মুক্তিযুদ্ধের একজন বীর প্রতীক বসবাস করতেন মিরপুর মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সে ময়লার ঢিবির ওপর টাঙানো চালার ভেতরে। হোটেলে থালাবাসন ধোয়ার কাজ করতেন তিনি, কখনো বা কুলির কাজ। আশা ছিল, সন্তানদের সামান্য পড়ালেখা শেখাবেন, এতে যদি ভাগ্য ফেরে। কিন্তু স্কুলে বেতন দিতে না পারায় কর্তৃপক্ষ ছেলের নাম কেটে দিয়ে স্কুল থেকে বের করে দেয়। শেষ জীবনে দুটো কিডনিই বিকল হয়ে যায় তার। এভাবে হাসপাতালের বারান্দায় ধুঁকে ধুঁকে প্রায় বিনা চিকিৎসায় মারা যান তিনি।

এ কাহিনী আপনার কাছে অবিশ্বাস্য লাগছে না? আমারও প্রথম শুনে অবিশ্বাস্য মনে হয়েছিল। আরো আশ্চর্য লেগেছিল যখন শুনলাম, এই বীর তার বীর প্রতীক খেতাব পাওয়ার কথা জানতে পেরেছিলেন ৩০ বছর পর! যখন তার শরীরে দুরারোগ্য ব্যাধি বাসা বেঁধেছে। তাঁর এই রোগ পাকিস্তানি বাহিনীর চেয়েও ভয়ানক। তখন আক্ষেপ করে এই বীর বলেছিলেন, ‘আমার থিকা অল্প বয়সী লোকজন মুক্তিযোদ্ধা ভাতা তুলে। আমি ১২ বছর বয়সে যুদ্ধ করছি, তারা তাহলে কত বছর বয়সে যুদ্ধ করছে? মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় কত ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা ঢুইকা গেছে, তারা ভাতাও তোলে। আর আমার পোলাপাইন না খাইয়া থাকে। কী করুম, আমি মুর্খ মানুষ, ছোটো লোকের পোলা।’

অভিমানী, বঞ্চিত এই বীরের নাম নাম শহীদুল ইসলাম। ক্যাম্পের সবাই আদর করে যাকে ডাকত লালু বলে। এই লালু আমাদের লালু। এই লালু বাংলাদেশের লালু। এই লালু লাল-সবুজের লালু। এই লালু টাঙ্গাইলের গোপালপুরের লালু। এই লালু মহান মুক্তিযুদ্ধের সর্বকনিষ্ঠ বীর যোদ্ধা।

লালুর জীবন সাঙ্গ হয়েছে ২০০৯ সালের মে মাসের ২৫ তারিখেই। আর তাই তিনি আর আমাদের মুক্ত দেশে, স্বাধীন নাগরিকদের চলার পথের বাধা হতে আসবেন না। চিকিৎসার জন্য কারো কাছে হাত পাতবেন না। জানি, লালুকে এই জাতি মনে রাখবে না, ভুলে যাবে। প্রয়োজন পড়বে না তাদের। তারপরও বলতে চাই লালুর বীরত্বের কথা। ১৯৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর গোপালপুরকে হানাদার মুক্ত করতে লালুর অবদান ভোলার মতো নয়। চলুন জানি কী করেছিলেন বীর প্রতীক লালু ওই সময়ে।

শহীদুল ইসলাম লালু বীর প্রতীক।
তিনি ১১ বছর বয়সে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে যখন টাঙ্গাইল বিন্দুবাসিনী স্কুলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে কাদেরিয়া বাহিনীর সব মুক্তিযোদ্ধা অস্ত্র জমা দিচ্ছিলেন, তখন শহীদুল ইসলাম লালুও তার স্টেনগানটি বঙ্গবন্ধুর হাতে তুলে দিচ্ছিলেন। বঙ্গবন্ধু অবাক হয়ে শহীদুল ইসলাম লালুর পিঠ থাপড়ে বলেছিলেন, ‘সাব্বাস বাংলার দামাল ছেলে।’ যখন সহযোদ্ধাদের কাছ থেকে লালুর ব্যাংকার ধ্বংসের কথা শুনলেন তখন বঙ্গবন্ধু তাকে আদর করে কোলে তুলে নিয়ে বলেছিলেন, ‘বীর বিচ্ছু’।

মুক্তিযোদ্ধাদের চা-পানি খাওয়ানোর পাশাপাশি মাঝেমধ্যে অস্ত্র পরিষ্কারের কাজও করতেন। এভাবেই অস্ত্র ধরা শেখেন কিশোর শহীদুল। সপ্তাহখানেক পর মুক্তিযোদ্ধা দলের সাথে ট্রেনিং করার জন্য ভারত চলে যান। ভারতে গিয়ে অন্য মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে ট্রেনিংয়ে অংশ নিয়ে অস্ত্র হিসেবে স্টেনগান ও গ্রেনেড পান। আর পোশাক হিসেবে পান হাফপ্যান্ট, গেঞ্জি ও মাথার ক্যাপ। ট্রেনিংয়ের সময় ভারতের তুরা ক্যাম্পে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ কালে ব্রিগেডিয়ার সামসিং শহীদুল ইসলামের নামের সঙ্গে লালু নামটি যুক্ত করে দেন। যুদ্ধের পর লালু নামেই পরিচিতি লাভ করেন তিনি। তুরা ক্যাম্পে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ চলাকালে প্রতিদিন তিনি সকাল-সন্ধ্যায় হুইসেল বাজিয়ে সব মুক্তিযোদ্ধাদের লাইনে দাঁড় করিয়ে জাতীয় সঙ্গীত গেয়ে পতাকা উঠাতেন ও নামাতেন। এই কাজের সঙ্গে তাকে সহযোগিতা করতেন শ্যামল চন্দ্র দে ওরফে ভুলু। শ্যামল চন্দ্র দে সে সময় ভোলাভালা নাদুস-নুদুস থাকায় ব্রিগেডিয়ার সামসিং তাকে ভুলু নামে অখ্যায়িত করেছিলেন।

