বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নারী চিকিৎসকের বিয়ে হয় মহা ধুমধাম করে। ডাক্তার বধূ পেয়ে ছেলের পরিবারও খুশি। কিন্তু সেই আনন্দটা দীর্ঘ হয়নি। হঠাৎ কিছুটা অসুস্থ হয়ে পড়লে রোগ নির্ণয় পরীক্ষায় ধরা পড়ে তিনি থ্যালাসেমিয়ার বাহক। যার সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে তিনিও একই সমস্যায় ভুগছিলেন। তাই নববধূকে ডিভোর্স দেয়ার জন্য ছেলেকে চাপ দিতে থাকেন পরিবারের সদস্যরা। এক সময় পরিবারের ইচ্ছানুযায়ী ওই চিকিৎসককে ডিভোর্স দিয়ে দেন তার স্বামী।

হাজারো স্বপ্ন নিয়ে সারাজীবনের জন্য যে সংসার গড়েছিলেন তিনি সেটি অল্পতেই ভেঙে চুরমার। এতো গেল একটি ঘটনা, এমন হাজারো ঘটনা আছে। আবার যারা ভালোবাসার টান কিংবা লোকলজ্জার ভয়ে সংসার টিকিয়ে রেখেছেন, তাদের সন্তান জন্ম নিয়েছে থ্যালাসেমিয়ার বাহক বা রোগী হয়ে।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলেছেন, থ্যালাসেমিয়া মুক্তজীবন গড়তে হলে বিয়ের আগে ছেলে ও মেয়ের রক্ত পরীক্ষা করে দেখতে হবে। যদি দুজনের থ্যালামেমিয়ার বাহক ও রোগী হয়, তাহলে বিয়ে দেয়া বন্ধ রাখতে হবে। কারণ একজন বাহক বা রোগী হলে আরেকজন সুস্থ হলে সন্তান থ্যালাসেমিয়া মুক্ত হয়ে জন্ম নেবে।

থ্যালাসেমিয়া সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়াতে প্রতি বছর সারা বিশ্বে ৮ মে বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস পালিত হয়। সেই হিসেবে আগামী মঙ্গলবার বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘বিয়ের আগে পরীক্ষা করলে রক্ত, সন্তান থাকবে থ্যালাসেমিয়া মুক্ত।’

বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশনের তথ্যানুযায়ী, থ্যালাসেমিয়া রোগ বাংলাদেশে একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। দেশের জনসংখ্যার মোট ৭ শতাংশ অর্থাৎ ১ কোটি ১ লাখ লোক থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক। বিপুল এই জনগোষ্ঠির পরস্পরের মধ্যে বিয়ে হওয়ার মাধ্যমে প্রতি বছর সাত হাজার শিশু থ্যালাসেমিয়া নিয়ে জন্ম নিচ্ছে। এই রোগ প্রতিরোধের একমাত্র উপায় হচ্ছে বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষা করা।

বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া সমিতি হাসপাতাল ও ইয়ু কাব অব বাংলাদেশের তথ্যানুযায়ী, থ্যালাসেমিয়া একটি রক্ত স্বল্পতাজনিত মারাত্মক বংশগত রোগ। এটি ছোঁয়াচে রোগ নয়। শুধুমাত্র বাবা-মা উভয়ই এই রোগে বাহক হলে সন্তানরা এই রোগ নিয়ে জন্ম নিতে পারে। সংস্থাটির তথ্যানুযায়ী, বাবা ও মা দুজনই থ্যালাসেমিয়ার বাহক হলে তাদের সন্তান ৫০% বাহক, ২৫% রোগী এবং বাকি ২৫% সুস্থ হিসেবে জন্ম নিতে পারে। আর বাবা-মায়ের একজন বাহক ও একজন সুস্থ হলে তাদের সন্তান ৫০% সুস্থ এবং ৫০% বাহক হিসেবে জন্ম নিতে পারে। তাই থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে বিয়ের আগে ছেলে ও মেয়ের রক্ত পরীক্ষা করে জিন বাহকের মধ্যে বিয়ে দেয়া বন্ধ রাখতে হবে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের হেমাটলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মাসুদা বেগম বলেন, থ্যালাসেমিয়া একটি বংশগত রোগ। দেশে থ্যালাসেমিয়া রোগী বা বাহক বেড়ে চলছে। থ্যালাসেমিয়া নিয়ে বাংলাদেশে সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেবে মতে ১০ থেকে ১২ শতাংশ থ্যালাসেমিয়ার বাহক ও রোগী আছেন। আমাদের সচেতনতার অভাবে থ্যালাসেমিয়ার বাহক ও রোগী বাড়ছে। বাবা-মা দুজনই থ্যালাসেমিয়ার বাহক বা রোগী হলে তারে সন্তান থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হবে। বাবা-মার একজন থ্যালাসিমিয়ার বাহক বা রোগী হলে সন্তান আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে না। তাই বিয়ের আগে বর ও কনের রক্ত পরীক্ষা করে নিশ্চিত হতে তারা উভয়ই থ্যালাসেমিয়ার বাহক বা রোগী কিনা। যদি দুজন বাহক বা রোগী হয় তাহলে বিয়ে দেয়া বন্ধ করতে হবে। তবে নারী বা পুরুষের একজন থ্যালাসেমিয়ার বাহক বা রোগী হলে অন্য একজন হলে তাদের সন্তানের থ্যালাসিমিয়া আক্রান্ত হওয়ার সম্ভবনা নেই।

