কারাগারে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। আর সে কারণেই গত বুধবার জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় তাকে আদালতে হাজির করা হয়নি বলে তার আইনজীবীরা জানান। বিষয়টি নিয়ে ওই দিন তেমন আলোচনা না হলেও বৃহস্পতিবার কারা কর্তৃপক্ষ টেলিফোনে চেয়ারপারসনের একান্ত সচিবকে জানায় খালেদা জিয়া অসুস্থ। এ কারণেই বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে তার পূর্বনির্ধারিত সাক্ষাৎ স্থগিত করা হয়। এরপরই প্রসঙ্গটি সামনে আসে। চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবি করে বিএনপি। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও আশ্বাস দিয়েছেন, খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসার জন্য যা যা দরকার, সে ব্যবস্থা নেয়া হবে। প্রয়োজনে বিদেশ পাঠানো হবে।

যদিও এ খবরে উদ্বেগ প্রকাশ করে সরকারের দিকে সন্দেহের আঙুল তুলেছে বিএনপি। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের দাবি, অন্য স্বৈরাচাররা যেভাবে প্রতিপক্ষকে অপসারণ করার চেষ্টা করেন, সে ধরনের অপসারণ করার চেষ্টা এখানে হতে পারে বলে আমি আশঙ্কা করি। তিনি অবিলম্বে উন্নত চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি জানিয়েছেন। দলটির অনেক নেতাই মনে করছেন, উন্নত চিকিৎসার নামে বেগম জিয়াকে বিদেশ পাঠিয়ে দেয়া হবে। যেমনটা হয়েছে তার ছেলে তারেক জিয়ার ক্ষেত্রে। ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্যে এমনটাই আভাস পাওয়া যাচ্ছে বলে তারা জানান।

তবে কারাগারে খালেদা জিয়া কী ধরনের অসুস্থ তা খোলাসা করে বলছে না কোনো পক্ষই। বিএনপির পক্ষ থেকেও দাবি করা হয়েছে, তিনি কী ধরনের অসুস্থ তা জানানোর। অবশ্য কারা কর্তৃপক্ষের একটি সূত্র বলেছে, তার পায়ে ও চোখের যে সমস্যা ছিল তা কিছুটা বেড়েছে। এজন্য কারাগারের নিয়মিত চিকিৎসকের পাশাপাশি সিভিল সার্জন তাকে চেকআপ করেছেন।

গত বুধবার হঠাৎ করেই খবর প্রচার হয়, খালেদা জিয়া কারাগারে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। এ জন্য তাকে আদালতেও হাজির করা হয়নি। জিয়া চ্যারিটেবল মামলায় ওই দিন তাকে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দিয়েছিলেন আদালত। তাই বকশীবাজার এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছিল।

এ প্রসঙ্গে খালেদা জিয়ার আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া সাংবাদিকদের জানান, আমরা সকাল সাড়ে ৯টা থেকে পৌনে ১২টা পর্যন্ত আদালতে শুনানির জন্য অপেক্ষায় ছিলাম। একটা কাস্টরি ওয়ারেন্ট কপিতে দেখতে পাই- খালেদা জিয়া অসুস্থ। এজন্য কারা কর্তৃপক্ষ তাকে আদালতে নিয়ে আসেনি।

অসুস্থতার কারণে গত বৃহস্পতিবার মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে খালেদার পূর্বনির্ধারিত সাক্ষাৎ বাতিল করা হয়। সাক্ষাৎ করতে রওনা হয়েও মাঝপথ থেকে ফিরে আসেন বিএনপি মহাসচিব। তাকে ফোন করে যেতে বারণ করেন খালেদা জিয়ার একান্ত সচিব এবিএম আবদুস সাত্তার। আর সাত্তারকে ফোন করে জানায় কারা কর্তৃপক্ষ।

এ অবস্থায় বৃহস্পতিবার রাতে বিএনপির সিনিয়র নেতারা খালেদা জিয়ার আইনজীবীদের নিয়ে গুলশানে চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে বৈঠক করেন। পরদিন সকালে অসুস্থ খালেদা জিয়ার উন্নত চিকিৎসার জন্য নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করে নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে নিয়ে জরুরি সংবাদ সম্মেলন করেন মির্জা ফখরুল। তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার উন্নত চিকিৎসার জন্য তার নিঃশর্ত মুক্তি চাই। কারামুক্তির পর দেশে নাকি বিদেশে চিকিৎসা করাবেন, এ বিষয়ে তিনি নিজেই সিদ্ধান্ত নেবেন।