তুরায় লালু স্টেনগান ও গ্রেনেড বিষয়ে ভালো শিক্ষা গ্রহণ করে সহযোদ্ধাদের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার জন্য টাঙ্গাইলের গোপালপুরের কেরামজানীতে আসেন। তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল গোপালপুর থানায় হানাদারদের বাঙ্কার গ্রেনেড মেরে উড়িয়ে দেওয়ার। বয়সে ছোট বলে সবার অগোচরে এ কাজ সহজে করা যাবে এবং ক্যাম্পের ভেতরে সহজে ঢুকতে পারবেন, শত্রু বলে সন্দেহও করবে না কেউ, সেজন্য লালুকে এ দায়িত্ব দেওয়া হয়। নির্ধারিত দিনে লালু হাফপ্যান্ট পরে বিকেলে তিনটি গ্রেনেড নিয়ে গোপালপুর থানার উদ্দেশে রওনা হন। থানার কাছে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সন্ধ্যা। থানার গেটের সামনে বটগাছের নিচে যেতেই লালুর গ্রামের এক দূরসম্পর্কের ভাইয়ের সাথে দেখা হয়। সে তখন রাজাকারদের নিয়ে রাস্তা পাহারায় ছিল। লালুকে দেখে জিজ্ঞেস করে, ‘কিরে শহীদ এতদিন কোথায় ছিলি?’ শহীদ উত্তর দেন, ‘কোথায় আর যাব, চারদিকে শুধু গোলাগুলি, আমার ভয় লাগে, তাই নানাবাড়ি গিয়েছিলাম।’ সে তখন বলে, ‘তুই আমাদের ক্যাম্পে থেকে যা, ওই বাঙ্কারে পাঞ্জাবি সেনাদের চা-টা খাওয়াবি।’ সুযোগ হাতছাড়া না করে প্রস্তাবে রাজি হয়ে যান লালু। গ্রেনেড তিনটি থানার পেছনের পুকুরপাড়ে রেখে ক্যাম্পে প্রবেশ করেন। একসময় সুযোগ বুঝে সবার অগোচরে থানার ভেতরের একটি পরিত্যক্ত স্থানে গ্রেনেড তিনটি রেখে তা ব্যবহারের সময় খুঁজতে থাকেন। তারপর চা-পানি খাওয়ানোর ফাঁকে ফাঁকে চারদিকে কে কোথায় আছে দেখে নেন। তিনি তিনটি বাঙ্কার টার্গেট করে নেন, যা সহজেই গ্রেনেডে উড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। তাতে কজন পাকিস্তানি সেনা ঘায়েল হবে তার হিসাবও কষে নেন। একেক বাঙ্কারে ৫ জন, ৪ জন ও ৩ জন করে সেনা রয়েছে। তারা ভারী অস্ত্র নিয়ে বাঙ্কারগুলোতে পজিশন নিয়ে আছে। লালু ছোট হওয়ার কারণে সবার সন্দেহের বাইরে থেকে তার অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে সক্ষম হন।

যদিও লুকিয়ে রাখা গ্রেনেডগুলো আনতে গিয়ে কিছুটা বিপদ হয়েছিল। কারণ গ্রেনেডের ওপর শুয়ে ছিল মস্ত বড় একটা সাপ। সেটি চলে যাওয়ার পর গ্রেনেডগুলোর সেফটিপিন খুলে দ্রুত প্রত্যেক বাঙ্কারের দিকে ছুড়ে মারেন লালু। প্রচণ্ড শব্দে বিস্ফোরিত হয় গ্রেনেডগুলো। এতে তিন বাঙ্কারের সবাই মারা যায়। আর সেদিনই মুক্তিযোদ্ধারা গোপালপুর থানা সহজেই দখল করে নেন। লালু থানা থেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পালিয়ে আসেন। তিনি যে ফিরে আসতে পারবেন, সে ধারণা কমান্ডারদেরও ছিল না।

সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে গিয়ে শহীদুল ইসলাম লালু মুক্তিযুদ্ধের অনন্য ইতিহাস রচনা করেন। এছাড়া তিনি গোপালপুর, ভূঞাপুর, মধুপুর ও নাগরপুরের কয়েকটি রণাঙ্গনে যুদ্ধ করেছেন। অধিকাংশ সময়ে তিনি পাকিস্তান বাহিনীর ওপর নজরদারির কাজ করতেন। তারা কোথায় অপারেশন পরিকল্পনা করে সব গোপন খবর জোগাড় করে মুক্তিবাহিনীর কাছে পৌঁছে দিতেন। ছদ্মবেশ ধারণ করে অগ্রিম খবর সংগ্রহের ব্যাপারে তার জুড়ি ছিল না। অনেক সময় তার তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই মুক্তিযোদ্ধারা পরবর্তী প্ল্যান তৈরি করতেন।

তিনি যে বীর প্রতীক খেতাব পেয়েছেন সে কথা নিজেও জানতেন না। জেনেছেন বহু পরে, ১৯৯৬ সালে। এর কারণ তিনি থাকতেন প্রত্যন্ত গ্রামে। আর মুক্তিযুদ্ধে জয়লাভ করলেও জীবনযুদ্ধে ছিলেন পরাজিত। অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী।

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here