সেটা ২০১৪ সালের কথা। সবেমাত্র বিশ্ববিদ‍্যালয়ের তৃতীয় বর্ষে পা দিয়েছি। জানুয়ারির দিকে নিলয় ফোন দিয়ে বললো- ‘দোস্ত, একটা ছেলের সাথে তোর পরিচয় করিয়ে দিতে চাই। তোর সাথে ওর আইডিয়া ভালো জমবে।’ শুনে প্রথমে তেমন পাত্তা দিলাম না। নিলয়ের সব কথা ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে বলার একটা অভ‍্যাস আছে। যা-ই হোক, কিছুদিন পর হঠাৎ আবার ফোন এলো। অগত‍্যা একদিন সকালে সেই ছেলের সাথে দেখা করতে গেলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সায়েন্স লাইব্রেরির পাশের টং দোকানে। ছেলেটার নাম আয়মান সাদিক।

তার আচার ব‍্যবহার অমায়িক। প্রচণ্ড ধার্মিক এবং ভদ্র স্বভাবের। একটা ল‍্যাপটপ বের করে সে পাওয়ার পয়েন্টে প্রেজেন্টেশন শুরু করে দিল। আমি তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলাম কেবল পাওয়ার পয়েন্ট ব‍্যবহার করে ছেলেটা শিক্ষামূলক একটা ওয়েবসাইটের আইডিয়া পুরো জীবন্ত করে তুলেছে। আমাকে বললো তার সাথে কাজ করতে। আমিও কিছুটা ইতস্তত করা সত্ত্বেও রাজি হয়ে গেলাম।

পরদিন দেখি আয়মান একটা গ্রাফিক্স ট‍্যাব নিয়ে আমার ডিপার্টমেন্টে হাজির! কী মুসিবত! এই ছেলে দেখি পিছু ছাড়বে না! আমি আমতা আমতা করে ট‍্যাবটা হাতে নিলাম। বাসায় গিয়ে কম্পিউটারে বসে বসে বানালাম আমার জীবনের প্রথম অনলাইন ভিডিও। সেটা ইউটিউবে দিয়ে আয়মানকে দেখলাম। ছেলেটা প্রশংসা করে ভাসিয়ে দিল। (মূলত কেউ যদি কাশিও দেয় তাও আয়মান তার কাশি দেয়ার স্টাইলটার একটা ভূয়সী প্রশংসা করে বসবে।)

বেশ কিছুদিন ধরে চললো বাসায় বসে বসে ভিডিও বানানোর সেই কাজ। কিন্তু সেই ভিডিওগুলো মনমতো হচ্ছিলো না করোরই! হঠাৎ ২০১৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে শুনলাম, আয়মান তার ওয়েবসাইট বানানোর কাজ শেষ করে ফেলেছে। রাইদ নামের একজন অসাধারণ কোডার, প্রায় এক বছর দিন-রাত কাজ করে সাইটটা তৈরি করেছে। তখনো সাইটটি পাবলিশ করা হয়নি। আমি জীবনে প্রথমবারের মতো ঢুকলাম www.10minuteschool.কম এ! নিমেষেই মুগ্ধ হয়ে গেলাম। আয়মান প্রায় এক বছর খেটে-খুটে টিউশনির টাকা খরচ করে দাঁড় করিয়েছে এ সাইট। কিনে ফেলেছে একটা ক‍্যামেরা এবং লাইট। ব‍্যস! শুরু হয়ে গেল ১০ মিনিট স্কুলের প্রথম স্টুডিও!

