২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ এর নামে ঢাকায় গণহত্যা শুরু করে৷ আর রাজারবাগ পুলিশ লাইনে ওই রাতেই প্রথম প্রতিরোধ শুরু হয়। সাড়ে তিনঘণ্টার সেই প্রতিরোধ যুদ্ধে তিন মুক্তিযোদ্ধার কথা প্রকাশ করেছে ডয়চে ভেলে।

শাহজাহান মিয়া ছিলেন ওয়্যারলেস অপারেটর। কনস্টেবল আবু শামা ছিলেন অস্ত্রাগারের দায়িত্বে। আর আব্দুল আলী পুলিশের তৎকালীন আইজি তসলিম উদ্দিনের দেহরক্ষী। থাকতেন রাজারবাগে। তারা তিনজনই জানান, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের পরই ভিতরে ভিতরে প্রস্তুতি চলছিল। ২৫ মার্চ বিকেল থেকেই রাজারবাগের আশেপাশের সড়কে ট্রাকে করে রেকি করে পাকিস্তানি বাহিনী। আর রাত ৯টার পরই খবর আসে রাজারবাগ পুলিশ লাইনে আক্রমণ হতে পারে। তখন রাজারবাগের অস্ত্রাগার খুলে চার শতাধিক অন্ত্র নিয়ে পুলিশ সদস্যরা রাজারবাগ এবং আশাপাশের এলাকায় পজিশন নেয়। রাত সাড়ে ১১টায় দ্বিতীয় দফা পাগলা ঘণ্টা বাজিয়ে অস্ত্রাগারের সব অস্ত্র বিলি করা হয় পুলিশ সদস্যদের মাঝে। এরপর রাত সাড়ে ১১টার কিছু পরে পাকিস্তানিরা রাজাররবাগের দিকে আসতে শুরু করলে পথেই প্রতিরোধের মুখে পড়ে।

মুক্তিযোদ্ধা শাহজাহান মিয়া ও আব্দুল আলী খান

শাহজাহান মিয়া বলেন, ‘রাত ১১টা ৫০ মিনিটের দিকে পাকিস্তানি বাহিনী চামেলিবাগে প্রথম পুলিশ ব্যারিকেডের মুখে পড়ে৷ সেখানেই দুই পাকিস্তানি সেনা পুলিশের গুলিতে নিহত হয়। এটাই ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে প্রথম বুলেট। আমি এবং ওয়্যারলেস অপারেটর মনির তখন ওয়্যারলেস রুমে চলে যাই। সেখানে একটি ওয়্যারলেস বার্তা আমি লিখে তা ওয়্যারলেসের মাধ্যমে ১৯ জেলা, ৩৬টি সাব ডিভিশন এবং সব পুলিশ লাইন্সে ওয়্যারলেসের মাধ্যমে জানিয়ে দিই। বার্তাটা ছিল: ‘দ্য বেস ফর অল স্টেশন পূর্ব পাকিস্তান পুলিশ, কিপ লিসেনিং, ওয়াচ, উই আর অলরেডি অ্যাটাক্ড বাই পাক আর্মি, ট্রাই টু সেভ ইয়োরসেলফ্, ওভার অ্যান্ড আউট৷’ আমি বেশ কয়েকেবার ম্যাসেজটি ট্রান্সমিট করি। তখন চারদিকে হাজার হাজার গুলির শব্দ। আমরাও তখন অন্ত্র নিয়ে পুলিশ লাইনের চার তলার ছাদে চলে যাই৷’

আবু শামা বলেন, ‘২৫ মার্চ রাত সাড়ে ৯টার দিকে আমরা রাজারবাগ অস্ত্রাগারের সামনে স্বাধীন বাংলাদেশের পাতাকা উত্তোলন করি। স্লোগান দেই বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু। তখন অস্ত্রাগারের দায়িত্বে থাকা সুবেদার আবুল হাসেম অস্ত্রাগারে তালা মেরে চাবি মফিজ সাহেবের কাছে রেখে পালিয়ে যান। আমরা খবর পাই ক্যান্টনমেন্ট থেকে সেনাবাহিনী বের হয়েছে। তখন আমরা মফিজ সাহবেবের বাসায় দৌড়ে গিয়ে চাবি নিয়ে আসি। তিনি চাবি দিতে চাননি, আমরা জোর করে চাবি এনে অস্ত্রাগার খুলে দেই। রাইফেল নিয়ে আমরা পজিশনে চলে যাই। অস্ত্রাগার তালা মেরে দেওয়া হয়। রাত সাড়ে ১১টার দিকে আমাদের ওপর যখন চূড়ান্ত আক্রমণ শুরু হয় তখন আমরা পাগলা ঘণ্টা বাজাই। তখন বাকি যারা ছিলেন তারাও বের হয়ে এসে অস্ত্রাগার ভেঙ্গে বাকি অস্ত্র হাতে নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা আমরা প্রতিরোধ চালিয়ে যাই, লড়াই করি। এই সময়ে পাকিস্তানি বাহিনী রাজারবাগ পুলিশ লাইনের ভিতরে ঢুকতে পারেনি। কিন্তু সাড়ে তিন ঘণ্টায় আমাদের গুলি ফুরিয়ে যায়। এরপর চারটি ব্যারাকে পাকিস্তানি বাহিনী আগুন ধরিয়ে দেয়। সারারাত তারা গুলি ও কামানের গোলা ছোড়ে৷’

পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর

তৎকালীন আইজিপির দেহরক্ষী আব্দুল আলী বলেন, ‘রাত ১১টা ৩০ মিনিটে আমি বঙ্গবন্ধুর ছেলে শেখ কামালের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনা পাই আর তখন পাগলা ঘণ্টা বাজিয়ে ফোর্স জমায়েত করি। তখন চাবি না পেয়ে রাইফেল দিয়ে অস্ত্রাগারের তালা ভাঙ্গা হয়। আমি নিজেই অস্ত্রাগারে ঢুকে সহকর্মীদের হাতে অস্ত্র তুলে দেই। রাত সাড়ে ১২টার দিকে রাজারবাগের কাছে যখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী পৌঁছে যায় তখন আমরা রাজারবাগ থেকে গুলি ছুড়ে যুদ্ধ শুরু করি। তারা কামান ও ট্যাংকের গোলা ছোড়ে। আমরা ৩০৩ রাইফেল দিয়ে জবাব দেই।’

এই মুক্তিযোদ্ধা বলেন, ‘২৬ মার্চ ভোরে যখন পাকিস্তানি বাহিনী রাজারবাগ পুলিশ লাইনের ভিতরে প্রবেশ করে চারতলা ভবনের ছাদে পানির ট্যাংকের নিচে আমরা অনেকে লুকিয়ে ছিলাম। আরো বিভিন্ন জায়গায় ২০/২৫ জনকে পায় তারা। বাকিরা বাইরে চলে যেতে সক্ষম হয়। আমাদের আটক করে বেয়নেট দিয়ে খুচিয়ে নির্মম নির্যাতন করা হয়। আমরা তখন অনেক পুলিশ সদস্যদের লাশ পরে থাকতে দেখি। দেড়শ’র মত পুলিশ সদস্য প্রাণ হারান।’

আব্দুল আলী বলেন, ‘আমাদের ২৮ মার্চ পর্যন্ত বন্দি রাখা হয়। এই সময়ে আমাদের কোন খাবার, এমনকি পানিও দেওয়া হয়নি। এরপর আমাদের ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার ই এ চৌধুরীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে সেখান থেকে ছেড়ে দিয়ে একটি নির্দিষ্ট দিনে কাজে যোগ দিতে বলা হয়। কিন্তু আমরা তা করিনি, পালিয়ে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেই৷’

তারা তিনজনই প্রথমে ভারতে যান, সেখান থেকে ফের বাংলাদেশে প্রবেশ করে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন।

শাহজাহান মিয়া তার তিন ভাইকে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। যুদ্ধ করেন ৯ নম্বর সেক্টরে। তার এক ভাই মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হন। আর আবু শামা ৩ নম্বর সেক্টরের অধীনে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে গুরুতর আহত হন। আব্দুল আলি মেঘালয়ে প্রথমে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করেন। এরপর ময়মনসিংহ এলাকায় যুদ্ধে অংশ নেন।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তারা তিনজনই চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর অবসরে যান। তবে এরমধ্যে আব্দুল আলীকে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বিচারের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। আব্দুল আলী বলেন, ‘১৯৭৭ সালে জিয়ার সময়ে স্পেশাল মার্শাল ল’ ট্রাইবুন্যালে আমাকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়। ২৫ মার্চ রাজারবাগে পাগলাঘণ্টা বাজানো, অস্ত্রাগার ভাঙ্গার অপরাধে আমাকে তখন ফাঁসিতে ঝোলানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়৷ পরে চাকরিচ্যুতির শর্তে আমি প্রাণে বেঁচে যাই।’

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here