আজিমপুর কবরস্থানের সামনেই খালি গায়ে শুয়ে আছেন মধ্য বয়সী রফিক মিয়া। তার পেট দিয়ে বের হয়ে এসেছে একটি পা ও একটি হাত। দেখলে মনে হয়, পেটে যেন একটি ছোট্ট শিশু ঘুমিয়ে আছে। প্রথম দেখায় তার প্রতি সহানূভুতি প্রকাশ করেন সবাই। আর এ সহানুভূতি আকর্ষণই তার অস্ত্র! কবর জিয়ারত শেষে মন খুলেই তাকে দান করছেন মৃত ব্যক্তিদের স্বজনরা। পাশে থাকা দুজন কিছুক্ষণ পর পর টাকাগুলো গুছিয়ে ব্যাগে রাখছিল।

পাশেই বসে ভিক্ষা করছিল কব্জি কাটা কিশোর মাসুদ। তার রোজগারও কম হচ্ছিল না। কিন্তু টাকা পেলেও মুখে তেমন সুখ ভাব নেই। কারণটা জানা গেল কিছুক্ষণ পরই, যখন তার টাকার ব্যাগ কয়েকজন এসে নিয়ে গেল তখনই। কথার এক ফাঁকে জানা যায়, মাসুদের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। সে আসলে ভাড়ায় এখানে কাজ করতে এসেছে। যত টাকাতেই তার থালা ভর্তি হওক না কেন, রাত শেষ হলে সে কেবল ভাড়াটাই পাবে। সঙ্গে তিনবেলা খাবার। তবে রোজগারটা ভালো হলে কখনও কখনও বকশিস মেলে। অবশ্য কারা তাকে ভাড়া করে এনেছে তা বলতে সে রাজি নয়।

মাসুদ কেবল এটা জানিয়েছে, যারা এ ব্যবসার সঙ্গে জাড়িত তারা সামনে আসেন না। তাদের দালালরাই মাঠ পর্যায়ের সব কিছু ঠিক রাখে। জেলায় জেলায়ও তাদের এজেন্ট হিসেবে অনেকেই কাজ করে। এ লাইনে যার যতো বড় শারীরিক সমস্যা, তার টাকা ততো বেশি।

রাজধানীর কারওয়ান বাজার এলাকায় বসে ভিক্ষা করছিলেন ষাটোর্ধ্ব মজিবুর। শবে বরাতে বেশি টাকার আশায় তিনি কয়েকদিন আগেই ময়মনসিংহ থেকে ঢাকায় এসেছেন। রাতে ভিক্ষার জন্য গিয়েছিলেন আজিমপুরে। কিন্তু জায়গা পাননি। তারপর যান বায়তুল মোকাররম মসজিদে। সেখানেও বসার সুযোগ মেলেনি। তাই কারওয়ান বাজার এলাকায় ভিক্ষা করছেন।

তিনি জানালেন বিস্ফোরক তথ্য। আজিমপুর ও বায়তুল মোকাররম এলাকায় ভিক্ষা করতে হলে আগেই কয়েক হাজার টাকা দিয়ে জায়গা ভাড়া নিতে হয়। এ ছাড়া, বেশ কিছু চক্রও ভিক্ষাবৃত্তির সঙ্গে জড়িত। তাদের কারণে সত্যিকারের ভিক্ষুকরা ঠিকতেই পারে না। আর এই চক্রটি অগ্রীম টাকা দিয়ে শবে বরাত, রমজান, শবে কদর আর দুই ঈদের জন্য ঢাকার বাইরে থেকেও ভিক্ষুক ভাড়া করে আনে।

শবে বরাতে কোটি টাকার বাণিজ্য, ভাড়ায় খাটে ভিক্ষুক
শবে বরাতে কোটি টাকার বাণিজ্য, ভাড়ায় খাটে ভিক্ষুক
ভিক্ষুক সিন্ডিকেটের সংঘবদ্ধ চক্রগুলো আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও এলাকাভিত্তিক প্রভাবশালীদের ম্যানেজ করেই ভিক্ষা বাণিজ্য চালায় বলে জানা গেছে। তাই উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ভিক্ষায় প্রকাশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে শিশুদেরও। রাজধানীতে সবচেয়ে বেশি ভিক্ষুক দেখা যায়- বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ, হাইকোর্ট মাজার ও মসজিদ, মিরপুর শাহ আলী মাজার, গুলিস্তানের গোলাপশাহ মাজার, গুলশান-১ ও ২ গোলচত্বর, মহাখালী রেলগেট মসজিদ, চকবাজার মসজিদ, আজিমপুর কবরস্থান, মতিঝিল, গুলশান সেন্ট্রাল মসজিদ, উত্তরা ও বনানীর মসজিদগুলোর কাছে।

এর মধ্যে রাজধানীর গুলশান, বারিধারা, বনানী, ধানমণ্ডি, উত্তরার মতো অভিজাতপাড়ায় তুলনামূলক বেশি ভিক্ষা পাওয়া যায়। এ জন্য তাদের প্রধান টার্গেট থাকে এসব এলাকা। এখন শহরের বিপণিবিতানের সামনে এবং ট্রাফিক সিগন্যালে যানবাহন আটকে গেলে ঘিরে ধরে ভিক্ষুকের অসংখ্য হাত। প্রধান সড়কসহ অলিগলিতে বেড়েছে ভিক্ষুকের আনাগোনা। মানুষরে আবেগকে কাজে লাগিয়ে শবে বরাতের এক রাতেই কয়েক কোটি টাকার বাণিজ্য হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, জামালপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, ফরিদপুর, মাদারিপুর, মানিকগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ ও টাঙ্গাইল জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে আনা হয়েছে বেশিরভাগ মৌসুমী ভিক্ষুক। তাদের থাকার জন্য রাজধানীর মিরপুর দিয়াবাড়ি বেড়িবাঁধ, বাউনিয়া বাঁধ, গাজারিবাগ বেড়িবাঁধ, কামরাঙ্গীর চর, মোহম্মদপুর বেড়িবাঁধ, শনির আখড়া, আব্দুলাহপুর ও টঙ্গীর বিভিন্ন খুপরি ঘর ভাড়া নেওয়া হয়েছে।

সমাজকল্যাণ অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ঢাকায় ৫০ হাজার নিয়মিত ভিক্ষুক আছে। তবে শবে বরাত, রমজান ও ঈদ উপলক্ষে এ সংখ্যা বেড়ে যায় কয়েক গুণ। অবশ্য ভিক্ষুকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজধানীতে বর্তমানে এ সংখ্যা অন্তত দেড় লাখ।

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here