কলাবাগানের এক গলির চিপায় প্রতি শুক্রবার আমাদের শুটিং হতো। দিনভর চলতো আড্ডা, খাওয়া-দাওয়া। সেখানে ক‍্যামেরা এবং সাউন্ডের কাজ করতো শামস এবং জিহান। দুজনেই তখন আইবিএ-এর প্রথম বর্ষে পড়তো। আমরা চারজন মিলে প্রতি সপ্তাহে ভিডিও প্রসব (তৈরি) করতে লাগলাম। সেই ভিডিও আপলোড হলো ১০ মিনিট স্কুলের সাইটে। মানুষজনের কমেন্ট দেখে উৎসাহ শতগুণ বেড়ে গেলো। কিন্তু সমস‍্যা হয়ে দাঁড়ালো ভিডিও এডিটিংয়ের কাজ নিয়ে। তখন রক্ষাকর্তা হয়ে আমাদের দলে যোগ দিল রামিম নামের অত‍্যন্ত সুন্দর দেখতে একটা ছেলে।

রামিমকে বলা হয় গ্রামার নাজ্জি। কেউ এক লাইন ইংরেজি বললে সে ১০টা ভুল বের করে ফেলবে। ছেলেটা ভিডিও এডিটিং করার জন‍্য কিছুদিন আগে ৬৪ হাজার টাকা দিয়ে একটা গ্রাফিক্স কার্ডও কিনে ফেলে! পিকশনারি খেলায় রামিমকে হারানো অসম্ভব! বর্তমানে সে সদ‍্য সিংগেল হওয়া জীবন উপভোগে ব‍্যস্ত।

শামস আমাদের অসাধারণ ট‍্যালেন্ট! কম্পিউটারের যত বিদঘুটে কঠিন সফটওয়ার আছে তার প্রায় সবই তার নখদর্পণে। আমাদের অধিকাংশ ভিডিও এডিটিংই হয় এই রামিম ও শামসের হাতে। জিহান, তার অন‍্যতম দায়িত্ব ভিডিও ছাড়ার আগে সাউন্ড এডিটিং করা। আরেকটা সম্পদের নাম সাদমান সাদিক। যেকোন মোবাইল অ্যাপের পরের ভার্সন যেমন আগেরটার থেকে ভালো হয়; সাদিক পরিবারেও সেই ঘটনা ঘটেছে। সাদমান সাদিক তার বড় ভাই আয়মান সাদিককে মোটামুটি সবকিছুতেই হার মানায়। তার পাওয়ার পয়েন্টের কিছু কিছু টিউটরিয়াল বিদেশেও ভাইরাল হয়েছে! সঙ্গে রয়েছে অ্যানিমেটর মেহিদী, অ্যানিমেশন যার সুপার পাওয়ার। বন্ধুরা তাকে ডাকে সুপার হিরো।


এমনই কিছু ছেলে বানাতে থাকে তাদের স্বপ্নের ১০ মিনিটের স্কুল। পরবর্তীতে যোগ দেয় রাতুল, শুভ, ইরফান, আকাশ, সালমান। আর পর্দার পেছনে আছে আরো ২০ থেকে ৩০ জন। তবে প্রথম প্রথম আমরা সবাই টাকা-পয়সা নিয়ে খুব চিন্তায় ছিলাম। এতো বড় ওয়েবসাইট দেখাশোনা করতে অনেক টাকার খেলা। সেই সমস‍্যার সমাধান হলো মুঠোফোন কোম্পানি রবির হাত ধরে। রবি এসে আমাদেরকে জ্বালিয়ে দিতে থাকলে আরো বেশি আপন শক্তিতে!

আস্তে আস্তে আমাদের স্বপ্নটা বাস্তব হতে থাকলো। এখন আমরা আরো বড় স্বপ্ন দেখি। একদিন শুধুমাত্র ১০ মিনিটের স্কুলে বসেই বাংলাদেশের সবাই পড়াশোনা করবে। প্রয়োজন হবে না কোনো কোচিং সেন্টারের। দেশের আনাচে-কানাচের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্লাসে দেখানো হবে আমাদের ভিডিও। সরকার এসে আমাদের সাহায‍্য করবে এই দেশটাকে বদলে দিতে।

এখন প্রায়ই মনে হয় ২০১৪ সালের সেই সকালটার কথা। টংয়ের দোকানে চা খেতে খেতে অসাধারণ একটা কিছুতে লেগে গিয়েছিলাম। এখন সেটা সবচেয়ে বড় নেশাতে পরিণত হয়েছে।

(লেখাটি ১০ মিনিট স্কুলের ব্লগ থেকে নেয়া)

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here