বীরাঙ্গনাদের মা তিনি

স্বপন চন্দ্র দাস

0
125

‘স্বাধীনতার পর কেউ যখন আমাদের আশ্রয় দেয়নি, তখনই বঙ্গবন্ধু আমাদের মেয়ে ডেকে বাবার নামের জায়গায় তার নাম লিখতে বলেছিলন। আর বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর মায়ের মমতা দিয়ে বুকে জড়িয়ে নেন সাফিনা লোহানী। তার কারণে সমাজে আমরা মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারছি। শেষ বয়সে এসে আমরা সরকারি স্বীকৃতি পেয়েছি।’ আনন্দশ্রু ঝরিয়ে কথাগুলো বলছিলেন মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি পাওয়া সিরাজগঞ্জের বেশ কয়েকজন বীরাঙ্গনা।

তাদের বক্তব্যে ওঠে আসা বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে সবাই জানলেও, সাফিনা লোহানীকে হয়তো এ প্রজন্মের অনেকেই চেনেন না। নারী নেত্রী সাফিনা লোহানীর জন্ম সিরাজগঞ্জের সুপরিচিত লোহানী পরিবারে। বাবা শওকত লোহানী, যিনি ফতেহ লোহানী ও কামাল লোহানীর ভাই।

অনেক রক্ত, অনেক ত্যাগের বিনিময়ে এসেছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা। বাংলার অসংখ্য নারী হয়েছেন পাকিস্তানী সেনাবাহিনী আর তাদের দোসর রাজাকার-আলবদরদের পৈশাচিক নির্যাতনের শিকার। পাক বাহিনী ও তাদের দোসরদের বর্বরতার শিকার ওই নারীদের এতদিন শুধু ‘বীরাঙ্গনা’ বলেই সম্মান জানানো হতো। তবে স্বাধীনতার চার দশক পরেও সমাজে তারা ছিলেন এক প্রকার অবাঞ্চিত। কেবল লাঞ্ছনা, ধিক্কার ও তিরস্কারই ছিল তাদের নিত্যসঙ্গী। অবশেষে ২০১৫ সালে বীরাঙ্গনাদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেয় সরকার। এ প্রাপ্তির নেপথ্যে থেকে কাজ করেছেন সাফিনা, যিনি পুরো জীবনটাই ব্যয় করেছেন স্বাধীনতা যুদ্ধে নির্যাতিত নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে। দীর্ঘ চার দশক ধরে নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে তিনি এই নারীদের ঐক্যবদ্ধ করেছেন। সচেতন করেছেন নিজেদের অধিকার সম্পর্কে।


সিরাজগঞ্জের নারী মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি পাওয়া রাহেলা বেগম, হাজেরা বেগম, কমলা বানু, হামিদা বেগম জানান, স্বাধীনতার পর সমাজে কোথাও তাদের ঠাঁই হয়নি। স্বামী কিংবা বাবা-মা, কেউই তাদের ঘরে তুলে নেননি। তখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাদের ‘বীরাঙ্গনা নারী পুনর্বাসন কেন্দ্রে’ আশ্রয় দিয়েছিলেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর সেই আশ্রয়টুকুও কেড়ে নেয়া হয়। আবারও সমাজচ্যুত হয়ে তারা দ্বারে দ্বারে ঘুরতে থাকেন। অন্যের বাড়ি কাজ করে খাবেন, তাও ঝুটেনি। কেউই তখন তাদের কাজ দিতে চায়নি। তাই নিজ এলাকা ছেড়ে চলে যান দূরে। ঠাঁই নিয়েছিলেন রেল লাইন কিংবা ওয়াপদা বাঁধের পাশের সরকারি জায়গায়। ছোট্ট একটি কুঁড়েঘরে থেকেছেন অনেক দিন। কয়েক বছর পর হঠাৎ করেই সাফিনা লোহানী তাদের খুঁজে বের করেন।

মুক্তিযোদ্ধা রাহেলা বলেন, ‘তার চেষ্টায় আবার আমরা একত্রিত হই। তিনি মায়ের স্নেহ দিয়ে আমাদের বুকে তুলে নেন। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নিয়ে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেন। এক কথায় তার অফিসটাই ছিল আমাদের জন্য। অভাব দূর করতে বিভিন্নভাবে টাকা সংগ্রহ করে আমাদের মধ্যে বিতরণ করেছেন তিনি।’

আরেক নারী মুক্তিযোদ্ধা মাহেলা বেগম বলেন, ‘আজ আমরা সরকারি স্বীকৃতি পেয়েছি আমাদের মায়ের কারণেই। এই স্বীকৃতির জন্য তিনি অনেক কষ্ট করেছেন। আমরা এখন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ভাতা পাচ্ছি। সমাজে কেউ আমাদের ঘৃণা করে না। আত্মীয়-স্বজনসহ এলাকার মানুষ আমাদের সম্মান দেয়।’

সাফিনা লোহানী

নারী নেত্রী সাফিনা লোহানী এখন অসুস্থ৷ পক্ষাঘাতগ্রস্থ হওয়ায় সিরাজগঞ্জ শহরের এসএস রোডস্থ নিজ বাড়িতেই থাকছেন। মুখের কথাগুলোও অস্পষ্ট। অনেক কিছুই মনে রাখতে পারেন না।

মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পান যে বীরাঙ্গনারা
কয়েক দফায় স্বীকৃত পাওয়া নারী মুক্তিযোদ্ধারা হলেন- আয়মনা, আছিয়া বেগম, মৃত সূর্য্য বেগম, কমলা বেওয়া, জয়গন নেছা, সুরাইয়া খাতুন, মাহেলা বেগম, হামিদা বেওয়া, মোছাম্মত হাসনা বেগম, মৃত রাজুবালা দে, রমিছা বেওয়া, ছামেনা খাতুন, শামছুন্নাহার, আছিয়া বেগম, মৃত জোসনা ভানু, আয়েশা বেগম, করিমন খাতুন, নুরজাহান বেগম, হাজেরা খাতুন, রাহেলা খাতুন ও ভানু খাতুন।

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here