এক সোমবারে হাসিমুখে বিদায় দিয়েছিলেন প্রিয়জনকে, ঠিক পরের সোমবারই তারা দেশে ফিরলেন। একজন দুজন নয় গতকাল ২৩ জন দেশে ফেরেন কফিনে শুয়ে। যথারীতি অভ্যর্থনা জানানো হলেও তারা আর কারো সঙ্গেই কোলাকুলি করেননি। বিমান বন্দরে ছুটে আসা স্বজনদের মুখে হাসির বদলে ভেজা চোখ। কারণ আর ঘরে নয়, তাদের যাত্রা যে এবার না ফেরার দেশে। তাই কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন হাসপাতাল, শাহজালাল আন্তার্জাতিক বিমান বন্দর, ঢাকার আর্মি স্টেডিয়াম ছাপিয়ে গোটা দেশে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
তবে একসঙ্গে চির বিদায় নেওয়া আরও তিন জনের পরিচয় সনাক্ত করা যায়নি। তারা ঘুমিয়ে আছেন নেপালের ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয় টিচিং হাসপাতাল মর্গে। আর আহত ১০ জনের মধ্যে কেউ সিঙ্গাপুর কেউবা ভারতে, আবার অনেকে ঢাকা মেডিক্যালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন। সর্বশেষ গতকাল ঢাকায় আনা হয়েছে আহত কবির হোসেনকে।

এদিকে গতকাল বিকালে রাজধানীর আর্মি স্টেডিয়ামে নিহতদের দ্বিতীয় জানাজ শেষে এক এক করে মরদেহ গ্রহণের জন্য নাম ঘোষণা আসে। তখনই সেখানে এক হ্রদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনরা। তাদের আর্তনাদে ভারি হয়ে ওঠে পরিবেশ। আত্মীয়, বন্ধু, স্বজনদের সঙ্গে শেষবার দেখা হয় না ফেরার দেশের এই ২৩ যাত্রীর। ১৪ মার্চ নেপালে কেউ গিয়েছিলেন বেড়াতে কেউবা পেশাগত কাজে। কিন্তু তাদের এমন মর্মান্তিক মৃত্যু কেউই মেনে নিতে পারছেন না। কাউকে সান্ত¦না দেওয়ারও ভাষা ছিল না; সবাই শোকাহত, স্তব্ধ।

ইউএস-বাংলা উড়োজাহাজের ৭১ আরোহীর একজন ছিলেন মেহেদি হাসান। একসঙ্গে কাঠমান্ডু বেড়াতে তার সঙ্গে প্লেনে ওঠেছিলেন স্ত্রী কামরুন নাহার স্বর্ণা, ফুফাতো ভাই এফএইচ প্রিয়ক ও তার স্ত্রী আলমুন নাহার অ্যানী এবং তাদের তিন বছরের কন্যা তামারা প্রিয়ন্ময়ী। কাঠমান্ডু বিমানবন্দরে অবতরণের আগমুহূর্তেই বিমান বিধ্বস্ত হয়ে মারা যান প্রিয়ক ও শিশুকন্যা। তাই আপনজনকে শেষ বারের মতো দেখতে ঢাকা মেডিক্যাল থেকে ছুটে আসেন মেহেদি। জানাজাতেও অংশ নেন তিনি। মেহেদি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলছিলেন, ‘ভাই ও তার বাচ্চাকে দেখতেই হাসপাতাল থেকে এলাম। এক সঙ্গে রওনা হয়ে তারা চলে গেলেন না ফেরার দেশে। আর আমি ফিরে পেলাম দ্বিতীয় জীবন। এটাই কি নিয়তি?’ এর পর তাদের মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় গাজীপুরের শ্রীপুরে। আর মেহেদি ফিরে যান হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে।

এতদিন না জানলেও এবার অ্যানী জানতে পারছেন তার প্রিয়তম স্বামী ও মেয়ে আর বেঁচে নেই। কারণ তাদের দাফনের আগেই ঢাকা মেডিক্যাল থেকে বাড়িতে নেওয়া হয় অ্যানীকে। ডাক্তারদের জানানোর আগেই অন্যের কাছ থেকে শুনে ফেলেন তার আর পরিবার বলতে কিছুই রইলো। তার বাঁধভাঙা কান্নায় অন্যদের চোখের কোণায়ও পানি জমে। গাল বেয়ে জল গড়ায় তাকে বহন করা গাড়িচালকেরও।