থ্যালাসেমিয়া
থ্যালাসেমিয়া

অধ্যাপক ডা. মাসুদা বেগম বলেন, থ্যালাসেমিয়া যেহেতু রক্ত স্বল্পতাজনিত রোগ। আমাদের যে চিকিৎসা আছে সেটি হলো রোগীর শরীরের রক্ত কমে গেলে রক্ত দিয়ে রাখা। আক্রান্ত মানুষকে প্রয়োজনবোধে ওষুধ এবং রক্ত দিয়েই বাঁচিয়ে রাখতে হয়। এই ক্ষেত্রেও কিছু সমস্যা আছে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আক্রান্ত মানুষকে রক্ত দিতে দিতে রোগীর শরীরে আয়রন জমে যায়। যে আয়রন ভেঙে দিতে আবার অন্য ওষুধ প্রয়োগ করতে হয়। আয়রণ রোগীর দেহ থেকে বের করে আনতে হয়।

শুধু তাই নয়, বাচ্চাদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি হয় না। সেজন্য গ্রোথডিটেকশন করতে হয়, থাইরয়েড ডিটেকশন করতে হয়। এগুলো করতে করতে লাইফটাইম পেয়ে থাকে ৩০-৪০ বছর। থ্যালাসেমিয়া রোগীকে নিয়মিত রক্ত দেয়া চিকিৎসা চালিয়ে রাখা একটি পরিবারের জন্য খুবই কষ্টকর। তারপরও চিকিৎসা চালিয়ে রাখতে হয়। রক্ত রোগের এখন ব্যোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্টেশন। এটি জিন থেরাপি চিকিৎসা চালু নিয়ে গবেষণা চলছে।

অধ্যাপক ডা. মাসুদা বেগম বলেন তিনি বলেন, থ্যালাসেমিয়া রোগ চিকিৎসাব্যবস্থা উন্নত হচ্ছে। থ্যলাসেমিয়া প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরালো করতে হবে। এজন্য সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। বিয়ে রেজিস্ট্রেশনের সময় রক্ত পরীক্ষা রিপোর্ট জমা দেয়ার বিধান সরকারিভাবে চালু করা হলে থ্যালাসেমিয়া বিয়ের আগে জানা যাবে। দেশে আইন করা হয় কাজী রক্ত পরীক্ষা রিপোর্ট না দেখে বিয়ে পরাতে পারবে না। এটি হলে থ্যালাসেমিয়ার বাহক বা রোগী নারী-পুরুষের মধ্যে বিয়ে বন্ধ হবে এবং তাহলে থ্যালাসেমিয়া রোগী কমে যাবে।

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, বিশ্বে থ্যালাসেমিয়ার বাহক প্রায় ২৫০ মিলিয়ন। বাংলাদেশে থ্যালাসেমিয়ার বাহকের সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে বাংলাদেশে প্রায় ১০ থেকে ১২ ভাগ মানুষই থ্যালাসেমিয়ার বাহক। হিসাব অনুযায়ী ১ কোটি ৬০ লাখ থেকে ১ কোটি ৯২ লাখ লোক থ্যালাসেমিয়ার বাহক। বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার শিশু এই ঘাতক ব্যাধী নিয়ে জন্মগ্রহণ করছে। থ্যালাসেমিয়া সাধারণত দুই ধরনের হতে পারে। আলফা থ্যালাসেমিয়া ও বিটা থ্যালাসেমিয়া। আলফা থ্যালাসেমিয়া রোগের উপসর্গ মৃত্যু আর বিটা থ্যালাসেমিয়ার রোগের উপসর্গ অনেক বেশি। এক-দুই বছরের শিশুর ক্ষেত্রে ঠিকমত চিকিৎসা না করলে; এটি শিশুর মৃত্যুর কারণ হতে পারে। বিশ্বে বিটা থ্যালাসেমিয়ার চেয়ে আলফা থ্যালাসেমিয়ার প্রাদুর্ভাব বেশি। প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ১ লক্ষ শিশু থ্যালাসেমিয়ার নিয়ে জন্ম গ্রহণ করে।
কয়েক বছর আগে সাইপ্রাস, ইরাক, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডে থ্যালাসেমিয়ার বাহক ও রোগী বেড়ে যাওয়ায় দেশগুলোতে আইন করা হয় রক্ত পরীক্ষা ছাড়া বিয়ে করা যাবে না। ওই আইন করার পর সেসব দেশে রক্ত পরীক্ষার রিপোর্ট দেখে বিয়ে দেয়া শুরু হয়। ফলে দেশগুলোতে থ্যালাসেমিয়ার রোগী কমে গেছে।

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here