আত্মহত্যা নাকি হত্যা করা হয়েছে চট্টগ্রাম সানশাইন গ্রামার স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্রী তাসফিয়া আমিনকে, এখনো কূল-কিনারা করতে পারেনি পুলিশ। তারা কেবল কয়েকটি ক্লু ধরে এগিয়ে যাচ্ছে। আর সেগুলোর সমাধান করতে পারলেই বেরিয়ে আসবে মূল ঘটনা, এমনটাই মনে করছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। তবে ফিরোজ নামে এক যুবলীগ ক্যাডারকে খুঁজছে পুলিশ, সঙ্গে একটি আংটি এবং অটোরিকশা চালকের সন্ধান। পাশাপাশি ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের অপেক্ষা।

গেল ২ মে সকালে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতের ১৮ নম্বর ব্রিজঘাটের পাথরের ওপর থেকে কিশোরীর তাসফিয়ার মরদেহ উদ্ধার করে পতেঙ্গা থানা পুলিশ। পরে একই দিন সন্ধ্যায় নগরের খুলশী থানার জালালাবাদ হাউজিং সোসাইটি এলাকা থেকে পুলিশ অভিযান চালিয়ে তার প্রেমিক আদনান মির্জাকে আটক করে। ওই কিশোর বাংলাদেশ এলিমেন্টারি স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র এবং ব্যবসায়ী ইস্কান্দার মির্জার ছেলে।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, ১ মে বিকেলে তাসফিয়ার সন্ধান না পেয়ে তার মা আদনানকে ফোন করেন। ফোন পেয়ে সে তাসফিয়াদের বাসায় যায়। পরে কিশোরীর বাবা মোহাম্মদ আমিন প্রথমে আদনানকে নিয়ে চায়না রেস্টুরেন্টে যান। সেখান থেকে আবারও বাসায় আসেন এবং তাকে আটকে রাখেন।

খবর পেয়ে যুবলীগ নেতা ফিরোজ ও যুবলীগকর্মী আকরাম আসেন। আদনানকে ছেড়ে দিতে সময় বেঁধে দেন তারা। পরে দুই ঘণ্টার মধ্যে তাসফিয়াকে বাসায় ফেরত দেওয়ার কথা বলে আদনানকে ছাড়িয়ে নিয়ে যান। এর পর থেকে তারা লাপাত্তা। পরদিন দুপুরে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে নেভাল একাডেমির অদূরে ১৮ নম্বর ঘাট এলাকায় তাসফিয়ার মরদেহ মেলে।

সুরতহাল প্রতিবেদনে ওঠে আসে এই কিশোরীর ওপর চালানো ভয়াবহ চিত্র। নিহত তাসফিয়ার পিঠ, বুক ও গোপনাঙ্গসহ সব স্থানেই দেখা গেছে ভয়াবহ নির্যাতনের ছাপ। গোলাকার মুখমণ্ডল থেঁতলানো। চোখ দুটো নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। আর বুকের ওপর একাধিক আঁচড়ের দাগও দেখা গেছে। নিহতের হাতের নখগুলো ছিল নীলবর্ণ।

৩ মে দুপুরে মোহাম্মদ আমিন তার মেয়েকে হত্যার অভিযোগে আদনান মির্জা ও ছয়জনকে আসামি করে পতেঙ্গা থানায় মামলা করেন। ওই মামলার ষষ্ঠ নম্বর আসামি ফিরোজ। সে আদনান মির্জার বড় ভাই। তার পরিচালিত রিচকিডস নামের গ্যাং স্টারের (এডমিন) প্রধান আদনান। আর বাকি ৫ আসামি সেই গ্যাং স্টারের ক্যাডার।

পুলিশ জানায়, যুবলীগ ক্যাডার ফিরোজ অস্ত্রসহ এক সময় র‌্যাবের হাতে আটক হয়েছিল। ভারতে বন্দি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাজ্জাদের সহযোগী সে। ২০১১ ও ২০১৩ সালে অস্ত্রসহ দুবার আটক হয় পুলিশের হাতে। জেল থেকে বেরিয়ে ২০১৫ সাল থেকে যুবলীগের কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হয়। সে সময় চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সমপাদক ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিনের ছবি ব্যবহার করে বিলবোর্ড টাঙিয়ে সমালোচনায় আসে ফিরোজ।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদের চাঁদাবাজি ও খুনের অপারেশনে সক্রিয় ছিল ফিরোজ। এক সময় যৌথ বাহিনীর অভিযানের মুখে সীমান্ত পাড়ি দিলেও সব কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতো সাজ্জাদ বাহিনীর সক্রিয় সদস্য ফিরোজের মাধ্যমে।

সানশাইন গ্রামার স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্রী তাসফিয়া আমিন
সানশাইন গ্রামার স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্রী তাসফিয়া আমিন
এ ছাড়া ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা করে পুলিশ প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছে, নগরীর গোলপাহাড় মোড়ে রেস্টুরেন্টের সামনে থেকে তাসফিয়া যে অটোরিকশায় উঠেছিল, সেই অটোরিকশায় করেই পতেঙ্গায় পৌঁছান। সেই অটোরিকশায় তাসফিয়া এক থেকে দেড় ঘণ্টার মতো ছিল। এ সময়ে কোনো বাজে কিছু হয়েছিল কি না পুলিশ সেটা খতিয়ে দেখছে।

এছাড়া রেস্টুরেন্টের ভিডিও ফুটেজে তাসফিয়ার আঙুলে একটি সোনার আংটি দেখা যায়। কিন্তু মরদেহ উদ্ধারের সময় সেটি পাওয়া যায়নি। পুলিশের ধারণা, তাসফিয়া ওই আংটি অটোরিকশা চালককে দিয়ে ভাড়া মিটিয়েছিল। আবার অন্যকিছু হতে পারে।

৪ মে নগরীর গোলপাহাড় মোড় থেকে জিইসি মোড় পর্যন্ত চারটি প্রতিষ্ঠানের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে পুলিশ। এর পর সন্ধ্যায় পতেঙ্গার নেভাল এলাকায় গিয়ে প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলেন নগর পুলিশের কর্ণফুলী জোনের সহকারী কমিশনার (এসি) জাহেদুল ইসলাম।

তিনি জানান, তাসফিয়া গোলপাহাড় মোড়ের চায়না গ্রিল রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে যে অটোরিকশায় উঠেছিল সেটি আনুমানিক একশ গজ দূরে মেডিকেল সেন্টারের সামনে গিয়ে থামে। তা থেকে নেমে সেখানে ৭ সেকেন্ড অপেক্ষার পর আবারও অটোরিকশায় ওঠলে সেটি চলতে শুরু করে। ৬টা ৪৮ মিনিটে অটোরিকশাটি জিইসি মোড়ের দিকে যাত্রা করে। এরপর রাত সোয়া ৮টায় তাসফিয়াকে নেভালে পাথরের ওপর একাকী বসে থাকতে দেখা গেছে।

তবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহের পরও পুলিশ সিএনজি অটোরিকশার নম্বর পেতে ব্যর্থ হয়েছে। অটোরিকশাটি চিহ্নিত করতে পারলেও প্রতিটি ফুটেজে অতিরিক্ত আলোর কারণে নম্বরটি পাওয়া যায়নি।

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here