এদিকে নিহতদের পরিবারের সদস্যরা দুপুরের পর থেকেই আর্মি স্টেডিয়ামে জড়ো হতে থাকেন। তাদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে স্টেডিয়ামের পরিবেশ। ২৩ পুলিশ কর্মকর্তা ২৩ জনের মরদেহ পরিবারকে বুঝিয়ে দিতে যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করে রাখেন আগেই। স্বামী নুরুজ্জামান বাবুর ছবি বুকে ধরে আর্মি স্টেডিয়ামে গিয়েছিলেন সুলতানা আক্তার। সঙ্গে ১০ বছরের ছেলে হামিম, ননদসহ স্বজনদের অনেকেই। ভেজা চোখেই ফরম পূরণ করেন নিহতের স্বজনরা। নুরুজ্জামান ছিলেন রানার অটোমোবাইলস লিমিটেডের জুনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট ফোরম্যান। তিনিসহ আরও তিনজন নেপালের মেকানিকদের প্রশিণ দিতে যাচ্ছিলেন। উড়োজাহাজ দুর্ঘটনায় তারা তিনজনই নিহত হন।

মরদেহ যারা জিম্মায় নেন একটি ফরম পূরণ শেষে তাদের স্বার নেওয়া হয়। পরে তিপূরণ বা সরকারি অনুদানগুলো ওই ঠিকানাতেই যাওয়ার কথা। সব প্রক্রিয়া শেষে ১৯টি অ্যাম্বুলেন্সে করে মরদেহগুলো নিয়ে যাওয়া হয় নিজ নিজ জন্মভিটায়। পারিবারিক ইচ্ছায় তাদের দাফনের কথা রয়েছে।

দেশে ফেরা নিহতদের মধ্যে রয়েছেন ইউএস-বাংলার প্রধান পাইলট আবিদ সুলতান, কো-পাইলট পৃথুলা রশীদ এবং কেবিন ক্রু খাজা হোসেন মোহাম্মদ শফি ও শারমিন আক্তার নাবিলা। আর যাত্রীদের মধ্যে ফয়সাল আহমেদ, বিলকিস আরা, মো. হাসান ইমাম ও তার স্ত্রী বেগম হুরুন নাহার বিলকিস বানু, আখতারা বেগম, নাজিয়া আফরিন চৌধুরী, রকিবুল হাসান, আঁখি মনি, মিনহাজ বিন নাসির, এইফএইচ প্রিয়ক, তার মেয়ে তামারা প্রিয়ন্ময়ী, মতিউর রহমান, এসএম মাহমুদুর রহমান, তাহিরা তানভিন শশী রেজা, বেগম উম্মে সালমা, মো. নুরুজ্জামান, রফিক জামান, তার স্ত্রী সানজিদা হক বিপাশা, তাদের ছেলে অনিরুদ্ধ জামান।

হাসান ইমাম ও বিককিস বানুর মরদেহ হস্তান্তর কার হয় তাদের দুই সন্তান কায়সার ও তৌকিরের কাছে। আনুষ্ঠানিকতার ফরমে একটি শব্দ লিখেই তার কান্নায় ভেঙে পড়েন। চারদিন আগে দেশে এসেছেন কানাডাপ্রবাসী এ দুইভাই। তবে ছুটিতে নয়, এসেছেন বাবা-মায়ের লাশ বুঝে নিতে। মাতৃভূমি ঠিকই আছে কিন্তু তারা একই দিনে মাতৃহারা ও পিতৃহারা হন। তবে মরদেহ পেলেও দেখা কিংবা ছোঁয়ার উপায় নেই। শক্ত কাঠের কফিন। বিধ্বস্ত উড়োজাহাজের আগুনে পুড়ে গেছে তাদের শরীর। কফিনের ওপর কাগজে লেখা নামই একমাত্র পরিচয়। তাই বাবা-মায়ের কফিন জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন কায়সার ও তৌকির।

মরদেহ গ্রহণ করতে স্টেডিয়ামে যান ফাইটের কেবিন ক্রু খাজা হোসেন মোহাম্মদ শাফির তিন খালা শ্বাশুড়ি। আর স্ত্রী সাদিয়া রহমান নেপাল গিয়েছিলেন খাজার মরদেহ শনাক্ত করতে। তিনিও গতকাল দেশে ফেরেন। স্বজনরা জানান, রাজধানীর বেগমবাজারের পারিবারিক কবরস্থানে শাফির মরদেহ দাফন করা হবে। অন্যদিকে নিহত এসএম মাহমুবুর রহমানের মরদেহ গ্রহণ করতে যান স্ত্রী সানজিদা আফরিন এবং তার শ্বাশুড়ি। একটু পর পর হাউমাউ করে কেঁদে ওঠছিলেন সানজিদা। বলছিলেন, ‘আমি আসলে কাকে নিয়ে বাঁচবো? আমার কেউই তো আর রইলো না। কে ফোন করে জিজ্ঞেস করবে, সময় মতো খেয়ো।’ পাশে থাকা তার মা নিজের চোখ মুছতে মুছতে মেয়ের মাথায় হাত বোলিয়ে সান্ত¦না দেওয়ার বৃথা চেষ্টা করছিলেন। মতিউর রহমানের মরদেহ গ্রহণ করতে স্টেডিয়ামে গিয়েছিলেন বড় ভাই মোকছুদুর রহমান। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘তার এরকম মৃত্যু ধারণাও করতে পারিনি।’ এ কথা বলেই বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন মোকছুদ।

