চাঁদনী চক মার্কেটে সেদিন যা হয়েছিল [ভিডিও]

আব্দুল্লাহ আল ইমরান

0
236

মা, খালা ও বান্ধবীদের নিয়ে রাজধানীর চাঁদনী চক মার্কেটে গিয়েছিলেন ইডেন শিক্ষার্থী রিনা (ছদ্মনাম)। ভীড়ের মধ্যে হঠাৎ একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। বলাকা সিনেমা হলের কোণায় একটি দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে পড়েন মা। দোকানের নাম শাহনূর ফেব্রিকস। ফোনে নিজের অবস্থান মেয়েকে কথা জানিয়ে দেন দ্রুত। মিনিটখানেকের মধ্যেই রিনা হাজির।

কিন্তু তেঁতে ওঠে দোকানের কর্মচারী নজরুল। বয়স্ক ওই নারীকে পারলে ঠেলে ফেলে দেয়। অভিযোগ, দোকানে নাকি খদ্দের প্রবেশ করতে পারছে না! অথচ দুদিকেই খোলা দোকানটিতে তখন কোনো খদ্দের ছিল না। এমন আচরণে বিষ্ময় প্রকাশ করেন ওই নারী। সঙ্গে যোগ দেন মেয়ে রিনা। দোকানের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন বাকি দুই বন্ধবী। মা-মেয়ে মিলে দুর্ব্যবহারের প্রতিবাদ করলে আরো ক্ষেপে ওঠে নজরুল। সঙ্গে যোগ দেয় বাকি কর্মচারীরাও। হৈ-হট্টগোল বাড়তে থাকে।

এ এলাকায় যা হয় আরকি, অসহায় মেয়েদের পেয়ে একজোট হয়ে যায় কর্মচারীরা। চারদিক থেকে ঘিরে ধরে। বাদ যায় না কাছেই দাঁড়ানো দুই বান্ধবীও। মেয়ে মানুষ চুপচাপ মাথা নিচু করে চলে যাবে, কেন প্রতিবাদ করল- এই নিয়ে তর্ক বেঁধে যায়। একপর্যায়ে শুরু হয় খিস্তিখেউর। মেয়েটি নিজের পরিচয় দিয়ে মুখ সামলে কথা বলার জন্য বলতেই, নজরুল বলে- ‘তোকে এখন এখানে দাঁড়ায়া…! (ভাষায় প্রকাশ যোগ্য নয়)। দেখি তোরে কোন বাবায় বাঁচায়।’ হতভম্ভ হয়ে যায় মেয়েটি। সত্যিই কেউ আসেনি। ২০-২৫ জন আশপাশের কর্মচারী যাও জড়ো হয়েছে, তা সহযোগীতা করতে নয়, সুযোগে নারী শরীর স্পর্শের ধান্দায়।

অবস্থা বেগতিক দেখে এগিয়ে আসে মেয়েটির বান্ধবী লিনা (ছদ্মনাম)। সাহস করে নজরুলকে চ্যালেঞ্জ করে বসে। বলে, ‘মেয়েদের পেলেই মুখ খারাপ শুরু হয়ে যায়, না? আমরা পণ্য নাকি?’ আর যাবে কোথায়, সব সীমা লঙ্ঘন করে মেয়েটির বুকের কাছে জামা খামচে ধরে নজরুল। বলে, ‘দেখি তোর কত তেজ, আয়!’ হেঁচকা টানে কাছে নিয়ে যে যেভাবে পেরেছে, মুখে, চোখে, হাতে মেয়েগুলোকে অপমাণ করেছে। মায়ের শাড়ি ধরেও নাকি কেউ একজন টান মেরেছে। পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে পারত, বয়স্ক কয়েকটা লোক এসে তাদের উদ্ধার করে সরিয়ে দেন এবং দ্রুত ওই স্থান ত্যাগ করতে বলেন। যেন দেশে যুদ্ধ লেগেছে, নারী-শিশুদের পালানো ছাড়া পথ নেই!

গল্প নয়, বাস্তব এ ঘটনাটি গত শুক্রবারের। লজ্জায়, অপমাণে মেয়েগুলো তাদের মাকে নিয়ে সেদিন পালিয়েছিলেন ঠিকই কিন্তু চুপ করে থাকেননি। এ ঘটনার কিছু অংশ ফেসবুকে লিখেছিলেন একজন। মেয়েদের হয়রানি সংক্রান্ত ঘটনায় প্রতিবাদের কয়েকটি কার্যকর উদাহরণ তৈরি করায় অনেকেই সে লেখার নিচে আমাকে মেনশন করতে শুরু করেন। এর পর আমি মেয়েটির সঙ্গে যোগাযোগ করি। মেয়েটি সাড়া দেন। পুরো ঘটনায় বিচার চেয়ে একটি দরখাস্ত লিখে মেয়েটিকে পরদিন দুপুরে দেখা করতে বলেছিলাম। মেয়েটি বান্ধবীদের নিয়ে এসেছিলেন। তাকে নিয়ে নিউমার্কেট জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার সাজ্জাদ রায়হান ভাইয়ের অফিসে চলে যাই।

