কয়েক মাস আগে থেকেই বাম চোখে ঝাপসা দেখছিলেন চুয়াডাঙ্গা শহরের মোড়ভাঙ্গা গ্রামের দিনমজুর আহাম্মদ আলী। এক পর্যায়ে চোখে সমস্যা এতটাই বাড়ে যে, একটি এনজিও থেকে ক্ষুদ্রঋণ তুলে চুয়াডাঙ্গা জেলা শহরের ইম্প্যাক্ট মাসুদুল হক মেমোরিয়াল কমিউনিটি হেলথ সেন্টারে যান চিকিৎসা করাতে। গত ৫ মার্চ তার বাম চোখের ছানি অপারেশন করা হয়। যে চোখ বাঁচাতে ঋণ তুলে গিয়েছিলেন চিকিৎসা করাতে, সেই ভুল চিকিৎসার কারণেই চীরতরে হারিয়ে যাবে তার চোখটি। ভুল চিকিৎসার কারণে এখন তার একটি চোখই তুলে ফেলতে হয়েছে।

শুধু আহাম্মদ আলী নন; ইম্প্যাক্ট হাসপাতালের চক্ষু শিবিরে চোখ দেখাতে এসে চোখের সর্বনাশ হয়েছে এমন আরো অন্তত ২০ জনের। তাদের মধ্যে ১৯ জনের একটি করে চোখ তুলে ফেলতে হয়েছে। ভুক্তভোগীরা প্রত্যেকেই দরিদ্র হওয়ায় হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে আইনের আশ্রয়ও নিতে পারছেন না। তারা বলছেন, তাদের প্রায় সবারই ‘দিন আনি দিন খাই’ অবস্থা। গ্রামে থাকেন; শহরে এলেও সেখানে চলাফেরায় অভ্যস্ত নন। ইম্প্যাক্ট হেল্‌থ সেন্টারের বিরুদ্ধে তারা লড়বেন কী করে? এমনকি স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগ পর্যন্ত এসব ঘটনা জেনেও নীরব।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ইম্প্যাক্ট মাসুদুল হক মেমোরিয়াল কমুনিটি হেল্‌থ সেন্টারে তিন দিনের চক্ষু শিবিরের দ্বিতীয় দিন ৫ মার্চ ২৪ জন নারী-পুরুষের চোখের ছানি অপারেশন করা হয়। অপারেশনের দায়িত্বে ছিলেন চিকিৎসক মোহাম্মদ শাহীন। তবে বাসায় ফিরেই ২০ জন রোগীর চোখে ইনফেকশন দেখা দেয়। এসব রোগী ও তাদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ৫ মার্চ অপারেশনের পর ৬ মার্চ তাদের প্রত্যেককেই হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়। বাড়ি ফিরে ওই দিনই কারও বিকেলে, কারও সন্ধ্যায়, কারও বা রাত থেকে চোখে জ্বালা-যন্ত্রণা ও পানি ঝরতে শুরু করে। পরদিনই তারা আবার যোগাযোগ করেন ইম্প্যাক্ট হাসপাতালে। কিন্তু তাদের তখন গুরুত্ব না দিয়ে কোনো রকম চিকিৎসা দিয়ে বাড়িতে ফেরত পাঠানো হয়। যন্ত্রণা অসহনীয় হয়ে উঠলে ফের তারা ইম্প্যাক্টে যান। সেখান থেকে তখন কয়েকজন রোগীকে স্থানীয় এক চক্ষু বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। স্থানীয় ওই চক্ষু বিশেষজ্ঞ তাদের উন্নত চিকিৎসার জন্য জরুরি ভিত্তিতে ঢাকায় গিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দেন। এদের মধ্যে চারজন রোগী নিজেদের উদ্যোগে উন্নত চিকিৎসার জন্য দ্রুত স্বজনদের নিয়ে ঢাকায় আসেন। পরে ইম্প্যাক্ট থেকে ১২ মার্চ একসঙ্গে ১৬ জন রোগীকে ঢাকায় নেওয়া হয়। ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ৫ মার্চের ওই অপারেশনের ফলে এদের চোখের এত ভয়াবহ ক্ষতি হয়েছে যে, ১৯ জনের একটি করে চোখ তুলে ফেলতে হয়েছে। ১৩ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে খামারবাড়ির ইস্পাহানী ইসলামিয়া আই ইনস্টিটিউট অ্যান্ড হাসপাতালে নয়জন এবং ২০, ২১ ও ২২ মার্চে মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধের দৃষ্টি চক্ষু হাসপাতালে ১০ জনের একটি করে চোখ তুলে ফেলতে হয়। এ ছাড়া হায়াতুন নামে এক বৃদ্ধার অপারেশন করা বাম চোখের অবস্থাও ভালো নয়। ঢাকায় দ্বিতীয় দফায় অপারেশন করলেও দৃষ্টিশক্তি ফিরে আসেনি তার। তিনি চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গায় নিজ বাড়িতে যন্ত্রণায় কাঁতরাচ্ছেন।