২৩ মরদেহ নিয়ে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি উড়োজাহাজ গতকাল বিকাল ৪টা ৫ মিনিটে কাঠমান্ডু থেকে ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, বেসামরিক বিমান পরিবহনমন্ত্রী এ কে এম শাহজাহান কামাল, বিমানবাহিনীর প্রধান আবু এসরারসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। উড়োজাহাজ থেকে প্রথমেই নামানো হয় ইউএস-বাংলার প্রধান বৈমানিক আবিদ সুলতানের মরদেহ। তার কফিন একটি অ্যাম্বুলেন্সে তোলার পর একে একে অন্যদের কফিনও নামিয়ে আনা হয়। এর পর বিমানবন্দর থেকে কফিনগুলো নিয়ে যাওয়া হয় বনানীর আর্মি স্টেডিয়ামে। দুর্ঘটনায় নিহতদের স্বজনদের যারা কাঠমান্ডুতে গিয়েছিলেন, তাদেরও ইউএস-বাংলার একটি বিশেষ ফাইটে সোমবার দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। বিমানবন্দর থেকে আগেই তাদের নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকার আর্মি স্টেডিয়ামে।


এর আগে গতকাল সকাল ৯টায় কাঠমান্ডুতে বাংলাদেশ দূতাবাসে তাদের প্রথম জানাজা হয়। দূতাবাস প্রাঙ্গণে প্রবাসী বাংলাদেশি, বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তা-কর্মচারী, গণমাধ্যকর্মী, নিহতদের স্বজন এবং ইউএস-বাংলার উপস্থিত কর্মকর্তারা এতে অংশ নেন। জানাজা শেষে ২৩টি কফিন পাঠানো হয় সেই ত্রিভুবন বিমানবন্দরে। সেখান থেকেই ঠিক এক সোমবার পর দেশের পথে তাদের ফিরতি যাত্রা শুরু হয় বেলা আড়াইটায়, বিমানবাহিনীর কার্গো ফাইটে চড়ে।

ওই দুর্ঘটনায় নিহত ২৬ বাংলাদেশির মধ্যে আলিফুজ্জামান, পিয়াস রায় ও নজরুল ইসলামের মরদেহ রবিবার পর্যন্ত শনাক্তের বাকি ছিল। নেপালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মাশফি বিনতে শামস সোমবার সকালে বলেন, ওই তিন বাংলাদেশির মধ্যে আরও একজনের লাশ শনাক্ত করা হয়েছে। তবে নেপালি কর্তৃপ এখনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়নি। এর পর তা পাঠানো হবে দেশে। বাকি দুজনের মরদেহ পাঠানোর বিষয়টা নির্ভর করবে শনাক্ত করতে কতদিন লাগে তার ওপর। যে ১০ বাংলাদেশি প্রাণে বেঁচে গেছেন, তাদের একজন এমরানা কবির হাসিকে পাঠানো হয়েছে সিঙ্গাপুরে। কাঠমান্ডু মেডিক্যালে চিকিৎসা নেওয়া শাহীন ব্যাপারীকে রবিবার বিকালে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফাইটে ঢাকা আনা হয়। এখন তিনি ঢাকা মেডিক্যালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন। আর গতকাল ফেরেন আহত আরেক যাত্রী কবির হোসেন। তাকেও ঢাকা মেডিকেলে নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ইয়াকুব আলীকে দুপুরে নেওয়া হয়েছে দিল্লীতে।

গত ১২ মার্চ কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিমানবন্দরে ইউএস-বাংলার বিধ্বস্ত ড্যাস-৮কিউ ৪০০ উড়োজাহাজে চার ক্রুসহ ৭১ আরোহী ছিল। এদের মধ্যে ২৬ বাংলাদেশি, ২২ নেপালি, একজন চীনাসহ মোট ৫১ জন নিহত হন। বাকিরা হন আহত।

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here