বিএনপির বক্তব্য, এ সরকারের অধীনে খালেদা জিয়া নিরাপদ নন। তার কারারুদ্ধ অবস্থায় অসুস্থ হওয়াটাকে কোনো মতেই বিএনপি স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারছে না। দলটির আশঙ্কা, অন্য স্বৈরাচাররা যেভাবে প্রতিপক্ষকে অপসারণ করার চেষ্টা করেন সেই ধরনের অপসারণ করার চেষ্টা এখানে হতে পারে।

এ নিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, যে পরিবেশে খালেদা জিয়াকে কারাগারে রাখা হয়েছে সেটা তার প্রাপ্য নয়। তার স্বাস্থ্য অবনতির দিকে যাচ্ছে বলেই আমরা আশঙ্কা প্রকাশ করছি। তাকে যে খাবারটা দেয়া হয় সেটাও সঠিকভাবে পরীক্ষা করা হয় কিনা আমরা বলতে পারি না। সরকারের উচিত বিষয়টা খোলাসা করা। তিনি দাবি করেন, তার (খালেদা জিয়া) ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের তার স্বাস্থ্য পরীক্ষার সুযোগ দিতে হবে। সেই সঙ্গে তাদের সুপারিশ অনুযায়ী পবরর্তী চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।

বিএনপি মহাসচিব বলেন, আমরা তার (খালেদা জিয়া) স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বিগ্ন-উৎকণ্ঠিত। দুঃখজনকভাবে বলতে হচ্ছে, এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে কোনো সংবাদই পাইনি তার অসুস্থটা কী এবং কারা তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করছেন এবং কীভাবে তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এই বিষয়ে কারা কর্তৃপক্ষ ও সরকারের কাছ থেকে কোনো ব্যাখ্যা আমরা পাইনি।

বিএনপি মহাসচিব আরো বলেন- সুনির্দিষ্টভাবে বলেছি আমরা এখন তার নিঃশর্ত মুক্তি চাই, যাতে করে তার উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া যায়। আমরা প্যারোলে মুক্তির কথা বলিনি। আমরা বলেছি তাকে মুক্তি দিতে হবে। মুক্তি তার প্রাপ্য। উনার জামিন হয়ে গেছে ইতোমধ্যে। এখন তাকে মুক্তি দেয়া যেতে পারে। মুক্তি পেয়ে তিনি দেশে হোক, বিদেশে হোক চিকিৎসা নেবেন।

মির্জা ফখরুল অভিযোগ করেন, খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে দেয়ার জন্য সরকার মিথ্যা মামলা দিয়ে সাজা দিয়ে কারাগারে রেখে দিয়েছে এবং উচ্চ আদালতের জামিন পর্যন্ত কার্যকর করা হচ্ছে না। সরকারের উদ্দেশ্য একটাই- বিরোধী দলকে স্তব্ধ করে দেয়া এবং দেশের জনপ্রিয় নেত্রীকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখা। নীলনকশার একদলীয় শাসনব্যবস্থা তারা নিরঙ্কুশ করতে চায়। আজকে বিশ্ব স্বীকৃত হয়েছে বাংলাদেশে একটা স্বৈরাচার সরকার রয়েছে।

এদিকে খালেদা জিয়ার অসুস্থতার মাত্রা বুঝে তার চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী সব ব্যবস্থাই সরকার নেবে বলে বিএনপিকে আশ্বস্ত করেছেন ওবায়দুল কাদের। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক বলেন, তিনি (খালেদা জিয়া) জেলে আছেন বলে তার প্রতি সরকার অমানবিক আচরণ করবে না। আমরা এ ধরনের সরকার না। অবশ্যই আমাদের দেশে সুচিকিৎসার ব্যবস্থা আছে।

কাদের বলেন, খালেদা জিয়ার অসুস্থতা কতটা গুরুতর, সে বিষয়ে চিকিৎসকদের পরামর্শ নিয়েই সব হবে। এটা কী টার্মিনাল ডিজিজ না নরমাল ডিজিজ সেটা দেখতে হবে। টার্মিনাল ডিজিজ হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। দেশের চিকিৎসকরা যদি বোর্ড বসিয়ে বলে যে, বিদেশে পাঠাতে হবে, তাহলে পাঠাব।

ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্যের পর রাজনৈতিক মহলে বেশ কিছু আলোচনা হচ্ছে। তাহলে কি সরকার খালেদা জিয়াকে বিদেশে পাঠিয়ে দিতে চাচ্ছে- এমন কথা শোনো যাচ্ছে। আবার কেউ কেউ প্রশ্ন রাখছেন- খালেদা জিয়া আদৌ অসুস্থ কিনা। এ বিষয়ে মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে সাংবাদিকদের তিনি শুধু বলেন, গুজবে কান দেবেন না।

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here