‘জাফর ইকবাল একজন নাস্তিক। তিনি আর যাই হোন না কেন, মুসলিম নন। আগেও হত্যার চেষ্ঠা করা হয়েছে। তখন সফল হয়নি। এবার সফল হয়েছে। এবার মজা দেখ।’ জনপ্রিয় লেখক ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবালের ওপর হামলার পর ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এরকম অপপ্রচার চালায় একটি চক্র। ইতোমধ্যে তাদেরকে শনাক্তও করেছে পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিট।

গত ৪ মার্চ জাফর ইকবালের ওপর হামলার পরপরই একটি গ্রুপ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্ট্যাটাস দিয়ে জঘন্যভাবে উল্লাস করতে থাকে। বিভিন্ন সংবাদপত্রের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হামলা সংক্রান্ত সংবাদের নিচে জাফর ইকবাল সম্পর্কে বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্যের পাশাপাশি ঘটনার অপব্যাখ্যাও দেয় চক্রটি।

নিবিড় তদন্ত করে জঘন্য ও মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর দায়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে চক্রের দুই সদস্যকে। সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে তাদের বিরুদ্ধে রমনা থানায় মামলা হয়েছে। এছাড়া কুৎসা ও নোংরা তথ্য ছড়ানোর ঘটনায় পুলিশের আবেদনের পর ফেসবুক কর্তৃপক্ষ ‘খালিদ বিন ওয়ালিদ’ নামে একটি আইডি বন্ধ করে দিয়েছে।

পুলিশের উচ্চপদস্ত একাধিক কর্মকর্তা জানান, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জাফর ইকবালের ওপর জঙ্গি হামলার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বেশ কয়েকটি আইডি থেকে ঘটনাটিকে সমর্থন জানিয়ে স্ট্যাটাস দেয়া হয়। বিষয়টি নজরে এলে তদন্তে নামে পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিট। এরপর বেরিয়ে আসে ‘খালিদ বিন ওয়ালিদ’ নামে একটি ফেসবুক ও টুইটার আইডি তথ্য। যেখান থেকে জাফর ইকবালকে নিয়ে অতিমাত্রায় বিদ্বেষপূর্ণ প্রচারণা ছড়ানো হয়েছে। এছাড়াও কিছু ফেসবুক ও টুইটার আইডি থেকে আনন্দ প্রকাশ করা হয়েছে।

‘খালিদ বিন ওয়ালিদ’ নামে আইডি পরিচালনা করে মূলত হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জের বিরামচরের বাসিন্দা ইকবাল হোসেন খান। এ আইডির প্রোফাইল ছবি ছিল ইসলামিক স্টেটের (আইএস) সেই কালো পতাকা। ইকবাল এক সময় একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করত। কিন্তু প্রায়ই অনুপুস্থিত থাকায় চাকরি হারায় সে। এরপর থেকে সে নিয়মিত বেনামী আইডি দিয়ে আনসার আল ইসলামের বিভিন্ন লেখা পোস্ট করত। জাফর ইকবালসহ বিশিষ্টজনদের নামেও মিথ্যাচার করে আসছিল ইকবাল।

এসব তথ্য নিয়ে তদন্তে নামে মাঠের পুলিশ। গত ১৩ মার্চ সহকারি পুলিশ সুপার ইশতিয়াক আহমেদের নেতৃত্বে একটি টিম হবিগঞ্জ থেকে ইকবালকে গ্রেপ্তার করে। পরে দুদিনের রিমান্ডে নেয়। তার দেয়া তথ্যের সূত্র ধরেই কামরাঙ্গীরচর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় মাদ্রাসা শিক্ষক আলামিন রুমীকে। তিনিও নামে-বেনামে বিভিন্ন আইডি থেকে জাফর ইকবালসহ বিশিষ্টজনদের সম্পর্কে কুরুচিপূর্ণ স্ট্যাটাস দিতেন। এদের কোনো কোনো স্ট্যাটাসের ভাষা ছিল ভয়ানক অশ্লীল। কোনো কোনোটিতে আবার নোংরা ছবিও শেয়ার করা হয়।

ইকবালের একাধিক বেনামী আইডিতে আনসার আল ইসলামের আধ্যাত্মিক নেতা জসীমুদ্দিন রাহমানির বিভিন্ন লেখা পাওয়া গেছে। তাছাড়া সে একটি পোস্ট শেয়ার করে, যাতে লেখা হয়েছে- ‘জাফর ইকবাল একজন সু-লেখক হতে পারেন, কিন্তু ধর্মের ব্যাপারে তিনি একেবারেই অন্তঃসারশূন্য। ধর্মীয় কোনও বিষয়ে তার কাছ থেকে কোনও উপদেশ গ্রহণ করা আর একটা অন্ধকে পথপ্রদর্শক হিসেবে গ্রহণ করা একই কথা।’ আবার একটি স্ট্যাটাসে সে লিখেছে, ‘জাফর ইকবালের ওপর হামলার ঘটনা সম্পূর্ণ সাজানো নাটক ছিল।’

আরেকটিতে লিখে, ‘বাংলার মুক্তমনাদের জানাতে চাচ্ছি, আপনারাই বলেন, বাংলার একটা অভিজিৎ রায় মারলে হাজার অভিজিৎ রায় জন্ম নেবে। এক জাফর ইকবাল হত্যা করলে হাজার হাজার জাফর ইকবাল জন্ম নেবে। তা হলে আপনারাই এদের হত্যা করে এদেশ নাস্তিকময় করে তুলুন।’ আর রুমীর একটি পোস্ট ছিল- ‘ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ তৈরি করা হয়েছে।’

এদিকে ইকবাল গ্রেপ্তারের পর থেকে তার ভাই রাজীব গা-ঢাকা দিয়েছে। সেও বিভিন্ন বেনামী আইডি থেকে উগ্র মতাদর্শ প্রচার করে আসছিল বলে জানান গোয়েন্দারা।

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here