যাবার আগে আরো দু’জনকে বিষয়টি জানাই। এই দু’জন আমার ‘ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো’ কাজকর্মে বিরক্তিহীন সহযোগিতা করেন সব সময়। এদের একজন এডিসি নাজমুন নাহার আপা, অন্যজন র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক ডিআইজি জামিল আহমেদ। তারাও সাজ্জাদ ভাইকে এ ঘটনায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। এর পর রচিত হলো প্রতিবাদের এক দারুণ গল্প।

দোকানের কর্মচারী নজরুল

এসি সাজ্জাদ ভাইয়ের নির্দেশে দুটি টিম ছুটল চাঁদনী চকের দিকে। ভুক্তভোগী মেয়েরা ওই দোকান ও কর্মচারীদের চিনিয়ে দিল। বাকবিতাণ্ডা ও মার্কেট কমিটির সুপারিশের মধ্যেও চারজনকে ঠিকই ধরে নিয়ে এলো পুলিশ। মামলা হলো থানায়। আসামিদের চালান করা হয়েছে কোর্টে। যা জানলাম, দুই-চার মাসে জামিন হবার সম্ভাবনা নেই।

নিউমার্কেট এলাকা ঘিরে গড়ে ওঠা ছোট-বড় মার্কেটগুলোতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, মেডিকেল, ইডেন, বদরুন্নেসার মতো ঐহিত্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের হাজার হাজার নারী শিক্ষার্থী প্রতিদিন কেনাকাটা করতে যান। মার্কেটের দোকানগুলোর বদমায়েশ কিছু কর্মচারীর দ্বারা প্রতিনিয়তই সেসব নারীরা নানা ভাবে নিগৃহীত হন। দিনে দিনে ব্যাপারটিকে তারা নিয়মে পরিণত করে ফেলেছেন। এসব ঘটনায় দু-একজন যদিও বা প্রতিবাদ করেন, সদলবলে ওরা তখনো হামলে পড়ে। প্রায়শই সেইসব দুঃখের কাহিনী ফেসবুকে শেয়ার করেন ভুক্তভোগী নারীরা। কিন্তু প্রতিবাদের সঠিক রাস্তাটা জানা না থাকায় অনেকেই ইচ্ছা থাকা সত্যেও প্রতিকার পান না। প্রতিবাদী নারীদের জন্য আজকের ঘটনাটা আলোকজ্জ্বল একটা উদাহরণ তৈরি করলো।

একটু সাহস নিয়ে এগিয়ে এলে, নিয়ম মেনে প্রতিবাদ করলে এবং সেই প্রতিবাদটা সঠিক জায়গায় পৌঁছে দিতে পারলে- এ দেশেও যে অপরাধীকে আইনের আওতায় এনে শাস্তি দেয়া সম্ভব, তা আরো একবার প্রমাণিত হলো। নেই নেই করেও আমাদের দেশে যতটুকু নাগরিক সুযোগ-সুবিধা আছে আমরা তার কতটুকুই বা ব্যবহার করতে পারছি?

সহকারী কমিশনার সাজ্জাদ রায়হান ভাইকে ধন্যবাদ দিলে কম হবে। শুধু এটুকু বলব, আপনার মতো অফিসার আছে বলেই আমাদের আশার প্রদীপটা এখনো নিভে যায়নি। যাপিত জীবনের সমবেত কষ্টগুলো, বেদনাগুলো আমরা আপনাদের কাছে পৌঁছে দিয়ে কিছুটা হলেও শান্তি পেতে চাই। যেভাবে আপনি মেয়েটিকে অভয় দিলেন এবং পাশে থাকলেন তাতে নিশ্চয়ই মহান সৃষ্টিকর্তা আপনার এবং আপনার পরিবারের মঙ্গল করবেন। আমাদের দোয়া থাকল।

নিউমার্কেট এলাকায় প্রতিনিয়ত অনিয়ম-দুর্ভোগের শিকার নারীদের মধ্যে যারা ফেসবুকে চিল্লাপাল্লা না করে সত্যি সত্যিই অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে চান, তারা আমাদের দেখিয়ে দেয়া এই আইনি পথটি অনুসরণ করতে পারেন। মনে রাখবেন, আপনার প্রতিবাদটি অন্য কেউ এসে করে দিয়ে যাবে না। শুরুটা অন্তত আপনাকেই করতে হবে।

এই দেশে কিছু হয় না বলে যারা পাশ কাটিয়ে যান, যারা প্রতিবাদের বদলে প্রতিনিয়ত অন্যায়কে মেনে নেন, তাদের প্রতি অনুরোধ, নিজের জায়গা থেকে একটুখানি আওয়াজ তুলুন। জনারণ্যে শুরুতে সেই আওয়াজ বড় ক্ষীণ আর বেমানান ঠেকলেও ধীরে ধীরে দেখবেন আরো সহস্র আওয়াজ আপনার দিকে ছুটে আসছে। গণমানুষের সম্মিলিত সেই আওয়াজের সামনে দাঁড়ায়, এমন অপশক্তি কোথায়?

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here