ফরিদপুরে কলেজ শিক্ষিকা সাজিয়া বেগম ও সোনালী ব্যাংক কর্মকর্তা ফারুক হোসেন হত্যাকাণ্ডের রহস্য এখনো উদ্ঘাটন করতে পারেনি পুলিশ। তবে চাঞ্চল্যকর এ ঘটনা নিয়ে রহস্য ঘনীভূত হচ্ছে। সন্দেহের তীরটা সাজিয়ার স্বামী শেখ শহিদুল ইসলামের দিকেই। ঘটনার পর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাকে আটক করা হলেও সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। সোমবার রাতে নিহত সাজিয়া বেগমের ফুফু আফসারী আহমেদ বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামাদের আসামি দিয়ে মামলা করেছেন।

আনুষ্ঠানিকতা শেষে সাজিয়া বেগম ও ফারুক হোসেনের লাশ স্বজনদের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ফারুকের লাশ গ্রহণ করেন তার বড় ভাই পুলিশের এএসআই সোহরাব হোসেন। পরে সেটি গ্রামের বাড়ি যশোরের শার্শায় নিয়ে যাওয়া হয়। আর কলেজ শিক্ষিকা সাজিয়া বেগমের মরদেহ হস্তান্তর করা হয় ভাই শেখ সাইজাদের কাছে। মরদেহ বর্তমানে ফরিদপুর ডায়াবেটিস হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়েছে। বুধবার ঢাকায় নিয়ে দাফন করা হবে বলে তার পরিবার জানিয়েছে।

এদিকে কলেজ শিক্ষিকা সাজিয়া খুনের ঘটনায় ফুঁসে উঠেছে সরকারি সারদা সুন্দরী মহিলা কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মচারীরা। গতকাল সকালে প্রতিষ্ঠানটির সামনের সড়কে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়। এতে অংশ নিতে এসে নিহত সাজিয়ার মা-ভাইসহ স্বজনরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। দ্রুত সময়ের মধ্যে এ খুনের সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার করা না হলে কঠোর আন্দোলনের হুমকি দেওয়া হয় মানববন্ধনে। পরে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কাছে স্মারকলিপি দেন তারা।

আলোচিত এ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বিপুল কুমার দে জানান, জোড়া খুনের ঘটনায় করা মামলায় অজ্ঞাতনামা আসামি হলেও নিহত সাজিয়ার স্বামীকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। প্রয়োজনে তাকে রিমান্ডে এনে আরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

গত রোববার রাত ১২টার দিকে শহরের ঝিলটুলী এলাকার একটি ফ্ল্যাট থেকে সাজিয়া বেগম ও ফারুক হোসেনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তবে এটি আত্মহত্যা, নাকি হত্যাকাণ্ড- এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে এরই মধ্যে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে, তাদের মধ্যে পরকীয়া ছিল। ফলে বিষয়টি প্রাধান্য পাচ্ছে তদন্তে। সোমবার সকালেই সাজিয়ার স্বামী শেখ শহিদুল ইসলামকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেওয়া হয়। তিনি ঢাকায় মোটর পার্টসের ব্যবসা করেন। মাঝে মধ্যে ফরিদপুরে আসতেন। দুই ছেলে নিয়ে ঝিলটুলীর নুরুল ইসলামের বাড়ির নিচতলায় ভাড়া থাকতেন তার স্ত্রী সাজিয়া। তবে রোবরার ঘটনার সময় ফরিদপুরে ছিলেন শহিদুল।

কলেজ শিক্ষিকা সাজিয়া বেগম ও সোনালী ব্যাংক কর্মকর্তা ফারুক হোসেনের মরদেহ
কলেজ শিক্ষিকা সাজিয়া বেগম ও সোনালী ব্যাংক কর্মকর্তা ফারুক হোসেনের মরদেহ
ফরিদপুর কোতোয়ালি থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) এএফএম নাসিম জানান, শিক্ষিকার লাশ দরজার পাশে রক্তাক্ত অবস্থায় এবং ব্যাংক কর্মকর্তারটি ফ্যানের হুকের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। তার বুকে ক্ষত রয়েছে। ফ্ল্যাটে রক্তমাখা ছুরিও পাওয়া যায়।

তিনি বলেন, ‘প্রাথমিক তদন্তে দুজনের পারিবারিক সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে, তাদের মধ্যে পরকীয়া ছিল। প্রথমে আমরা ভেবেছিলাম, শিক্ষিকাকে হত্যা করে নিজে আত্মহত্যা করেছেন ফারুক। তবে বেশ কিছু আলামত থেকে এটিকে আত্মহত্যা বলে মনে হচ্ছে না। তাদের হত্যা করা হয়েছে বলে মনে করছি। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ও অনুসন্ধান শেষে বিষয়টি পরিষ্কার হওয়া যাবে।’

ওসি নাসিম আরও জানান, ফারুক পরিচয় গোপন করে সাজিয়ার পাশের ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছিলেন। সোনালী ব্যাংক ফরিদপুর শহর শাখায় চাকরি করার তথ্য দিয়ে বাসা ভাড়া নিলেও তিনি মূলত ঢাকার মতিঝিল করপোরেট শাখার লিগ্যাল মেটারস বিভাগের প্রিন্সিপাল কর্মকর্তা ছিলেন। কয়েকদিন আগে তিনি এই বাসায় ওঠেন। নিয়মিত থাকতেন না। ফলে ফারুক-সাজিয়া পরকীয়ার কারণে অন্য কারও ক্রোধের বলি হয়েছেন কি-না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

সাজিয়ার শ্বশুরবাড়ি রাজধানীর সূত্রাপুর থানার বানিয়ানগর। ফারুকের গ্রামের বাড়ি যশোরের শার্শায় হলেও রাজধানীর আগারগাঁও এলাকার ৩৮ নম্বর বাড়িতে ভাইয়ের সঙ্গে ভাড়া থাকতেন। ছিলেন অবিবাহিত।

শহিদুল ও তার ফুফু আফসারী আহমেদ জানান, অন্যান্য দিনের মতো রোববারও কলেজে যান সাজিয়া। বিকেল ৪টায় ফোনে কথা হলে বাসায় ফিরছেন বলে জানান। এরপর আর ফোন রিসিভ করেননি। রাত ১১টার দিকে ফারুকের ফ্ল্যাটে তাদের মরদেহ পাওয়া যায়।

ওসি নাসিম জানান, জোড়া খুনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। কয়েকটি বিষয় সামনে রেখে মাঠে নেমেছে পুলিশ। আশা করছি অচিরেই রহস্য উদ্ঘাটন সম্ভব হবে।

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here