মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে গত বছরের আগস্ট থেকে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর সেনাবাহিনীর চালানো হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতনের পর কেটে গেছে ৯ মাস। এরমধ্যে ঘর-বাড়ি হারিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে এসে আশ্রয় নিয়েছেন ৭ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা। যাদের মধ্যে অসংখ্য ধর্ষিতা নারীরাও ছিলেন। যাদের অনেকেই ছিলেন গর্ভবতী। আবার কেউ বাংলাদেশে এসে গর্ভবতী হয়ে পড়েছেন। সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যাওয়া এসব নারীদের অনেকে এখন তাদের সন্তান জন্ম দিচ্ছেন। আবার কেউ কেউ কয়েক মাসের মধ্যেই এই অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হবেন। কিন্তু এসব সন্তানের পরিচয় ও ভবিষ্যত কী হবে তা ভেবে এখনই বিপর্যস্থ হয়ে পড়েছেন তারা।

আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো জানায়, তারা জানতেন তাদের সামনে এই কঠিন সময়টি উপস্থিত হবে। একদিকে তাদের মোকাবেলা করতে হবে ঝড়-বৃষ্টির মৌসুম, অন্যদিকে সামলাতে হবে অসংখ্য গর্ভবতীকে। তাই তারা এ নিয়ে প্রস্তুত ছিলেন। ধরপাকড়ের সময় যৌন সহিংসতার শিকার হয়ে গর্ভবতী হওয়া নারীরা আগামী কয়েক সপ্তাহে তাদের সন্তান জন্ম দেবেন। কারও কারও সন্তান জন্মও নিয়েছে। সেভ দ্য চিলড্রেন বলেছে, আগামী কয়েক মাসে মায়েদের পরিত্যক্ত সন্তানদের সংখ্যা বেড়ে যাবে।

চিকিৎসকদের সংস্থা মেডিসিনস স্যানস ফ্রন্টিয়ার্স (এমএসএফ) কক্সবাজারে বিভিন্ন হাসপাতাল পরিচালনা করছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, তারাও ধর্ষণের ফলে গর্ভবতী হয়ে সন্তান জন্ম দিতে যাওয়া আক্রান্ত নারীদের কাউন্সিল করবেন তারা। এসব নারীরা ভাবছেন, তারা নবজাতকদের লালন-পালন করতে পারবেন না কিংবা তাদের লালন করার উপায় উপকরণ তাদের কাছে নেই। এই মায়েদের অধিকাংশের বয়স ১৮ বছরের নিচে। অবাঞ্ছিতভাবে সন্তান গর্ভধারণের ক্ষেত্রে সামজিক কলঙ্কের চিন্তা তাদের মানসিকভাবে বিপর্যস্থ করে দিয়েছে। কিন্তু এবারেই প্রথম তারা এভাবে সন্তান জন্ম দিচ্ছে না।

আয়েশা আকতার নামের এক রোহিঙ্গা নারী বলেন, মংডু শহরে সহিংসতার সময় মিয়ানমারের তিন সেনা তাদের ঘরে প্রবেশ করে তার পাঁচ সন্তানকে মেরে ফেলার হুমকি দেয় ও তাকে ধর্ষণ করে। ২০১৬ সালের নভেম্বর থেকে রাখাইন রাজ্যে এমন ঘটনা অহরহ ঘটে আসছে। আয়েশার স্বামীর মৃত্যু হয়েছে ২০১২ সালে। তিনি বলেন, এ নোংরা ঘটনার শিকার হওয়ার পর প্রায়ই তিনি বিচলিত হয়ে পড়েন। তিনি এটা প্রতিবেশীদের কাছ থেকে গোপন রাখার চেষ্টা করেন। কিন্তু শারীরিক পরিবর্তন দেখে তারা বুঝতে পারে।

সদ্য হওয়া ভাইকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক রোহিঙ্গা কিশোরী

বালুখালির পাহাড়ের ঢালে স্থাপন করা ত্রিপলের ভেতর বসে এই রোহিঙ্গা নারী বলেন, সেনারা যখন গ্রামে হানা দেয় তখন তারা নারীদের ধর্ষণ করে এটা সবাই জানে। মিয়ানমারে গর্ভপাত ছাড়া রোহিঙ্গাদের স্বাস্থ্যসেবা নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ৩৪ বছর বয়সী আয়েশা বলেন, গ্রামের চিকিৎসকের কাছ থেকে তিনি ওষুধ কিনেছিলেন। কিন্তু তা খাওয়ার পরেও তার গর্ভপাত হয়নি। এটাকে কলঙ্কজনক ঘটনা ভেবে লজ্জায় প্রতিবেশীদের কাছ থেকেও তিনি কোনো সাহায্য চাইতে পারেননি। আয়েশা বলেন, একজন বিধবা হিসেবে আমাদের সমাজে গর্ভপাতের জন্য সাহায্য চাওয়াও অনেক কঠিন। কাজেই গর্ভধারণ থেকে মুক্ত হওয়ার অন্য উপায় খোঁজাও আমি বন্ধ করে দেই। আমি সবকিছুই আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিয়েছি।

