ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম হচ্ছে যাকাত। পবিত্র কোরআনেও ‘যাকাত’ শব্দটি এসেছে ৩২ বার। নামাজের পরেই এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নবী মোহাম্মদ যখন ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে মদিনায় গিয়ে ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা চালু করেন, তখন থেকেই যাকাতের প্রচলন। যদিও রাষ্ট্র ব্যবস্থায় পরিবর্তন এসেছে। এখনকার নিয়মে নাগরিকরা সরকারকে আয়কর দেন, যা রাষ্ট্রের মূল চালিকা শক্তি। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে অনেক মুসলিম দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়েন। কারণ তারা আবার নিজের সম্পদের একটি অংশ যাকাত হিসেবেও গরীব-দুঃখির মাঝে বণ্টন করেন।

ইসলামী চিন্তাবিদরা অবশ্য বলছেন, আয়কর (ইনকাম ট্যাক্স) দিলেও তা যাকাত থেকে বাদ যাবে না। কারণ আয়কর দিতে হয় ইনকামের ওপর আর যাকাত দিতে হয় সঞ্চিত সম্পদের উপর। এ বিষয়ে সবচেয়ে ভালো যুক্তি দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতির অধ্যাপক ড: মুহাম্মদ ইব্রাহিম। তিনি বলেন, ‘আয়কর হচ্ছে রাষ্ট্রীয় সেক্যুলার ট্যাক্স। কিন্তু যাকাত হচ্ছে রিলিজিয়াস (ধর্মীয়) ট্যাক্স। আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষার ব্যাপারটা প্রধান্য দিতে হলে তাকে যাকাত দিতেই হবে। মূলত সম্পদের শুদ্ধতা বা হালাল করার জন্য যাকাত দেয়া অপরিহার্য। ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে সামাজিক বৈষম্য কমিয়ে আনার চিন্তা থেকে ইসলামে এ ব্যবস্থা চালু হয়েছে।

ইসলামী চিন্তাবিদরা বলেন, আয়কর এবং যাকাত- দুটোই রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা। তবে পার্থক্য হচ্ছে, যাকাতের ক্ষেত্রে ইসলামী রাষ্ট্র হতে হবে এবং আয়করের ক্ষেত্রে ইসলামী শরীয়ার বাধ্যবাধকতার কোনো বিষয় নেই। অধ্যাপক ইব্রাহিম বলেন, ‘যাকাত ব্যবস্থা ইসলামী রাষ্ট্রের আর্থিক ও রাজস্ব সংক্রান্ত বিধান। এ রাষ্ট্রে আয়করের ব্যবস্থা নেই। তাই ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা থাকলে আয়কর দিতে হতো না। যাকাতই হয়ে যেতো আয়করের বিকল্প।

একই যুক্তি দিয়েছেন আরেক ইসলামী চিন্তাবিদ ড. শমসের আলীও। তিনি জানান, ইসলামের দর্শন অনুযায়ী রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যাকাত আদায় এবং সেটির ব্যবস্থাপনা করার কথা। কিন্তু কোনো দেশ যদি ইসলামিক রাষ্ট্র না হয়, তাহলে সেখানকার নাগরিকরা নিজ উদ্যোগে তার উদ্বৃত্ত সম্পদ হিসাব করে যাকাত দেবেন।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন- ‘যাকাত হলো কেবল ফকির, মিসকিন, যাকাত আদায়কারী ও যাদের চিত্ত আকর্ষণ করা প্রয়োজন তাদের, দাস মুক্তির জন্য, ঋণগ্রস্তের জন্য, আল্লাহর পথে ও মুসাফিরদের জন্য (যারা সফরে যেয়ে সর্বস্ব হারিয়ে ফেলেছে)— এই হল আল্লাহর নির্ধারিত বিধান। আল্লাহ সর্বজ্ঞ-প্রজ্ঞাময়।’ সুরা তাওবাহ, আয়াত-৬০

এ আয়াতে নির্ধারিত আটটি খাতে যাকাতের টাকা ব্যয় করা যায়। আপনার কাছের আত্মীয় স্বজন যারা আর্থিকভাবে দুর্বল তারাই আপনার যাকাতের বেশী হকদার।

ইসলাম ধর্মানুযায়ী, প্রতি বছর ব্যয় নির্বাহের পর কোনো মুসলিমের কাছে যদি উদ্বৃত্ত সম্পদ থাকে, তাহলে সেখান থেকে আড়াই শতাংশ হারে যাকাত দিতে হবে। কোন খাতে কী পরিমাণ যাকাত দিতে হবে এবং কারা যে যাকাত পাবার যোগ্য সে বিষয়গুলো ইসলাম ধর্মে বিস্তারিত বিবরণ দেয়া হয়েছে।

গত দেড় হাজার বছরে পৃথিবীতে রাষ্ট্র ব্যবস্থায় অনেক কিছু পরিবর্তন হলেও ইসলামের দৃষ্টিতে যাকাতের মূল দর্শন পরিবর্তন হয়নি। কারো কাছে সাড়ে সাত ভরি (৮৫ গ্রাম) স্বর্ণ বা ৫২ তোলা রুপা বা ন্যুনতম তার সমপরিমাণ অর্থ এক বছর ধরে থাকলে তার ওপর যাকাত দেয়া ফরজ। বর্তমান বাজার মূল্যে ৫২ তোলা রুপার সমপরিমাণ অর্থ আনুমানিক ৩৩০০০ টাকা। অর্থাৎ এ পরিমাণ টাকা থাকলে তার ওপর আড়াই শতাংশ হারে যাকাত দিতে হয়।

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here