অপেক্ষার পালা হয়তো শেষ হচ্ছে এবার। নতুন ইতিহাসের পথে বাংলাদেশ। শুরু হচ্ছে মহাকাশে কাব্য লেখার পালা। বহুল প্রতিক্ষীত দেশের প্রথম স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু-১ উড়াল দেবে আগামী ১০ মে। মার্কিন বেসরকারি মহাকাশ অনুসন্ধান ও প্রযুক্তি কোম্পানি ‘স্পেসএক্স’-এর বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি। যদিও একাধিকবার তারিখ এবং সময় ঠিক হওয়ার পরও সেটা সম্ভব হয়নি।

বিটিআরসি চেয়ারম্যান শাহজাহান মাহমুদ জানান, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের জন্য ইতোমধ্যে পরীক্ষা শেষ হয়েছে। সব ঠিকঠাকই আছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং কোনো প্রযুক্তিগত সমস্যা না থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেপ ক্যানাভেরাল লঞ্চ প্যাড থেকে আগামী ১০ মে স্থানীয় সময় বিকেল ৪টায় এটি উৎক্ষেপণ করা হবে। বাংলাদেশ সময় অনুযায়ী তখন ১১ মে রাত ৩টা।

স্যাটেলাইটের মূল অবকাঠামো তৈরি করেছে ফ্রান্সের থ্যালেস অ্যালেনিয়া স্পেস। গত ৩০ মার্চ একটি বিশেষ উড়োজাহাজে করে ফ্রান্স থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেপ ক্যানাভেরাল লঞ্চ প্যাডে সেটি পৌঁছায়। গত শুক্রবার স্পেসএক্স বঙ্গবন্ধু-১ এর রকেটের প্রাক-উৎক্ষেপণ পরীক্ষা (ফায়ার স্ট্যাটিক টেস্ট) চালায়। এটি সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে জানিয়ে গত শনিবার টুইটারে একটি বিবৃতি দেয় প্রতিষ্ঠানটি।

সাড়ে তিন হাজার কেজি ওজনের জিওস্টেশনারি কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ফ্যালকন-৯ কক্ষপথের দিকে ছুটবে কেনেডি স্পেস সেন্টারের ঐতিহাসিক লঞ্চ কমপ্লেক্স ৩৯-এ থেকে। এ লঞ্চ কমপ্লেক্স থেকেই ১৯৬৯ সালে চন্দ্রাভিযানে রওনা হয়েছিল অ্যাপোলো-১১। স্যাটেলাইটটির জন্য রাশিয়ার উপগ্রহ কোম্পানি ইন্টারস্পুটনিকের কাছ থেকে কক্ষপথ (অরবিটাল স্লট) কেনা হয়েছে। প্রায় ২১৯ কোটি টাকায় মহাকাশের ১১৯ দশমিক ১ পূর্ব দ্রাঘিমায় ১৫ বছরের জন্য এ কক্ষপথ কেনা হয়েছে।

স্যাটেলাইটের কাজ
১. মহাকাশ বা জ্যোতির্বিজ্ঞান গবেষণা।
২. আবহাওয়ার পূর্বাভাস।
৩. টিভি বা রেডিও চ্যানেল, ফোন, মোবাইল ও ইন্টারনেট যোগাযোগ প্রযুক্তি।
৪. নেভিগেশন বা জাহাজের ক্ষেত্রে দিক নির্দেশনা।
৫. পরিদর্শন-পরিক্রমা (সামরিক ক্ষেত্রে শত্রুর অবস্থান জানার জন্য)।
৬. দূর সংবেদনশীল।
৭. মাটি বা পানির নিচে অনুসন্ধান ও উদ্ধার কাজ।
৮. মহাশূন্য এক্সপ্লোরেশন।
৯. ছবি তোলার কাজ (সরকারের জন্য এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ)।
১০. হারিকেন, ঘূর্ণিঝড়, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পূর্বাভাস।
১১. গ্লোবাল পজিশনিং বা জিপিএস।
১২. পারমাণবিক বিস্ফোরণ এবং আসন্ন হামলা ছাড়াও স্থল সেনাবাহিনী এবং অন্যান্য ইন্টিলিজেন্স সম্পর্কে আগাম সতর্কবার্তা পেতে।
১৩. তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও বিভিন্ন খনির সনাক্তকরণ ইত্যাদি।
১৪. ডিজিটাল ম্যাপ তৈরি করা।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটে বাংলাদেশের কী সুবিধা?
এই কৃত্রিম উপগ্রহটি টেলিভিশন চ্যানেল, ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান, ভি-স্যাট ও বেতারসহ ৪০ ধরনের সেবা দেবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ট্যারিস্ট্রিয়াল অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে সারা দেশে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা বহাল থাকা, পরিবেশ যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে ই-সেবা নিশ্চিত করবে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট। বর্তমানে অন্যান্য দেশের স্যাটেলাইট ব্যবহারের জন্য মিলিয়ন মিলিয়ন মার্কিন ডলার গুণতে হয়। নিজস্ব হলে অর্থ সাশ্রয়ের পাশাপাশি ভাড়া দিয়ে উল্টো বৈদেশিক মুদ্রা আয় হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে।

টিভি এবং রেডিও ব্রডকাস্ট আরও দ্রুত এবং মসৃণ হবে। বেড়ে যাবে এইচডি কোয়ালিটিও। এ ছাড়াও দেশের সার্বিক যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করবে। আবহাওয়ার গতি পর্যবক্ষেণ করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে, ঝড়ের গতিবেগ ও পথ নির্ণয় করে ক্ষয়-ক্ষতি কমিয়ে আনা যাবে।

বেড়ে যাবে ইন্টারনেটের গতি। প্রত্যান্ত অঞ্চলে দ্রুত ডাটা পাঠানো যাবে, দেশের যেকোনো প্রান্তে যোগাযোগ আরও দ্রুততর হবে। ভূমি ও সমুদ্রে প্রাকৃতিক সম্পদ অনুসন্ধানে সহায়তা করবে, এটি সমগ্র দক্ষিণ এশিয়াসহ, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, তুর্কিমিনিস্তান, কাজাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশে সেবা দিতে পারবে। বছরে সম্ভাব্য আয় ধরা হয়েছে ৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। সার্বিক উন্নয়নের ফলে দেশে বেকার সমস্যারও সমাধান হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এর জন্য ব্যয়
প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মোট খরচ হচ্ছে ২ হাজার ৯০২ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে দেওয়া হচ্ছে ১ হাজার ৫৪৪ কোটি টাকা। আর ঋণ হিসেবে বাকি ১ হাজার ৩৫৮ কোটি টাকা দিচ্ছে এইচএসবিসি ব্যাংক।

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here