আমরা যখন ছোট ছিলাম, পড়াশুনা ছিল মহাআনন্দের বিষয়। কিন্তু আস্তে আস্তে আনন্দের বিষয়টা গেল চাপের, নিরান্দের। আমাদের মনে হতে লাগল কখন স্কুল ছুটি হবে, কখন ব্ল্যাকবোর্ডে শিক্ষকের অর্থহীন আকিবুকি শেষ হবে। কিন্তু এই নীরস পড়াশুনাটাও যে আনন্দ করে শেখা যায় তা আমাদের সামনে নিয়ে এসেছেন এক তরুণ, নাম আয়মান সাদিক। তবে কাজটা এতো সহজ ছিল না। গল্পটা শুনি তার মুখেই।

একদম শুরুতে আমি স্টুডেন্ট পড়াতাম, একবার এক স্টুডেন্ট অ্যাডমিশনের সময় এসে জানায়, তাকে ৭ হাজার টাকা দিয়ে তার বাবা ঢাকায় পাঠিয়েছে। অথচ কোচিংয়ের ফি ১৩ হাজার টাকা। আমার কাছে জানতে চাইলো- ‘আমি এখন কী করবো?’ আমি তখন ভাবলাম, কোচিংকে যদি ৫০ পার্সেন্ট ডিসকাউন্ট দিয়ে ভর্তি করাতেও বলি, তার ঝামেলা মিটবে না। কারণ সে থাকবে কোথায়, খাবে কী? আসলে একজন-দুইজন না, প্রতিবছরই এরকম ২০ থেকে ২৫ জন স্টুডেন্ট আমার কাছে আসতো, যারা টাকার অভাবে পড়তে পারছে না। সেখান থেকেই মনে হলো আমি যদি এমন একটা ব্যবস্থা করতে পারি, যেখানে ফ্রিতে অনলাইনে যে কোনো স্টুডেন্ট তাদের রিসোর্স পাবে, তাহলে তো ভালো হয়।

এক. কোনো টাকা লাগছে না, সম্পূর্ণ ফ্রি। দুই. এটা অনলাইনে আপনি ঢাকায় থাকেন আর যেখানেই থাকেন, সব জায়গা থেকেই এক রকম শিক্ষা দেয়া যাচ্ছে। তখন থেকেই ফ্রি অনলাইন এডুকেশন প্ল্যাটফর্ম বানানোর পরিকল্পনা শুরু হয়। তখন আমার ইউনিভার্সিটির প্রথম বর্ষ শেষ, দ্বিতীয় বর্ষে ভর্তি হয়েছি। এরপর আরো দুই বছর লেগেছে, বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে হয়েছে, বিভিন্ন ওয়েব ডেভেলপমেন্ট কোম্পানির কাছে যাই, তারা টাকা নেয়, ঠিক মত কাজ করে না। অবশেষে আমরা মে মাসের ১৭ তারিখ ২০১৫ সালে শুরু করি।

এ কাজের মূল উদ্দেশ্য ছিল দুইটা বাঁধা দূর করা, অর্থনৈতিক বাঁধা এবং ভৌগোলিক বাঁধা। এ দুইটা বাঁধার কারণেই বাংলাদেশের স্টুডেন্টরা ঠিক মত এডুকেশন পাচ্ছে না। আরো একটা বাঁধা আমার মনে হয়, সেটা হচ্ছে ইনফরমেশন বাঁধা। কারণ পড়ানোটা যত সুন্দর করে বুঝানো যায়, যত সুন্দর করে শেখানো যায়, অনুপ্রেরণা দেয়া যায়, এ কাজটা এ ব্যাপারটা হচ্ছিলো না। ফ্রি করলে অর্থনৈতিক বাঁধা নেই, অনলাইনে করলে ভৌগোলিক বাঁধা নেই, আর আমরা চাচ্ছিলাম বিভিন্ন রকম ইন্টার‍্যাক্টিভ কন্টেন্ট আনতে। কারণ বাংলাদেশে এরকম কন্টেন্ট আগে ছিল না। যেমন- স্মার্ট বুক আছে, লাইভ ক্লাস আছে, যেখানে শুধুমাত্র ওয়ান ওয়ে কমিউনিকিশন না, টু ওয়ে কমিউনিকেশন হয়। তো সেখান থেকেই তিনটা মূল বাঁধা দূর করার জন্য ১০ মিনিট স্কুলের সূচনা। সব কিছু পাবেন এখানে সব সময়- ক্লাস ওয়ান থেকে শুরু করে একেবারে ক্লাস ১২ পর্যন্ত, এরপর অ্যাডমিশন, ইউনিভার্সিটির কোর্সও নেয়া শুরু করেছি। আরো নতুন নতুন স্কিল ডেভোলপমেন্ট কোর্স আসছে।

তবে শুরুর দিকে আমার কিছু স্টুডেন্ট ছিল, আমি বিভিন্ন অনার্স স্টুডেন্ট পড়াতাম, তারাই জয়েন করলো টেন মিনিট স্কুল-এ। শুরুতে ভলেন্টিয়ার সাপোর্ট ছিল, আস্তে আস্তে তাদের মাধ্যমে টিমটা বড় হতে শুরু করলো। এখন আমরা ৫৩ জনের একটা বিশাল টিম এখানে কাজ করছি। ৪০ জনের বেশি শিক্ষক আছেন এখানে। রাইটার আছেন প্রায় ৩০ জনের মত। সব মিলিয়ে ১৫০ জনের একটা বিশাল টিম কাজ করছে।

