর আগেও তাকে শৃঙ্খলা ভঙ্গ করতে দেখা গেছে। তিনি বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে আম্পায়ারকে গালি দিয়েছেন, অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে টেস্ট ম্যাচে বল টেম্পারিংয়ের চেষ্টা করেছেন, ম্যাচ চলাকালীন আউট হয়ে স্ট্যাম্পে লাথিও মেরেছেন। আর একবার তো ম্যাচ চলাকালীন ড্রেসিংরুমে বসে অসভ্য অঙ্গভঙ্গি করেছেন। শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধের ম্যাচে তিনি যা করেছেন তার জন্য অবশ্যই তার সাজা হওয়া উচিত। অতিসম্প্রতি দক্ষিণ আফ্রিকার বোলার রাবাদা শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে দুই ম্যাচ নিষিদ্ধ হয়েছেন।

এই প্রতিবেদনে সরাসরি না হলেও ভারতের বিপক্ষে ফাইনালে সাকিবকে নিষিদ্ধের আহ্বান জানানো হয়েছে। কারণ বিশ্ব সেরা এই অলরাউন্ডারকেই তাদের যতো ভয়! তবে ভারতীয় মিডিয়ার এমন কাণ্ড নতুন নয়, চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির মতো সম্মানজনক টুর্নামেন্টে প্রথমবারের মতো সেমিফাইনালে উঠে মাশরাফি-সাকিব-মাহমুদউল্লাহরা। বাংলাদেশের গড়া এই কীর্তি নিয়ে সবাই যখন পঞ্চমুখ, তখনই ভারতীয় মিডিয়ায় চলে একের পর এক নেতিবাচক উপস্থাপনা।

এবারও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে ভারতীয়রা বাংলাদেশকে নিয়ে একের পর এক আক্রমণাত্মক ও তুচ্ছতাচ্ছিল্য পোস্ট করে যাচ্ছেন। আর সেই হালকা ট্রলগুলোকে পুঁজি করেই দেশটির মেইনস্ট্রিম মিডিয়াগুলোতে চলছে তাচ্ছিল্যপূর্ণ নিউজ আর টকশো। যেখানে বাংলাদেশের মানুষের শিক্ষা নিয়েও পর্যন্ত প্রশ্ন তোলা হচ্ছে! তবে ক্রিকেট বোদ্ধাদের মতে, সাধারণ একটি খেলাকে নিয়ে ভারতীয় প্রধান সারির মিডিয়ার এমন সাধারণ সমর্থকদের সারিতে নেমে আসা সত্যিই দুঃখজনক।

তবে বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার মধ্যকার শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচটি প্রতিটি বাঙালির মতো প্রাণভরে উপভোগ করেছেন বলিউড স্টার অমিতাভ বচ্চন। ম্যাচ শেষ টুইটারে সাকিব আল হাসানের দলকে অভিনন্দনও জানিয়েছেন তিনি। তিনি লিখেছেন, ‘ত্রিদেশীয় সিরিজে বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার ম্যাচটি কী দুর্দান্তই না হলো!’

বাংলাদেশের এই জয়কে ‘অবিশ্বাস্য’ বলেছেন বিগ বি। বাংলাদেশকে অবশ্য তিনি ‘বাংলা’ বলে লিখেছেন, ‘বাংলার অবিশ্বাস্য জয়।’ তার টুইটে উঠে এসেছে ম্যাচের শেষ দিকে আবেগ, দুদলের খেলোয়াড়দের মাথা গরমের বিষয়টিও। তিনি বাংলাদেশ দলকে শ্রদ্ধা জানিয়ে লিখেছেন, ‘ম্যাচের শেষ কটি বলে খেলোয়াড়দের আবেগী আচরণ, মাথা গরম ও তর্ক-বিতর্কের পরেও শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ ম্যাচটা খেলেই জিতেছে। ওদের শ্রদ্ধা!’

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here