বাংলাদেশে অ্যাপভিত্তিক ‘রাইড শেয়ারিং’ সেবা নিয়ে তৈরি নীতিমালা বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। গ্রাহকরা যেমন এ নীতিমালার সমালোচনা করছেন, তেমনি যারা সেবা দেন তারাও অসন্তুষ্ট।

যাত্রীরা অভিযোগ করছেন, নীতিমালা কার্যকর করার পর ভাড়া বেশি নেয়া হচ্ছে। আর রাইড শেয়ারিংয়ের চালকদের বিরুদ্ধে ও দুর্ব্যবহারসহ নানা ধরনের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। অভিযোগের পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। বিশেষ করে নারী যাত্রীরা তাদের দুর্ব্যবহার ও ননপ্রফেশনাল আচরণের শিকার বেশি হচ্ছেন।

জানা গেছে, গত ১৫ জানুয়ারি মন্ত্রিসভা রাইড শেয়ারিং সেবার নীতিমালা অনুমোদন করে। ২৮ ফেব্রুয়ারি রাইড শেয়ারিং সেবার নীতিমালার গেজেট জারি করা হয়। মার্চ থেকে এটি কার্যকর হয়েছে।

অ্যাপভিত্তিক ক্যাব ও মোটরবাইক উভয়কেই এ নীতিমালার আওতায় আনা হয়েছে। এ নীতিমালায় ৮টি অনুচ্ছেদ ও ১১টি শর্ত যুক্ত করা হয়েছে।

নীতিমালায় বলা হয়েছে, রাইড শেয়ারিং সেবার আওতায় চলাচল করা ব্যক্তিগত গাড়ির ভাড়া ঠিক করবে পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান। এ নীতিমালার অধীনে একজন মোটরযান মালিক একটি মোটরযান রাইড শেয়ারিং সেবার আওতায় পরিচালনার অনুমতি পাবেন। ব্যক্তিগত মোটরযানের রেজিস্ট্রেশন পাওয়ার পর এক বছর পার না হলে রাইড শেয়ারিং সেবায় নিয়োজিত করা যাবে না।

এ নীতিমালার বিষয়ে জানতে ‘উবার’ ও ‘পাঠাও’-এর কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কাউকে পাওয়া যায়নি।

তবে নানা সূত্র থেকে জানা গেছে, উবারের গাড়ি সার্ভিসে সর্বনিম্ন ভাড়া ৪০ টাকা, পরের প্রতি কিলোমিটারের জন্য ১৮ টাকা। প্রতি ১ মিনিট ওয়েটিং চার্জ ৩ টাকা। সেবা বাতিলের জন্য দিতে হবে ৩০ টাকা। এ কোম্পানির বাইক সার্ভিসের জন্য গুনতে হবে সর্বনিম্ন ৩০ টাকা। প্রতি কিলোমিটার ১২ টাকা এবং প্রতি ১ মিনিট ওয়েটিংয়ের জন্য ১ টাকা নির্ধারণ করা রয়েছে।

পাঠাওয়ের গাড়ির সর্বনিম্ন ভাড়া ৫০ টাকা। প্রতি কিলোমিটারের জন্য ২০ টাকা এবং প্রতি ১ মিনিট ওয়েটিংয়ের জন্য ৫০ পয়সা। একই কোম্পানির বাইক সার্ভিসের সর্বনিম্ন ভাড়া ২৫ টাকা। পরের প্রতি কিলোমিটার ১২ টাকা এবং প্রতি মিনিট ওয়েটিং চার্জ ৫০ পয়সা।

রাইড শেয়ারিংয়ের চালকদের বিরুদ্ধে ও দুর্ব্যবহারসহ নানা ধরনের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে

কিন্তু যাত্রীরা অভিযোগ করছেন নীতিমালা কার্যকর করার পর ভাড়া বেশি নেয়া হচ্ছে। আর রাইড শেয়ারিংয়ের চালকদের বিরুদ্ধে ও দুর্ব্যবহারসহ নানা ধরনের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।

যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, এ নীতিমালা করার আগে যাত্রী এবং পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান- কোনো পক্ষের সঙ্গেই আলোচনা করা হয়নি। ফলে ফ্লাইওভারের চার্জ, পার্কিং চার্জ কে দেবে তা নির্ধারণ করা হয়নি। আর কোম্পানিগুলো এখন তা যাত্রীদের কাছ থেকেই আদায় করছে।

তিনি আরও বলেন, ভাড়া নির্ধারণের ক্ষমতা কোম্পানিগুলোর হাতে থাকায় তারা পরিস্থিতি বুঝে ভাড়া নির্ধারণ করছে। তাই যে এলাকায় যাত্রী বেশি সেখানে ভাড়া বেশি। যে এলাকায় যাত্রী কম সেখানে ভাড়া কম। আবার সামান্য লোকেশন জটিলতার কারণে তারা যাত্রীদের পথেই নামিয়ে দেয়। এ কারণে রোগী ও বৃদ্ধরা বিপাকে পড়েন।