২০১৭ সালের আগস্টে তিনি যখন পাঁচ মাসের গর্ভবতী, তখন তার গ্রামে নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু হয়। এতে প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হন। বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়ার পর তিনি আরেকবার গর্ভপাতের চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু এতদিনে অনেক বেশি দেরি হয়ে গেছে। বাংলাদেশের আইনে প্রথম তিন মাস পর গর্ভপাত নিষিদ্ধ। গর্ভপাতের এই অবৈধ প্রক্রিয়ার তার জীবন হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে চিকিৎসকরা তাকে হুশিয়ারি করে দেন। তিনি বলেন, আমার ঘরে আরও ছোট ছোট সন্তান আছে, কাজেই আমি আর ঝুঁকি নিতে চাইনি। আয়েশার মতো এমন আরও কত নারী আশ্রয়শিবিরে আছেন, তার সঠিক পরিসংখ্যান কারও জানা নেই।

এমএসএফ জানিয়েছে, ২৫ ফেব্রয়ারি পর্যন্ত যৌন সহিংসতার শিকার ২২৪ নারীকে তারা চিকিৎসা দিয়েছে। সংস্থাটি জানায়, এমন বহু নারী আছেন, যারা সহিংসতার শিকার হয়ে সামাজিক কলঙ্কের ভয়ে সাহায্য চাইতে আসেননি। জানুয়ারিতে এমএসএফের হাসপাতালে বহু নারীকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখা গেছে। ধাত্রীদের ধারণা, এসব নারীরা নিজে নিজেই গর্ভপাতের চেষ্টা চালিয়েছেন। জাতিসংঘের যৌন সহিংসতা বিষয়ক বিশেষ দূত প্রমিলা প্যাটেন বলেন, রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা চালানোর সময় মিয়ানমার সেনাবাহিনী ধর্ষণকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে। রোহিঙ্গাদের বিতারণ ও বিনাশ করে দিতে সেনাবাহিনী পরিকল্পিতভাবে এটাকে হাতিয়ার হিসেবে কাজে লাগিয়েছে।

এসব শিশুর ভবিষ্যত কী হবে জানেন না তারা

২৬ জানুয়ারি আয়েশা একটি পুত্র সন্তানের জন্ম দেন, যার নাম রাখা হয়েছে ফয়েজ। তার মায়ের ওপর দিয়ে অনেক যন্ত্রণা ও নিপীড়নের ঝড় বয়ে যাওয়ার পরও শিশুটি দেখতে খুবই স্বাস্থ্যবান হয়েছে। আয়েশা বলেন, তার সন্তানটি খুব ফুটফুটে ও উচ্ছল। সবসময় সে খুব হাসিখুশি থাকে। কিন্তু ফয়েজ দুনিয়াতে আসার পর তাদের পরিবার ও সমাজে বিভক্তি দেখা গেছে। আয়েশার দুই মেয়ে বলল, এই নবজাতকটি তাদের ভাই হতে পারে না। তাকে কোনো এতিমখানায় দিয়ে আসা উচিত। কিন্তু আয়েশা তার মেয়েদের বোঝাতে চেষ্টা করলেন, সে আমাদের মতোই অন্যায়ের শিকার। তাকে আমরা ফেলে দিতে পারি না।

তিনি বলেন, আমার নতুন প্রতিবেশীরা আমার কাছে থাকতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন। তারা আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলছেন, এরকম হাজার হাজার রোহিঙ্গা নারী মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্লজ্জ যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। আয়েশা তার মেয়েদেরও বিষয়টি বোঝাতে চেষ্টা করছেন। মেয়েদের তিনি বলেন, এই গর্ভাবস্থা আমার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখানে আমার কোনো হাত নেই। কাজেই আমার লজ্জিত হওয়ারও কিছু নেই। শেষ পর্যন্ত তিনি তার মেয়েদের বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন। তারা এখন ফয়েজের সঙ্গে খেলাধুলা করছে। তাকে ভালোবাসা শুরু করে দিয়েছে।

আয়েশা নিজেও যে তাকে ভালোবাসেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এক নৃশংসতার প্রতিফলন হিসেবে শিশুটি পৃথিবীতে এসেছে। তাকে তিনি কোথায় ফেলে দিবেন। আয়েশার ভাষ্য, সে তো শিশু, তার কোনো দোষ নেই। সে নিরপরাধ। আমার অন্য সন্তানদের মতো তাকেও ভালোবাসি। তাকে নিয়ে আমার ভেতরে ভিন্ন কোনো অনুভূতি হচ্ছে না। রোহিঙ্গা অ্যাকটিভিস্ট কো কো লিন বলেন, যৌন সহিংসতার শিকার হয়ে গর্ভবতী হওয়ার ১৫টি ঘটনা তিনি স্বচক্ষে দেখেছেন। কিন্তু তিনি নিশ্চিত, এরকম আরও বহু ঘটনা অজানা রয়ে গেছে। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের জরিপ বলছে, দুই তৃতীয়াংশ নারী যৌন সহিংসতার শিকার হলেও তারা কর্তৃপক্ষ কিংবা দাতব্য সংস্থার কাছে তা জানাননি। লজ্জা ও কলঙ্কের কথা মাথায় রেখে তারা এমনটা করছেন।

মানবাধিকার কর্মী লিন বলেন, এমন পরিস্থিতির শিকার হয়ে যে সব শিশু জন্ম নিয়েছে বা ভবিষ্যতে নেবে, তাদের নিয়ে নেতিবাচক ধারণা পোষণের কোনো কারণ নেই। তিনি বলেন, পৃথিবীর অন্য নারীদের মতো পেটে ধারণ করে ১০ টি মাস যন্ত্রণা সহ্য করে রোহিঙ্গা মায়েরা তাদের জন্ম দেন।যতই অবাঞ্ছিত বলা হোক, এখন তারা রোহিঙ্গাদেরই সন্তান।

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here