আমরা বাঙালিরা কিন্তু সব সময় এই কথাটা বলি- ‘ভাই ১০ মিনিটে আসছি’। পাঁচ ঘণ্টা লাগলেও ১০ মিনিট, এক মিনিট লাগলেও ১০ মিনিট। আমরা ১০ মিনিটে সব কাজ করতে চাই, সেখান থেকেই চিন্তা করা, তাহলে পড়ালেখা কেন ১০ মিনিটে করবো না। তাই প্ল্যান করলাম যা শিখতে চাও, যা প্র্যাকটিস করতে চাও সব ১০ মিনিটে, সেখান থেকেই নামটা ঠিক করি- ‘10 Minute School’।

যদিও মাত্র ১০ মিনিটে ব্যাপারটা করা অনেক বড় একটা চ্যালেঞ্জ, নতুন কেউ এলে প্রথমে একটু সমস্যার মধ্যে পড়ে যায় যে, মাত্র ১০ মিনিটে করতে হবে। অনলাইনে আপনার একটা পড়ালেখার কন্টেন্ট, ঠিক পাশে একটা গানের ভিডিও, তার ঠিক পাশে একটা নাচের ভিডিও ইত্যাদি ইত্যাদি। ওই ভিডিওগুলো অবশ্যই অনেক ইন্টারেস্টিং। আর সেটা ফেলে রেখে ঘন্টার পর ঘণ্টা ক্লাস কেউ করতে চাইবে না। তাই চিন্তা করলাম যত ছোট করবো তত ভালো, আমার শুরু দিকের ভিডিওগুলো এক মিনিটের। আমি টাইমার নিয়ে বসতাম, ৫০ সেকেন্ড এলেই তাড়াতাড়ি শেষ করে ফেলার চেষ্টা করতাম।

তবে কাজটা সহজ ছিল না। আমি তখন একটা ওয়েব ডেভোলপার ফার্মকে ৫০ হাজার টাকা অ্যাডভাঞ্চ দিয়েছিলাম। ওই সময় ৫০ হাজার টাকা জোগাড় করা অনেক কঠিন ছিল। কারন টিউশনি করে টাকা উপার্জন করতাম। তারা ছয় মাস আমাকে ঘুরালো, কিছু পেলাম না, বেশ হতাশ হলাম। এরপর অর্ধেক পেমেন্ট দিলাম ২৫ হাজার টাকা। আবার ঘুরালো, কিছু করে না। তাই শুরুতে যখন আপনি কাজ করবেন কাজ করা অনেক কঠিন হয়ে যায়।

আমার প্রথম ভিডিওগুলো ‘ফর্মুলা কিন্তু একটাই’- টেন মিনিট স্কুলের জন্য বানানো হয়নি, অন্য একটা কাজের জন্য বানানো হয়েছিল। আসলে শুরুর দিকে কাজ পাওয়া অনেক কঠিন। এখন আমি কারো জন্য একটা ভিডিও বানিয়ে দিলে সেটা হয়তো দেখবেও না, সরাসরি আপলোড করে দিবে। এখন সফটওয়্যার ফার্ম এসে বলে, তারা কাজ করে দিবে। অথচ শুরুর দিকে পুরাটাই উল্টো ছিল। আমিই মানুষের পিছে ঘুরেছি। আমার কাছে মনে হয় এটা একটা সাইকেল। আপনি একটা নতুন কাজ যখন শুরু করবেন বেশিরভাগ মানুষই আপনাকে চিনে না। তাই বলি মানুষ পাত্তা দিবে না, পাত্তা আদায় করে নিতে হবে।

কে এই আয়মান সাদিক
আয়মান সাদিকের জন্ম ১৯৯২ সালের ২ সেপ্টেম্বর। তার গ্রামের বাড়ি কুমিল্লায়। বাবা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তায়েব বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা এবং মা শারমিন আক্তার একজন গৃহিণী। ছোটবেলায় আয়মান পোকেমন (গেইম) মাস্টার হতে চেয়েছিলেন। অথচ হয়েছেন একজন শিক্ষক, ট্রেনার ও মোটিভেশনাল স্পিকার। তিনি বিজ্ঞান বিভাগে শুরু করলেও ভর্তি হন আইবিএতে।

১০ মিনিট স্কুলের ওয়েবসাইটে রয়েছে মূলত ইংরেজি, গণিত এবং বিজ্ঞানের নানা বিষয়, যা একাডেমিক সিলেবাসের আওতাভুক্ত। বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তিসহ চাকরির বিভিন্ন পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্যও রয়েছে টিউটিরিয়াল। সেই সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ের ওপর কীভাবে দক্ষতা বাড়ানো যায়, তা নিয়েও ভিডিও পাওয়া যায়। এ ছাড়া IETS, SAT, GMAT-এর টিউটিরিয়াল মিলছে ১০ মিনিট স্কুলে।

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here