রাজধানীর কাওরান বাজার সংলগ্ন হাতিরঝিলের একটি পাশ দখল করে গড়ে উঠেছে তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) অফিস ভবনটি। সৌন্দর্যমণ্ডিত হাতিরঝিলে এই ভবনটিকে ‘ক্যান্সার’ উল্লেখ করে অনেকদিন থেকেই তা ভেঙ্গে ফেলতে বিজিএমইএকে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। কিন্তু তারপরও দিনের পর দিন নানা টালবাহানায় ভবনটি ভাঙ্গেনি বিজিএমইএ। এরমধ্যে বেশ কয়েকবার তারা হাইকোর্ট থেকে ভবন ভাঙ্গার জন্য সময়ও নিয়েছে। কিন্তু ভাঙ্গার কাজ কার্য কর হয়নি।

সর্বশেষ আজ মঙ্গলবার ভবন ভাঙতে ভবিষ্যতে আর সময় চাওয়া হবে না-এই মর্মে সংগঠনটির কাছ থেকে মুচলেকা পাওয়ার শর্তে তাদের সময়ের আবেদন বিবেচনা করার আশ্বাস দিয়েছেন আপিল বিভাগ। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের চার সদস্যের বেঞ্চ এ নির্দেশ দেন।

এ বিষয়ে বিজিএমইএ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা সময় চেয়ে আবেদন করেছি। আদালত আমাদের কাছে মুচলেখা চেয়েছে। এখন আমাদের আইনজীবী ও অন্যান্য সদস্যদের সাথে কথা বলে সিদ্ধান্ত নেব। তাই এর আগে আমি কিছুই বলতে পারছি না।’

কিন্তু কেন এই ভবনকে অবৈধ বলা হচ্ছে, আসুন জেনে নেওয়া যাক তার কিছু বিষয়।

১৯৯৮ সালের ২৮ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিজিএমইএ ভবনের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন। এর নির্মান শেষ হলে ২০০৬ সালের ৮ অক্টোবর বিজিএমইএ ভবন উদ্বোধন করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। এরপর বহুবার নানা উপলক্ষে অনেক মন্ত্রী, এমপি, উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তারা বিজিএমইএ ভবনে গিয়েছেন। কিন্তু তারা কেউ ভবনের অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন তোলেননি।

ভবনটি যে অবৈধভাবে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) অনুমোদন ছাড়াই বেগুনবাড়ি খালের (বর্তমান হাতিরঝিল) একটি অংশ ভরাট করে গড়ে উঠেছে তা প্রথম চাউর হয় ২০১০ সালে। ইংরেজি দৈনিক ‘নিউ এজ’ এর এক প্রতিবেদনে এ বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। ওই দিনই প্রতিবেদনটি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ডি এইচ এম মনিরউদ্দিন আদালতে উপস্থাপন করেন। এর প্রেক্ষিতে পরদিন বিজিএমইএ ভবন কেন ভাঙ্গার নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে হাইকোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রুল জারি করেন। অবশেষে ২০১১ সালের ৩ এপ্রিল বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চ বিজিএমইএ ভবন সংগঠনটির নিজস্ব অর্থায়নে ভেঙ্গে ফেলার নির্দেশ দেন। একইসঙ্গে এটি নির্মানের আগে ওই স্থানের ভূমি যে অবস্থায় ছিলো তা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতেও নির্দেশ দেওয়া হয়।

গত বছরের ৫ মার্চ আপিল বিভাগ বিজিএমইএ ভবন ভাঙার রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে (রিভিউ) করা আবেদন খারিজ করে দেন। তখন ভবন ভাঙতে কত দিন সময় লাগবে, তা জানিয়ে আবেদন করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন আদালত। পরে বিজিএমইএ কর্তৃপক্ষ ভবন সরাতে তিন বছর সময় চেয়ে আবেদন করেন। ওই আবেদনের শুনানি নিয়ে ২০১৭ সালের ৮ এপ্রিল বিজিএমইএ ভবনটি ভাঙতে কর্তৃপক্ষকে সাত মাস সময় দেন আপিল বিভাগ।

কিন্তু এই সময়ে বিজিএমইএ তাদের ভবন ভাঙতে পারেনি। উপরন্তু ফের আবেদন করায় আবারও তাদের ছয় মাস সময় দেন আপিল বিভাগ। কিন্তু তারপরও চলতি বছরের ২৫ মার্চ আবার এক বছর সময় চেয়ে আবেদন করেন ভবন কর্তৃপক্ষ।

এ বিষয়ে গত বছর অক্টোবরে ‘নদী-জলাধার রক্ষা কর, কৃষিজমি-বন-পাহাড় বাঁচাও’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় বিশিষ্টজনরা বিজিএমইএর কড়া সমালোচনা করেন। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘বিজিএমইএ ভবনের মালিক যদি আমি বা আমার মতো সাধারণ মানুষ হতো, তবে কি তা এত দিন টিকে থাকত? এই অবৈধ ভবন শক্তিশালী ব্যক্তিদের। আর সে জন্যই তা এত দিন টিকে আছে।’

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক এম শাহজাহান মণ্ডল বলেন, ‘আমাদের বড় ধরনের সুশাসনের অভাব আছে। আর এ জন্যই নদী-ভূমি দখল হচ্ছে। পরিবেশ বিনষ্ট হচ্ছে।’

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here