সবুজ অরণ্য আর পাহাড়-টিলা ঘেরা ত্রিপুরার একটি গ্রামে জন্ম হয় কাঁকন বিবির। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে নিজের প্রাণ বাজি রেখে লড়াই করেছেন। স্বামী-সংসার উপেক্ষা করে অস্ত্র হাতে ঝাঁপিয়ে পড়েন পাক সেনাদের উপর। গোয়েন্দাগিরি করেছেন ভিখারির ছদ্মবেশে। পৃথিবীর বুকে এঁকে দিয়েছেন একটি স্বাধীন মানচিত্র।

কাঁকন বিবির জীবন ইতিহাস বড়ই বিচিত্র। পাহাড়ি অরণ্যে প্রকৃতির প্রতিকূলতার সঙ্গে সংগ্রাম করে বড় হয়েছেন। বাবার নাম যিশো ও মা মিলি। তবে ষোল-সতের বছর বয়সে শাহেদ আলী নামের এক মুসলিম তরুণের সঙ্গ পরিচয় হয় তার। পরে মুসলমান হয়ে নিজের নাম রাখেন নূরজাহান বেগম। বিয়ে করেন শাহেদকে। নিজেরে দেশে ছেড়ে স্বামীর সঙ্গে চলে আসেন সুনামগঞ্জে।

পাঁচ-ছয় বছর না পেরোতেই শুরু হয় স্বাধীনতা যুদ্ধ। স্বামী শাহেদের অনুমতি না পেলেও দেশের স্বার্থে লড়াই করে বাঁচতে চান কাঁকন। তিন মাস বয়সী মেয়ে সখিনা ও ঘর-সংসার ফেলে যোগ দেন যুদ্ধে। প্রথমদিকে মুক্তিযোদ্ধাদের গুলির বাক্স, খাবার, ওষুধপত্র বহন ও পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না সংগ্রামী এই লড়াই। পরে তিনি নানা ছদ্মবেশে পাক সেনাদের অবস্থান ও আক্রমণ পরিকল্পনার তথ্য সংগ্রহ করতেন। এমনকি বীরপ্রতীক তারামন বিবির মত তিনিও ভিখারির ছদ্মবেশে পাক সেনাদের শিবিরে এবং তাদের কাছাকাছি অবস্থানে হাজির হতেন। পরে সেসব তথ্য যথাসময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পৌঁছে দিতেন।

শেষ পর্যন্ত একদিন পাক সেনাদের সন্দেহের কবলে পড়ে যান। তাকে আটক করে প্রায় এক সপ্তাহ ধরে নানা নির্যাতন চালায় মুক্তিযোদ্ধাদের তথ্য পাওয়ার আশায়। অথচ সব নির্যাতন মুখ বুঁজে সহ্য করেন এই অকুতোভয় নারী। তবে একদিন সুযোগ বুঝে পালিয়ে সোজা চলে আসেন মুক্তিযোদ্ধাদের শিবিরে। ওই অঞ্চলের সেক্টর কমান্ডার মীর শওকত আলী সেখানে তাকে রান্নার কাজ করতে বলেন। ১৯৭১ সালের আগস্ট পর্যন্ত রান্নাবান্নার কাজ করেন তিনি। এরপর মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে অভিযানেও যোগ দিতে থাকেন।

বীরকন্যা কাঁকন বিবি

সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়কে জাউয়া বাজারে সেতু উড়িয়ে দেওয়া এবং পাক সেনাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার অভিযানে ছিলেন কাঁকন। এমনই প্রায় বিশটি অভিযানে অংশ নেন তিনি। এগুলোর মধ্যে পনেরোটিই ছিল পাক সেনাদের সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধ। এগুলোর মধ্যে অপারেশন মহব্বতপুর, কান্দিগাঁও, টেংবাটিনা, বেটিগাঁও, নূরপুর, দোয়ারা বাজার, টেবলাই এবং পূর্ববাজারের অভিযান উল্লেখযোগ্য।

পাক সেনারা যেভাবে নারীদের ধরে নিয়ে গিয়ে নির্মম নির্যাতন চালাতো সেগুলোই তাকে যুদ্ধে যাওয়ার ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করে। প্রথম দিকে মুক্তিযোদ্ধা কিংবা পাক সেনা কেউই তাকে বিশ্বাস করতো না। পরে অবশ্য তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে নিজের সাহসী কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করেন যে, তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্যই ছদ্মবেশ ধারণ করে ভিখারি বেশে তথ্য সংগ্রহ করতেন। কিন্তু স্বাধীনতার পরও সাহসী এই মুক্তিযোদ্ধার জীবনের অধিকাংশ দিন কেটেছে কষ্টের মধ্য দিয়ে।

মুক্তিযুদ্ধে কাঁকন বিবির সাহসী কর্মকাণ্ডের কথা অনেকদিন অজানাই ছিল। দেশ স্বাধীন হলেও এই মুক্তিযোদ্ধাকে সেই আগের মতোই ভিক্ষা করে জীবন চালাতে হতো। তবে শেষ পর্যন্ত সংবাদ মাধ্যমের সাহায্যে তার অসীম সাহসিকতার পরিচয় জানতে পারে জাতি। লেখা হয় তার সম্মুখ যুদ্ধসহ পুরুষ যোদ্ধাদের সাথে নানা অভিযানে অংশ নেওয়ার ঘটনা।

এই বীরঙ্গনার যুদ্ধের সাহসিকতা জানতে পেরে ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা সরকার তাকে বীরপ্রতীক খেতাবে ভূষিত করার অঙ্গীকার করে। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলাতায় রাষ্ট্রীয় সেই স্বীকৃতি আর গেজেট আকারে মেলেনি। সেই আক্ষেপ নিয়েই বুধবার রাত ১১টা ৫ মিনিটে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চির বিদায় নিলেন এই বীরকন্যা।

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here