বাবা-মা দুজনই সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন। বাবা ২০০৩ সালে মৃত্যুবরণ করেন। মা অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষিকা। তিনি এখনও জীবিত। আমাকে এলাকার সবাই নম্রভদ্র ছেলে হিসেবেই জানে। কারও মনে প্রশ্ন জাগলে খবর নিয়ে দেখতে পারেন।

যাই হোক, এলাকার মধ্যে সুনামের সহিত স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে কলেজে ভর্তি হই। এবং সেখানেও আশানুরূপ রেজাল্ট করে এইচ এস সি পাস করি। আমার সময়ে আমাদের অঞ্চল তথা উত্তরবঙ্গের খুব কম মানুষই ঢাকামুখী ছিল। আমার সহপাঠীদের বেশীরভাগই রাজশাহীমুখি ছিল। আমি অনেক স্বপ্ন নিয়ে ঢাকার দিকে পা বাড়াই। আমার মনে আছে, আমি আমার মাকে বলেছিলাম, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া পর্যন্ত আমাকে আমার খরচ দিও। ভর্তি হওয়ার পর আমি নিজেই আমার ব্যবস্হা করে নিবো। কিন্তু আমি আজও সেই কথা রাখতে পারিনি।

ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করি এবং ভর্তি হই। তারপর থেকে নতুন এক জীবন শুরু হয়। স্কুল-কলেজে পড়ার সময় ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় ছিলাম না, তবে সে সময় থেকেই বঙ্গবন্ধুর প্রতি একধরনের দুর্বলতা ছিল। সেই দুর্বলতা শক্তিতে রুপান্তরিত হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর। ১ম বর্ষে ভর্তি হওয়ার পর হলে থাকলে সবারই একটু-আধটু রাজনীতি করে। আর সেই সূত্রধরেই আস্তে আস্তে রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠা।

১ম বর্ষে এসে রিপন-রোটন (কেন্দ্রীয়) এবং টিপু-বাদশা (বিশ্ববিদ্যালয়) কমিটি পাই। সেই কমিটির অধীনে আমার হল কমিটিতে, আমি পরিবেশ সম্পাদকের দায়িত্ব পাই। পরবর্তীকালে সোহাগ-নাজমুল (কেন্দ্রীয়) মেহেদী-শরিফ(বিশ্ববিদ্যালয়) কমিটিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সহ-সভাপতির দায়িত্ব পাই এবং বর্তমান সোহাগ-জাকির (কেন্দ্রীয়) কমিটিতে সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালনরত।

এই দীর্ঘ ছাত্ররাজনৈতিক জীবনে অনেক কিছুরই স্বাক্ষী হয়েছি। কখনও প্রত্যক্ষ কখনও পরোক্ষভাবে। অনেকের উত্থান দেখেছি আবার অনেকের পতনও দেখেছি। অনেকেই সময়ের আবর্তনে হারিয়ে গেছে। আবার অনেকেই আমাকে অতিক্রম করে এগিয়ে গেছে।

আমার, মনে আছে ১/১১ এর কথা, মনে আছে পিলখানার বিদ্রোহের কথা। আমি মুখোমুখি হয়েছি ২০১২ সালের ১১ সেপ্টেম্বরে বহিরাগত ছাত্রদলের সন্ত্রাসীদের প্রিয় ক্যাম্পাস দখলের চেষ্টার। জাতীয় পত্রিকার শিরোনাম হই।

তারপর একাধারে বিএনপি-জামাতের জ্বালাও পোড়াও রাজনীতি, পেট্রল বোমা, অবরোধ, হেফাজতের তান্ডব, বখশি বাজার মোড়ে বিএনপির সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষ, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, বিচারের রায় কার্যকরসহ বর্তমান সময় পর্যন্ত সকল প্রকার সংকট প্রত্যক্ষভাবে মোকাবেলা করে এসেছি।

আমি বলবো না যে, সব সময় সফল হয়েছি, তবে সবসময়ই অর্পিত দায়িত্বটা সঠিকভাবে পালনের চেষ্টা করেছি। এই দীর্ঘ সময়ে ছাত্ররাজনীতি করতে গিয়ে অনেক প্রকারের রাজনীতি দেখেছি। দেখেছি অনেক নিয়ম, তেমনি দেখেছি নিয়মের নামে অনিয়ম। এই নিয়ম এবং অনিয়মের মারপ্যাঁচে অনেক যোগ্য এবং ত্যাগী কর্মীকে সংগঠন হারিয়েছে।

প্রতিটা সমাজ পরিচালনার জন্য কিছু নিয়মনীতি থাকে এবং সে অনুযায়ী সমাজ পরিচালিত হয়, যাকে বলে সংবিধান। তবে সেই নিয়মগুলো সেই সমাজের মানুষের কল্যাণের কথা মাথায় রেখেই তৈরি করা হয়। ঠিক তেমনিভাবে সংগঠন পরিচালনার জন্য কিছু নিয়মনীতি থাকে, যাকে আমরা বলি গঠনতন্ত্র। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সংগঠন চলে। আমার প্রিয় সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগও তার গঠনতন্ত্র অনুযায়ী এবং আমাদের প্রাণপ্রিয় নেত্রী যিনি ছাত্রলীগের শেষ আশ্রয়স্থল দেশরত্ন শেখ হাসিনার নির্দেশে চলে।