মোজাম্মেল হক বলেন, যাত্রীদের প্রতি দুর্ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। আমরা অনেক অভিযোগ পাচ্ছি। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের কাছে তাৎক্ষণিক অভিযোগ ও প্রতিকারের কোনো ব্যবস্থা নেই। বিমানবন্দরের যাত্রীদের কাছ থেকে পণ্যের আলাদা ভাড়া দাবি করা হচ্ছে।

২০১৬ সালের মে মাসে রাজধানী ঢাকায় প্রথম মোটরসাইকেল রাইড চালু করে স্যাম। সংস্থাটির প্রধান ইমতিয়াজ কাশেম।

তিনি বলেন, যারা নীতিমালা করেছেন, তারা রাইড শেয়ারিং ও ট্যাক্সিক্যাব সার্ভিসকে এক করে ফেলেছেন। আসলে দুটি দুই জিনিস। রাইড শেয়ারিং হলো চালু থাকা প্রাইভেটকার বা ব্যক্তিগত মোটরসাইকেলকে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের সুযোগ দিয়ে যানবাহনের ওপর চাপ কমানো এবং মানুষকে কম ভাড়ায় যানবাহনে চড়ার সুযোগ দেওয়া। ফলে এ সার্ভিসে ট্যাক্সিক্যাবের চেয়ে ভাড়া অবশ্যই কম থাকবে। কিন্তু তা না করায় এখন কেউ কেউ মোটরসাইকেল বা গাড়ি কিনে কোনো রাইড শেয়ারিং কোম্পানিতে যুক্ত হয়ে পুরোপুরি ব্যবসায় নামছেন। এভাবে চললে একসময় এ সার্ভিস বন্ধ হতে বাধ্য।

তিনি বলেন, যারা রাইড শেয়ার করবেন তারা ফ্রিল্যান্সার। তাই তাদের একটিমাত্র প্রতিষ্ঠানে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার নিয়মের কারণে তারা ওই প্রতিষ্ঠানের হাতে জিম্মি হয়ে পড়বেন।

ইমতিয়াজ কাশেম আরও বলেন, রাইড শেয়ার যারা করেন, তারা তাদের সুবিধামতো অফার গ্রহণ করেন। কিন্তু ট্যাক্সিক্যাবের এ সুযোগ নেই। কোনো যাত্রী তাকে অফার করলে সে যেতে বাধ্য। ট্যাক্সিক্যাবের একটি নির্দিষ্ট রং থাকে। কিন্তু রাইড শেয়ারের গাড়ির জন্য তা প্রযোজ্য নয়।

একটি ভুল নীতিমালা করে সবাইকে এখন ট্যাক্সিক্যাব ব্যবসায়ী হওয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। এটি রাজধানীর পরিবহন ব্যবস্থায় নতুন সংকট তৈরি করবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

কেউ কেউ মোটরসাইকেল বা গাড়ি কিনে কোনো রাইড শেয়ারিং কোম্পানিতে যুক্ত হয়ে পুরোপুরি ব্যবসায় নামছেন

রাইড শেয়ারের শর্তগুলো

কোম্পানিকে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) থেকে তালিকাভুক্তির সনদ নিতে হবে।

অ্যাপসের মালিককে টিআইএনধারী হতে হবে এবং নিয়মিত ভ্যাট পরিশোধ করতে হবে। আর কোম্পানি হলে জয়েন্ট স্টক থেকে কোম্পানির রেজিস্ট্রেশন নিতে হবে। নিজস্ব অফিস থাকতে হবে।

ঢাকায় সেবা দেওয়ার জন্য কমপক্ষে ১০০, চট্টগ্রামে ৫০টি এবং অন্য জেলা শহরে ২০টি গাড়ি থাকতে হবে।

গাড়িগুলোর বিআরটিএ থেকে ট্যাক্স পরিশোধ ও রুট পারমিট আপডেট থাকতে হবে। মালিক ও চালকের মধ্যে একটি সমঝোতা চুক্তি থাকতে হবে।

স্ট্যান্ডছাড়া যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং করা যাবে না।

বিআরটিএর ওয়েবসাইটে এ সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান, মালিক ও চালকের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য থাকতে হবে।

তালিকাভুক্তির জন্য আবেদনের সঙ্গে এক লাখ টাকাসহ অন্যান্য ফি জমা দিতে হবে। তালিকাভুক্তির মেয়াদ হবে তিন বছর। পরে এটি নবায়ন করতে হবে। নবায়ন ফি হবে ১০ হাজার টাকা।

মালিক ও চালকের বিরুদ্ধে অনলাইনে অভিযোগ করা যাবে।

শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে তালিকাভুক্তির সনদ বাতিলসহ প্রচলিত আইনে মামলা করা যাবে। খবর: ডয়েচে ভেলে।

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here