রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বয়ে গেছে চলতি মৌসুমের প্রথম ঝড়। গতকাল বিকালে হঠাৎ আকাশ কালো করে বয়ে আসে ঝড়ো মেঘ। প্রথম দিকে বৃষ্টি ছাড়াই ধূলিঝড়ে নাস্তানাবুদ হন নগরবাসী। কিছুক্ষণ পর শুরু হয় কালবৈশাখীর তাণ্ডব, সঙ্গে শিলাবৃষ্টি। এতে বাড়িঘর ও দোকানপাটের টিনের চাল, আম-লিচু ও সবজিসহ বিভিন্ন আবাদি জমির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। শিলার আঘাতে দিনাজপুরের পার্বতীপুরে, মাগুরা সদর, সিলেটের ওসমানীনগর ও পাবনার ঈশ্বরদীতে একজন করে চারজন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া যশোরে অভয়নগর উপজেলায় ঝড়ে বিদ্যুতের তারে জড়িয়ে কলেজছাত্রীর মৃত্যু হয়েছে। শিলাবৃষ্টির আঘাতে সারা দেশে আহত হয়েছেন কয়েক শতাধিক।

দিনাজপুর : হঠাৎ শিলাঝড়ের আঘাতে পার্বতীপুরের চৈতি গ্রামে সৈয়দ আলী (৬০) নামে বৃদ্ধার মৃত্যু হয়েছে। বৃষ্টির সময় তিনি ঘরের চালা সংস্কারের কাজ করছিলেন। পার্বতীপুরের পাশাপাশি বীরগঞ্জ উপজেলায় শিলার আঘাতে আহত হয়ে অন্তত ২০ জন হাসপাতালে ভর্তি হন। এর মধ্যে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সৈয়দ আলীর মৃত্যু হয় বলে নিশ্চিত করেছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।

চার ঘণ্টার বৃষ্টিতে ফুলবাড়ীর ঘরবাড়ি, ফসল, ইটভাটাসহ গাছপালাল ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এতে দুই শিশু, ছয় নারীসহ নয়জন গুরুতর আহত হয়েছেন। এর মধ্যে আশঙ্কাজনক অবস্থায় শিশু সানিয়া (৩) ও মজিয়া খাতুন (৪৫) নামের এক নারীকে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

ঈশ্বরদী (পাবনা) : পাবনার ঈশ্বরদীতে শিলাবৃষ্টি শুরু হয় সন্ধ্যা সোয়া ৭টার দিকে। এ সময় উপজেলার লক্ষ্মীকুণ্ডা ইউনিয়নের গৃহবধূ জামিলা বেগম (৫০) বাড়ির পাশের লিচুবাগানে ডালপালা কুড়াতে যান। তখন শিলার আঘাতে তিনি মারা যান। পরে স্বজনরা তার মরদেহ উদ্ধার করে।

রাজশাহী : শুক্রবার সকাল থেকে তাপদাহ বয়ে গেলেও জুমার নামাজের পর আকাশে মেঘ জমতে শুরু করে। বিকাল পৌনে ৩টার দিকে হঠাৎ ঝড় শুরু হয়ে চলে সোয়া ৩টা পর্যন্ত। এতে অনেক এলাকার সাইনবোর্ড, কেবল সংযোগের তার বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বিভিন্ন সড়কে থাকা তোড়ন হেলে পড়ে। দুর্ঘটনার আশঙ্কায় মহানগরীসহ আশপাশের উপজেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ সাময়িক বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ।


রাজশাহী আবহাওয়া অফিসের পর্যবেক্ষক আবদুস সালাম জানান, ঝড় বয়ে গেলেও এটি কালবৈশাখী নয়। সাধারণত বাতাসের গতিবেগ ২০ নটিকেল মাইল হলে তাকে কালবৈশাখী বলা হয়। কিন্তু শুক্রবার ঝড়ের সময় রাজশাহীতে ঝড়ের গতিবেগ ছিল মাত্র ৮ নটিকেল মাইল। ঝড়ের শেষে মহানগরীসহ আশপাশের এলাকায় সামান্য বৃষ্টি হয়েছে। তবে তা রেকর্ড করা মতো নয়।

এদিকে হালকা এ ঝড়ের কারণে আমের কিছুটা ক্ষতির আশঙ্কা করছেন কৃষিবিদসহ সংশ্লিষ্টরা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা দেব দুলাল ঢালি জানান, মুকুল থেকে আমের গুটি হয়েছে। এমন সময় ঝড় হওয়ায় আমের কিছুটা ক্ষতি হয়েছে।

সিলেট : সিলেটের ওসমানীনগরে কালবৈশাখীর কবলে পড়ে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। ঝড়ের সময় তাজপুর ইউনিয়নের দশহাল গ্রামে আত্মীয় বাড়িতে বেড়াতে আসা সাবিয়া বেগমের ওপর বাতাসে উড়ে আসা টিনের চাল পড়লে তার মৃত্যু হয়। তিনি পার্শ্ববর্তী বালাগঞ্জ উপজেলার বোয়ালজুড় ইউনিয়নের সোনাপুর গ্রামের খালিছ মিয়ার স্ত্রী।

মাগুরা : সন্ধ্যায় ঝড়ের সঙ্গে শিলাবৃষ্টি শুরু হয়। তখন শিলার আঘাতে সদর উপজেলার বেরইল পলিতা ইউনিয়নের ডহরসিংড়া গ্রামের বদন মোল্লার ছেলে আকরাম হোসেন (৪৫) নিহত হন।