এ বিষয়ে ইস্পাহানী ইসলামিয়া আই ইনস্টিটিউট অ্যান্ড হাসপাতালের পরিচালক গাজী নজরুল ইসলাম ফয়সাল বলেন, দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে জরুরি রোগী ইসলামিয়া হাসপাতালে রেফার করা হয়। সম্প্রতি চুয়াডাঙ্গার ইম্প্যাক্ট থেকে যেসব রোগী এসেছিলেন, তাদের অপারেশন করা চোখটিতে ‘ইনডোপথালমাইটিস’ নামের জীবাণু ছড়িয়ে পড়েছিল। অপারেশনের সময় অসতর্কতা, ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি অপরিস্কার ও ওষুধসহ বিভিন্ন কারণে এ ইনফেকশন হতে পারে। তবে রোগীদের আরও আগে ঢাকায় আনা হলে হয়তো চোখ বাঁচানো যেত।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভুক্তভোগী এই রোগীদের ঢাকার হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যয় দিয়েই ঘটনার দায় সেরেছে ইম্প্যাক্ট। যদিও সংশ্নিষ্টদের বিচার ও চিরদিনের জন্য অন্ধত্বের ক্ষতিপূরণ দাবি করছেন রোগী ও তাদের স্বজনরা।

যদিও ইম্প্যাক্ট কর্তৃপক্ষ এ ঘটনায় ভুল স্বীকার করে দুঃখ প্রকাশ করেছে। হাসপাতালের পরিচালক ডা. হাসিব মাহমুদ বলেন, ১৬ বছর ধরে তারা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছেন। এই প্রথম এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটল। এতে তারা মর্মাহত। ৪ থেকে ৬ মার্চ চক্ষু শিবির করে মোট ৬০ জন রোগীর ছানি অপারেশন করা হয়। ৫ মার্চ ২৪ জনের মধ্যে ২০ জনের চোখে ইনফেকশন হয়। ইম্প্যাক্টের খরচে এসব রোগীকে ঢাকায় চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। ইনফেকশনের কারণেই ১৯ জনের একটি করে চোখ তুলে ফেলতে হয়েছে।

ডা. হাসিব মাহমুদ বলেন, ১৩ মার্চ আইসিডিডিআরবির ল্যাবে পরীক্ষা করে জানা গেছে, অপারেশনের সময় ব্যবহৃত ‘ট্রাইপেন ব্লু’তে একটা জীবাণু পাওয়া গেছে। সেটি থেকে এই ইনফেকশন হতে পারে বলে ধারণা করছেন তারা। ইম্প্যাক্ট হাসপাতাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান আইরিসের কাছ থেকে ট্রাইপেন ব্লু সংগ্রহ করে। বিষয়টি আইরিসকে জানানো হয়েছে।

জানতে চাইলে আইরিসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রদীপ কুমার সাহা বলেন, ইম্প্যাক্ট থেকে বিষয়টি তাদের জানানো হয়েছে। ট্রাইপেন ব্লু তিনি ভারত থেকে আমদানি করেন। আইসিডিডিআরবির দেওয়া রিপোর্ট ভারতে ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানির কাছে পাঠানো হয়েছে।

এদিকে ঘটনা প্রসঙ্গে চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জন ডা. খায়রুল আলম বলেন, ইম্প্যাক্ট হাসপাতালে অপারেশন করা রোগীদের এসব তথ্য তিনি জানেন না। কেউ তার কাছে অভিযোগও করেননি। এক পর্যায়ে ইম্প্যাক্ট হাসপাতালের পক্ষ নিয়ে তিনি বলেন, হাসপাতালটির বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে কেউ সাংবাদিকদের কাছে তথ্য দিয়েছেন। এত কিছু তো জানা ছিল না। এ ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here