দেড় বছর আগে নুরুল ইসলামের ফ্ল্যাট বাড়ির নিচতলা ভাড়া নেন ফরিদপুরের সরকারি সারদা সুন্দরী মহিলা কলেজের গার্হস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপিকা সাজিয়া বেগম (৩৪)। বেশিরভাগ সময় তিনি তার ছোট ছেলে তাসিনকে (৪) নিয়ে সেখানে থাকতেন। সাজিয়ার স্বামী শেখ শহিদুল ইসলাম ব্যবসার সূত্র ধরে বড় ছেলে রিশাদকে (১১) নিয়ে থাকতেন ঢাকার সূত্রাপুরে।

এদিকে ফরিদপুর সোনালী ব্যাংকে চাকরি করছেন এমন পরিচয় দিয়ে ব্যাংক কর্মকর্তা ফারুক হোসেন (৩৮) ওই বাড়ির নিচতলার ফ্ল্যাটের একটি কক্ষ ভাড়া নেন মাসখানেক আগে। পরিবার নিয়ে থাকবেন বলে কক্ষটি ভাড়া নেন তিনি। কিন্তু থাকতেন একাই। প্রকৃতপক্ষে ফারুক হোসেন চাকরি করতেন সোনালী ব্যাংক ঢাকার মতিঝিল শাখার অডিট কর্মকর্তা হিসেবে। মিথ্যা তথ্য দিয়ে তিনি বাসা ভাড়া নেন বলে জানা যায়।

এর মধ্যে রোববার রাত ১২টার দিকে শহরের দক্ষিণ ঝিলটুলীর ৩২/এ নম্বরের ওই বাড়ি থেকে ফারুক ও সাজিয়ার লাশ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানায়, ফারুক হোসেনের লাশ ছিল ঝুলন্ত অবস্থায় এবং সাজিয়া বেগমেরটি মেঝেতে পড়েছিল। আর ওই রুমটিই ছিল ফারুক হোসেনের।

অনৈতিক সম্পর্কের কারণেই এ দুজন খুন হয়েছেন বলে পুলিশ ধারণা করছে। আর সেই ধারণা থেকে সন্দেহের তালিকায় আছেন সাজিয়া বেগমের স্বামী শেখ শহিদুল ইসলাম। এরই মধ্যে তাকে থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। পুলিশের দ্বিতীয় সন্দেহের তালিকায় রয়েছে বাড়ির মালিক নুরুল ইসলামের ছেলে মাহমুদুল হাসান ডেবিট। কারণ তিনিই প্রথম লাশের বিষয়ে খবর দেন।

ডেবিট অবশ্য জানান, রাত ১১টার দিকে একটি গানের অনুষ্ঠান থেকে বাসায় ফেরার পর নিচতলায় ফারুক হোসেনের কক্ষের দরজা খোলা দেখতে পান। এ সময় তিনি কক্ষের ভেতর উঁকি দিয়ে দেখেন ফারুকের লাশ সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলে রয়েছে। তাৎক্ষণিক কোতোয়ালি থানাপুলিশকে ঘটনাটি জানান। পরে পুলিশ এসে লাশ দুটি উদ্ধার করে। সাজিয়া বেগমের মাথা ও বুকে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। লাশ ঝুলন্ত থাকলেও ফারুক হোসেনের গায়েও ধারালো অস্ত্রের আঘাত।

আলোচিত এ জোড়া খুনের ঘটনায় কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় নিয়ে মাঠে নেমেছে পুলিশ, পিবিআই ও র‌্যাব। তারা জানায়, যে কক্ষ থেকে দুজনের লাশ উদ্ধার করা হয়, সেটির মূল দরজা খোলা ছিল। তা ছাড়া ফারুক হোসেন নিজে সাজিয়াকে খুন করে আত্মহত্যা করে থাকলে তার গায়ে আঘাত করল কে? আর ফারুক নিজে আত্মহত্যা করলে ফ্যানের সঙ্গে ঝুললেন কীভাবে। কেননা, সেখানে তো কোনো চেয়ার-টেবিল ছিল না। বাইরে থেকে কেউ এ জোড়া হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ছাড়া বাড়ির মালিকের ছেলের বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে তাদের ধারণা, পরকীয়ার বিষয়টি সাজিয়ার স্বামী জেনে যাওয়ার পর পরিকল্পিতভাবে দুজনকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে।

শেখ শহিদুল ইসলাম জানান, ব্যবসায়িক কারণে তিনি ঢাকায় থাকেন। মাঝে মধ্যে ফরিদপুরে আসেন। গত বুধবার তিনি ফরিদপুরে এসেছেন। রোববার সাজিয়া কলেজে যাওয়ার পর বেলা ৩টার দিকে তার সঙ্গে সর্বশেষ কথা হয়েছে। তখন সাজিয়া তাকে বলেছিলেন, ‘বাসায় ফিরতে দেরি হবে।’ কিন্তু সন্ধ্যা পর্যন্তও না ফিরলে তিনি ফোন করেন। তবে সেটি বন্ধ পান। পরবর্তী সময় কলেজে খোঁজ নিয়ে সাজিয়ার সন্ধান না পেয়ে কোতোয়ালি থানাপুলিশকে জানান। রাতে যখন পুলিশ ফারুক ও সাজিয়ার লাশ উদ্ধার করে, তখন তিনি বাসায় ছিলেন। ফারুকের কক্ষ থেকে কোনো ধস্তাধস্তি কিংবা কোনো ধরনের শব্দ শুনতে পাননি বলেও জানান তিনি।

নিহত ফারুক হোসেনের ভাই ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের এএসআই সোহরাব হোসেন জানান, তারা দুই ভাই ও এক বোন। সবার ছোট ফারুক হোসেন। তাদের গ্রামের বাড়ি যশোরের শার্শা উপজেলার উত্তর বুরুজ বাজার গ্রামে। ফারুক তার কাছেই থাকতেন। তবে তিনি ফরিদপুরে কী কারণে এসেছেন কিংবা বাসা ভাড়া করে মাঝে মধ্যেই থাকতেন, তা তাদের জানা নেই। ফারুক হোসেন অবিবাহিত ছিলেন।

স্থানীয়দের ধারণা, সাজিয়া বেগম ব্যাংক কর্মকর্তা ফারুক হোসেনের সঙ্গে পরকীয়ায় জড়িয়েছিলেন। ফলে ফারুক হোসেন ঢাকায় চাকরি করলেও ফরিদপুরে সাজিয়া বেগমের পাশের কক্ষটি ভাড়া নেন।

সারদা সুন্দরী মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ সুলতান মাহমুদ জানান, সাজিয়া বেশ হাসিখুশি থাকতেন সব সময়। রোববার দুপুরে কলেজ থেকে বের হওয়ার পর তাকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে তার স্বামী জানান। তিনি বিষয়টি স্থানীয় পুলিশকে অবহিত করতে বলেন। এ ধরনের ঘটনার সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন অধ্যক্ষ।

ফরিদপুর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এএফএম নাসিম জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, পরকীয়ার কারণে এ হত্যাকাণ্ড। ফারুক হোসেন ঢাকায় চাকরি ও বসবাস করলেও কী কারণে মিথ্যা তথ্য দিয়ে বাসা ভাড়া নেন, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here