বাংলাদেশের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’ আগামী ২৪ এপ্রিল মহাকাশে উৎক্ষেপণ করা হতে পারে। কৃত্রিম উপগ্রহটির নির্মাণে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান ফ্রান্সের থ্যালেস অ্যালেনিয়া স্পেসের বরাত দিয়ে মঙ্গলবার এক টুইটে এমনটাই জানিয়েছে স্যাটেলাইট ও প্রযুক্তিবিষয়ক সংবাদমাধ্যম আমেরিকা স্পেস। যাকে বলা হচ্ছে, স্বাধীনতার পর দেশের বিজ্ঞান অগ্রযাত্রায় সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ। সুতরাং এখন থাকতেই এই স্যাটেলাইটের বিভিন্ন দিক নিয়ে ভাবতে শুরু করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে সাধারণ মানুষ যারা কৃত্রিম উপগ্রহ বোঝেন না, তাদের অনেক কৌতুহল ও প্রশ্ন রয়েছে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট নিয়ে। তাদের অনেকেরই প্রশ্ন, দেশ ও জনগণের কী উপকারে আসবে এটি। আসুন খানিকটা হিসেব কষা যাক দেশের সবচেয়ে বড় এই বিজ্ঞান মহাযাত্রার দেনা-পাওনার।

স্যাটেলাইট আসলে কী?
স্যাটেলাইট বা উপগ্রহ হচ্ছে এমন এক যন্ত্র যা মহাকাশে পৃথিবীর কক্ষপথে প্রায় ২০০০০-৩৬০০০ কিলিমিটার উপরে স্থাপন করা হয়, যা নিয়ন্ত্রণ করা হয় কম্পিউটার প্রোগ্রামের মাধ্যমে। এই মুহূর্তে পৃথিবীর কক্ষপথে বিভিন্ন দেশের উৎক্ষেপিত প্রায় ৩৬০০ কৃত্রিম উপগ্রহ রয়েছে। যাদের মাঝে আমাদের প্রতিবেশি ভারত এবং পাকিস্তানও রয়েছে। যদিও স্যাটেলাইটের কিন্তু বেশ কিছু প্রকারভেদ আছে। এক স্যাটেলাইট দিয়ে সচরাচর একটা কাজই করা হয়। সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা হয় যোগাযোগ ব্যবস্থা বা টেলিকমিউনিকেশনের কাজে। এছাড়া প্রযুক্তিগত উন্নয়ন বা জ্যোর্তিবিদ্যা সংক্রান্ত কাজেও ব্যবহার হয় স্যাটেলাইট। একইসঙ্গে নৌ সিগন্যাল কিংবা সামরিক কাজেও ব্যবহার হচ্ছে এগুলো।

বঙ্গবন্ধু-১ স্যটেলাইট তথ্যাবলী
বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট মহাকাশে উৎক্ষেপণ এর জন্য ফ্রান্সের থ্যালেস অ্যালেনিয়া স্পেসের সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। চুক্তি অনুযায়ী, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের কাঠামো, উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা, ভূমি ও মহাকাশের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, ভূ-স্তরে দুটি স্টেশন পরিচালনা ও ঋণের ব্যবস্থা করবে ফরাসি প্রতিষ্ঠানটি। উপগ্রহ উৎক্ষেপণের মূল কাজ স্যাটেলাইট সিস্টেম কেনার জন্য খরচ হবে এক হাজার ৯৫১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। এই ব্যায়ের মধ্যে প্রয়োজনে দ্বিতীয় আরেকটি স্যাটেলাইট সিস্টেম এবং রকেট উৎক্ষেপণের খরচও যোগ করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণের জন্য রাশিয়ার উপগ্রহ কোম্পানি ইন্টারস্পুটনিকের কাছ থেকে কক্ষপথ (অরবিটাল স্লট) কেনা হয়েছে। মহাকাশের ১১৯ দশমিক ১ পূর্ব দ্রাঘিমায় প্রায় ২১৯ কোটি টাকায় ১৫ বছরের জন্য এই কক্ষপথ কেনা হয়। স্যাটেলাইট পাঠানোর কাজটি বিদেশে হলেও এটি নিয়ন্ত্রণ করা হবে বাংলাদেশ থেকেই। এজন্য গাজীপুরের জয়দেবপুর ও রাঙ্গামাটির বেতবুনিয়ায় দুটি গ্রাউন্ড স্টেশন নির্মাণের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। যা নিয়ন্ত্রণে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশনের যন্ত্রপাতিও আমদানি করেছে বিটিআরসি।

সেবাসমুহ
এই কৃত্রিম উপগ্রহ টেলিভিশন চ্যানেল, ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান, ভি-স্যাট ও বেতারসহ ৪০ ধরনের সেবা দেবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ট্যারিস্ট্রিয়াল অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সারা দেশে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা বহাল রাখতে ই-সেবা নিশ্চিত করবে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট। এছাড়া দেশের টিভি চ্যানেলগুলো স্যাটেলাইট ভাড়া বাবদ বছরে ১২৫ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। এই স্যাটেলাইট চালু হলে সে টাকা এখন থেকে দেশেই থেকে যাবে। একই সঙ্গে এই স্যাটেলাইটের তরঙ্গ ভাড়া দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা আয়েরও সম্ভাবনা রয়েছে। এই স্যাটেলাইটের কার্যক্রম পুরোপুরিভাবে শুরু হলে আশপাশের কয়েকটি দেশে টেলিযোগাযোগ ও সম্প্রচার সেবা দেয়ার জন্য জিয়োসিক্রোনাস স্যাটেলাইট সিস্টেম (৪০ ট্র্যান্সপন্ডার, ২৬ কেইউ ব্র্যান্ড, ১৪ সি ব্যান্ড) এর গ্রাউন্ড সিস্টেমসহ সব ধরনের সেবা পাওয়া যাবে।
সামরিক খাতেও এই স্যাটেলাইট দারুণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষ করে শত্রুর বিমান আক্রমণের হুমকি মুখে থাকা সামরিক যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য এবং ভবিষতে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে সংযুক্ত হতে যাওয়া ইউএভি বহরে এই স্যাটেলাইট সিস্টেম হবে অপরিহার্য।

উল্লেখযোগ্য কারিগরি বিশেষত্ব
বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটে সর্বমোট ৪০টি ট্রান্সপন্ডার থাকবে। এর মধ্যে ২৬টি কেইউ ব্যান্ডের এবং ১৬ টি সি ব্রান্ডের। একটি ট্রান্সপন্ডারের ক্যাপাসিটি হবে ৩৬ মেগাহার্টস অথবা প্রতি কেকেন্ডে ৫৫ মেগাবাইট। যেসব ব্যান্ড এন্টেনা ব্যবহার করা হবে এই স্যাটেলাইটে, তার মধ্যে ৩টি হবে কেইউ ব্যান্ড এন্টেনা এবং অপর একটি সি ব্যান্ড এন্টেনা। এর বাইরে এই ৪০টি ট্রান্সপন্ডারের ২০টি থাকবে বাংলাদেশ এবং এর আশেপাশের কিছু অঞ্চলমুখী এবং বাকি ২০টি বাংলাদেশের বাইরের অঞ্চলের জন্য। এই স্যাটেলাইট সিস্টেমের লাইফ স্প্যান ধরা হয়েছে ১৫ বছর।

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here