ঝালকাঠি থেকে ভারতে পাচার হওয়া চম্পা আক্তার রহিমাকে (১৭) ফিরে পেতে আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে তার মা ফাতেমা বেগম কমলি। ভারতের ব্যাঙ্গালুরু রাজ্যের একটি সেইভ হোমে থাকা মেয়েটি তিন বছরেও উদ্ধার না হওয়ায় চরম উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে স্বজনদের।

এদিকে মামলার আসামিরা আদালত থেকে জামিন নিয়ে মেয়েটির স্বজনদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছে বলে মামলার বাদী ফাতেমা বেগমের অভিযোগ। মেয়েটিকে ফিরে পেতে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে কূটনৈতিক তৎপরতার প্রয়োজন বলে মনে করেন বাদীর আইনজীবী।

ঝালকাঠি পৌর এলাকার বাসন্ডা গ্রামে স্বপন হাওলাদারের মেয়ে চম্পা আক্তার রহিমাকে ২০১৫ সালের ৫ জুন খুলনার খালিশপুর শোনহাটা এলাকার হাছিনা বেগম মোটা বেতনে কাজের কথা বলে ফুসলিয়ে নিয়ে ভারতে পাচার করে একটি পতিতালয়ে বিক্রি করে দেয়। তখন চম্পার বয়স ছিলো ১৪ বছর। এ ঘটানায় চম্পার মা ফাতেমা বেগম ঐদিনই ঝালকাঠি সদর থানায় তিন জনকে আসামি করে মানব পাচার আইনে একটি মামালা করেন।

পরবর্তীতে মেয়েটিকে ভারতীয় পুলিশ পতিতালয় থেকে উদ্ধার করে আদালতের মাধ্যমে একটি সেইভ হোমে হস্তান্তর করে। মেয়েটির বিরুদ্ধে ভারতে অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ে মামলা হওয়ায় তার দেশে ফেরা অনিশ্চিত হয়ে পরেছে। মেয়েটির মা দীর্ঘ আইনি লড়াই চালিয়েও মেয়েকে ফিরে না পেয়ে হতাশ হয়ে পরেছেন।

ঝালকাঠি জেলা দায়রা জজ আদালতে মামলার নথি ও বাদীর আইনজীবী সূত্রে জানা যায়, ঝালকাঠি পৌরসভার বসন্ডা নেছারাবাদ এলাকায় চম্পা আক্তার রহিমাদের পরিবার বসবাস করে। চম্পাদের প্রতিবেশী ঝুমুর আক্তারের খালা নাছিমা বেগম (৬০) আত্মীয়তার সূত্রে খুলনা থেকে প্রায়ই বাসন্ডা এলাকায় বেড়াতে আসত। বড়িতে যাওয়া আসার সুবাদে নাছিমা বেগমের সাথে চম্পাদের পরিবারের সাথে সম্পর্ক তৈরী হয়। চম্পাকে ভারতে ভালো বেতনে চাকুরি দিতে পারে বলে তার বাবা-মায়ের কাছে জানায় নাছিমা। এতে চম্পার মা-বাবা রাজি হয়নি। ক্ষিপ্ত হয়ে হাছিনা বেগম কিছু লোকজন নিয়ে ২০১৫ সালের ৫ জুন বাড়িতে একা পেয়ে চম্পাকে একটি মাইক্রোবসে তুলে নিয়ে যায়।

ঘটনার দিন চম্পার মা বাদী হয়ে ঝালকাঠি সদর থানায় ৩ জনকে আসামি করে মানব পাচার আইন ২০১২ এর ৭/১০(১) ধারায় একটি অভিযোগ দায়ের করেন। কিন্তু ঝালকাঠি সদর থানা অভিযোগটি এফআইআর হিসেবে গ্রহণ না করায় এ ছয় মাস পরে ফাতেমা বেগম একই ধারায় জেলা দায়রা জজ আদালতে একটি নালিশি মামলা দায়ের করে। আদালত বাদীর নালিশি মামলাটি সদর থানাকে এফআইআর হিসেবে গ্রহণ করার নির্দেশ দেয়। সদর থানা মামলাটি গ্রহন করে তদন্ত শুরু করে।

মামলার আসামীরা হচ্ছেন-খুলনার শেনহাটা খালিশপুর গ্রামের মোমিন হাওলাদারের স্ত্রী হাসিনা বেগম, ঝালকাঠি বাসন্ডা গ্রামের কবির হোসেনের স্ত্রী ঝুমুর আক্তার, একই গ্রামের ইন্দ্রজিৎ সিকদারের স্ত্রী মিনতি সিকদার। পরে পুলিশের অভিযোগপত্রে হাসিনা বেগমের মেয়ে নাসরিন বেগমের নামও অন্তর্ভূক্ত হয়।