গত কয়েকটি সম্মেলনে একটা বিষয় বারবার উঠে এসেছে যে, এবারের সম্মেলনে নেতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে বয়স কত নির্ধারণ হবে? আমার কথা হচ্ছে বয়স যাই হোক সেটা নির্দিষ্ট হলেই ভালো হয়। তবে বয়স নির্ধারণের ক্ষেত্রে অবশ্যই একটি সর্বজনীন এবং যুক্তিযুক্ত রুপরেখা হওয়া দরকার। গত কয়েকটি সম্মেলনে যে সীমারেখা ধরে নেতা
নির্বাচন করা হয়েছে আমার মনে হয় ছাত্রলীগের অনেক কর্মীর মনে প্রশ্ন জাগে যে, এই সীমারেখা কেন, কী কারণে? হয়তো কেউ প্রকাশ করে, কেউ করে না।

কথিত একটি যুক্তি আছে, ছাত্রলীগের ছেলেরা যাতে ছাত্রলীগ শেষ করে সরকারি চাকুরিতে প্রবেশ করতে পারে সেই জন্য এই সীমারেখা। কিন্তু এক্ষেত্রে আমার মতো অনেকেরই প্রশ্ন, আসলে এই বয়সসীমা পার করে পরবর্তীতে ছাত্রলীগ ছেড়ে সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করা কতটুকু সম্ভব? এই প্রশ্নটা আজ অনেকের মাঝেই ঘুরপাক খাচ্ছে, যা ফেসবুকসহ বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে।

যে যুক্তির কারণে ছাত্রলীগের বয়সের সীমারেখা করা হয়েছে তা যদি যুক্তিযুক্ত না হয় তাহলে আমার মনে হয় বিষয়টা নিয়ে আরেকবার ভাবা দরকার। ছাত্রলীগ মানুষকে যুক্তি শিক্ষা দেয়, ছাত্রলীগ মানুষকে উন্নত ভাবনা ভাবতে শেখায়, ছাত্রলীগ মানুষকে উন্নত স্বপ্ন দেখতে শেখায়। তাই আমরা যারা ছাত্রলীগ করি, আমরা উন্নত স্বপ্ন দেখি। কিন্তু যখন আমরা বাস্তবতার সাথে যুদ্ধ করে টিকতে পারি না তখন রাজ্যের হতাশা আমাদের উপর চেপে বসে।

শুধুমাত্র বয়স সীমারেখার কারণে অনেক ত্যাগী, যোগ্য, অভিজ্ঞ এবং সাংগঠনিক কর্মীর উপর হতাশা চেপে বসে যা একটি সংগঠনের জন্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিকর।
সাবেক ছাত্রলীগের এক ভাইয়ের লেখায় উঠে এসেছে ছাত্রলীগের বয়স হয় ২৬/২৭ অথবা ৩১/৩২ করা উচিৎ। ২৬/২৭ অথবা ৩১/৩২ যেটাই হোক আমার কোনো আপত্তি নেই। তবে

এক্ষেত্রে আমার বক্তব্য হলো, ২৬/২৭ হলে সংগঠন পরীক্ষিত এবং সাংগঠনিক যোগ্যতা সম্পন্ন নেতৃত্বের অভাববোধ করবে। আর যদি ৩১/৩২ হয় তাহলে সংগঠন পাবে দক্ষ এবং সাংগঠনিক নেতৃত্ব। যার মাধ্যমে সংগঠন শক্তিশালী হয়ে উঠবে। আর এই বয়সী ছাত্রনেতারা রাজনৈতিকভাবে পরিপক্ব হয়ে ছাত্ররাজনীতি ছাড়বে এবং আওয়ামীলীগের সম্পদে পরিণত হবে। এই ছাত্রনেতাকে আওয়ামী রাজনীতির যেখানেই দায়িত্ব দেয়া হবে সেখানেই সে সফলভাবে কাজ করতে সক্ষম হবে।

তাই, ছাত্রলীগের নীতি নির্ধারকগণের কাছে আমার আকুল আবেদন যে, বয়সের সীমারেখাটা নিয়ে কী আরেকবার ভাবা যায় না? আমার মনে হয় নেতৃত্বে ম্যাচিউরিটি বা পরিপক্বতা না থাকলে যতোই ভালো বা ক্লিন ইমেজের নেতা নির্বাচন করা হোক না কেন, সংগঠন চালানোর সময় বিভ্রান্তিতে পড়ে যাবে।

* লেখক- শরিফুল হাসান ফারুক, সাংগঠনিক সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ।

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here