পীরগঞ্জ (রংপুর) : প্রায় ১৫ মিনিটের চৈতালী ঝড় আর শিলাবৃষ্টিতে সাত ইউনিয়নে ঘরবাড়ি, ধান ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। প্রায় এক কেজি ওজনের শিলার আঘাতে শিশু ও নারীসহ শতাধিক লোক আহত হয়েছে। এদের মধ্যে তিনজনকে ভর্তি করা হয়েছে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। স্থানীয় সংসদ সদস্য জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষগ্রিস্তদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। পাশাপাশি টিন ও নগদ অর্থ সহায়তাও দিতে বলেছি।

গাইবান্ধা : সাঘাটায় স্মরণকালের ভয়াবহ শিলাবৃষ্টি হয়েছে। জুমার নামাজ শেষে শুরু হয়ে প্রায় ২০ মিনিট ধরে চলে শিলার তাণ্ডব। এতে উঠতি বোরো ও আমের মুকুলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। প্রায় ৩০০ থেকে ৫০০ গ্রাম ওজনের শিলার আঘাতে প্রায় অর্ধশত পুরাতন কাঁচা ঘরবাড়ির টিনের চালা ফুটো হয়েছে। দুমড়ে মুচড়ে গেছে নতুন টিনের চালাও। এতো বড় পরিমানের শিলা এর আগে পড়তে দেখা যায়নি বলে জানিয়েছেন এলাকার প্রবীণরা।


শিলাবৃষ্টিতে পলাশবাড়ী উপজেলায় ঘরবাড়ি ও দোকানপাটের টিনের চাল ফুটো হয়ে গেছে। ভূট্টা, সবজিসহ ব্যাপক য়তি হয়েছে বিভিন্ন আবাদি ফসলি জমির। সেই সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে শিলার আঘাতে শিশুসহ শতাধিক লোকের মাথা ফেটে গেছে। আহতরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরেছে। কিশোরগাড়ী ইউপির সুলতানপুর বাড়াইপাড়া গ্রামের বাসিন্দা কৃষক নুরুল ইসলাম বলেন, ‘আমার অনেক বয়স হলো। এর আগে কখনো এমন ভারী শিলাবৃষ্টি দেখিনি। ঋণ করে তামাক চাষ করেছিলাম। এখন মনে হয় সেই ঋণের টাকা আর শোধ করা সম্ভব হবে না।

সৈয়দপুর (নীলফামারী) : ডোমার ও ডিমলা উপজেলায় গতকাল সকাল ১১টার দিকে শিলাবৃষ্টিতে ফসল ও ঘরবাড়ির ব্যাপক তি হয়েছে। এ দুটি উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের তিন শতাধিক বসতবাড়ির ঘরের টিন ফুটো হয়ে গেছে। আহত হয়েছেন তিনজন। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ খালেদ রহীম জানান, সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা তিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে ক্ষয়ক্ষতির সঠিক হিসাব করছেন। তালিকানুযায়ী তিগ্রস্ত দরিদ্র পরিবারগুলোকে আর্থিক সাহায্য করা হবে বলেও জানান তিনি।

ঠাকুরগাঁও : দুপুরে ঝড়ো হাওয়া ও প্রচণ্ড শিলাবৃষ্টিতে জেলার হরিপুর উপজেলার বরুয়াল ও বনগাঁ গ্রামের সহস্রাধিক ঘরবাড়িরে ব্যাপক য়তি হয়েছে। এ ছাড়া পীরগঞ্জ, রাণীশংকৈল, বালিয়াডাঙ্গী ও সদর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে উঠতি ফসলসহ আম-লিচুর মুকুলের তি হয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ। তবে এ সময়ের বৃষ্টিতে বোরো ক্ষেতের লাভ হয়েছে।

পঞ্চগড় : হাইব্রিড টমেটো, তরমুজ, গম, ভূট্টা ক্ষেতের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ঝরে গেছে বিভিন্ন এলাকার বাগানের আম ও লিচুর মুকুল। তবে এ জেলায় গতকাল ভোর থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টিপাত হয়। এ সময় জেলা সদরে ৩৭ মিলিমিটার শিলাবৃষ্টি রেকর্ড করে স্থানীয় কৃষি বিভাগ।

ঈশ্বরগঞ্জ (ময়মনসিংহ) : গত বৃহস্পতিবার রাতে ও শুক্রবার বিকালের ঝড়ে কয়েকশ বাড়িঘর তছনছ হয়ে গেছে। গাছপালারও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। সেই সঙ্গে ময়মনসিংহ-ভৈরব রেলপথের ওপর গাছ উপড়ে পড়ায় রেল চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। উপজেলা ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের লিডার কাদের জানান, ঝড়ে বৃহস্পতিবার রাতে রেললাইনের ওপর গাছ উপড়ে পড়ায় ট্রেন চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। প্রায় দুই ঘণ্টার অভিযানে সেই গাছ কাটা হয়।

এ ছাড়াও শেরপুরের ঝিনাইগাতী, নাটোরের গুরুদাসপুর, লালমনিরহাটের হাতীবান্ধায় ভয়াবহ শিলাবৃষ্টি ও ঝড়ে ওইসব এলাকার ঘরবাড়িসহ বিভিন্ন ফসলি জমির ব্যাপক য়তি হয়েছে। আহত হয়েছেন অনেকেই।

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here