পুলিশ ২০১৭ সালের ২ অক্টোবর আদালতে এ মামলায় অভিযোগপত্র প্রদান করে। প্রথমে মামলাটি ঝালকাঠি থানার ২ জন পরিদর্শক তদন্ত করে কোন কিনারা করতে পারেনি। পরবর্তীতে খুলনা গোয়েন্দা পুলিশের অর্গানাইজড ক্রাইম জোনের উপপরিদর্শক অচিন্ত কুমার হালদার এই মামলার মূল রহস্য উদ্ধার করেন। তিনি তদন্তের দায়িত্ব হাতে পেয়ে প্রথমেই হাসিনা বেগমের কন্যা নাসরিন বেগমকে আটক করেন।

তার মুঠোফোনের কললিস্ট পরিক্ষা করে একাধিক নাস্বার থেকে ভারতে অবস্থান করা ১ নং আসামী তার মা হাসিনা বেগমের সাথে কথোপকথনের রেকর্ড খুজে পান। নাসরিন বেগমকে জিজ্ঞাসাবাদ ও মুঠোফোনের রেকর্ড থেকে তিনি জানতে পারেন চম্পাকে যশোরের বেনাপোল স্থল বন্দর থেকে ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের কৃশলগিরি জেলার নিয়ে একটি পতিতালয়ে বিক্রি করে দেয়া হয়। তদন্তকারী কর্মকর্তা বিষয়টি দুইটি পত্রযোগে ঢাকা পুলিশ হেড কোয়াটারে মাধ্যমে জাতীয় নিরাপত্তা শাখা নিউ দিল্লিকে অবহিত করেন। ২০১৫ সালের ২ ডিসেম্বর ভারতের বেঙ্গালুরু রাজ্যের জাস্টিজ অ্যান্ড কেয়ার অফিসের উদ্যোগে ভারতীয় পুলিশের সহায়তায় চম্পাকে সেই পতিতালয় থেকে উদ্ধার করা হয়।

পুলিশ চম্পাকে উদ্ধার করে ভারতে অবৈধ অনুপ্রবেশের অপরাধে একটি মামলা দিয়ে আদালতের মাধ্যমে বেঙ্গালুরু শাওকাস্ত্রা নামক একটি সেইভ হোমে হস্তান্তর করে। চম্পার নামে সে অনুপ্রবেশের মামলাটি চলমান থাকায় ও আইন জটিলতার কারনে তাকে বাংলাদশে প্রত্যাবর্তন করা যাচ্ছেনা।

তদন্তকারী কর্মকর্তা আরো উল্লেখ করেন, চম্পা আক্তার রহিমা প্রত্যাবর্তনের বিষয়টি ঢাকার গুলশানস্থ বাংলাদেশ জাস্টিজ অ্যান্ড কেয়ার নামক একটি সংস্থা তদারকি করছে। এদিকে গত তিন মাস পূর্বে মামলার ১ নং আসামি এই মামলায় গ্রেফতার হয়ে ঝালকাঠি কারাগারে বন্দি ছিল। কিন্তু সে চম্পার অবস্থান সম্পর্কে আদালতকে কোন সুস্পষ্ট ধারণা দিতে পারেনি। সম্প্রতি হাসিনা বেগমসহ মামলার অন্যান্য আসামিরা জামিনে মুক্তি পেয়ে বাদীকে বিভিন্ন ভাবে হুমকি দিচ্ছে।

এ বিষয়ে মামলার বাদী চম্পার মা ফাতেমা বেগম কমলি বলেন, তিন বছর হলো মেয়েটি ভারতের সেইভ হোমে আছে। আমার কোল শূন্য করে আসামী হাছিনা বেগম চম্পাকে ভারতে পাচার করে দেয়। আজ পর্যন্ত এ মামলার বিচার পাইনি। আসামিরা জামিনে মুক্তি পেয়ে আমাকে বিভিন্ন ভাবে হুমকি দিচ্ছে। আমার মেয়েটি ভারত থেকে ফিরতে পারবে কিনা তাও আমি জানি না। আমার মেয়েকে ফিরে পাওয়ার বিষয়ে আমি প্রধানমন্ত্রীর সাহায্য কামনা করছি।

এ বিষয়ে বাদীর আইনজীবী বনি আমিন বাকলাই বলেন, পুলিশের তদন্ত ও বিভিন্ন মাধ্যমে আমরা জানতে পেরেছি মেয়েটি ভারতের বেঙ্গালুরু রাজ্যের একটি সেইভ হোমে আছে। ১নং আসামী হাছিনা বেগম জামিন শুনানির সময় আদালতে এই মর্মে মুচলেকা দেন যে আগামী তিন মাসের মধ্যে চম্পার অবস্থান জানাতে ও তাকে উদ্ধারে সহায়তা করবে। মেয়েটি পতিতালয় থেকে উদ্ধার হওয়ার পরেও ভারতীয় পুলিশের অনুপ্রবেশ মামলাটি চম্পার বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তনের বিষয়টি আইনী জটিলতায় ফেলেছে। এই মূহুর্তে চম্পাকে বাংলাদেশে ফেরাতে হলে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কূটনৈতিক তৎপরতা প্রয়োজন।

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here