একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার এক আসামির সঙ্গে গোপনে বৈঠক করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার ড. তুরিন আফরোজ। ওই আসামির কাছে মামলার স্পর্শকাতর কিছু তথ্য সরবরাহ করেছেন বলেও তার বিরুদ্ধে অভিযোগ। আর সে কারণেই ট্রাইব্যুনালের সব ধরনের মামলা থেকে তাকে অব্যাহতি দিয়েছে প্রসিকিউশন। যদিও তুরিন আফরোজ বলছেন- যা কিছু করেছি, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশেই।

ট্রাইব্যুনাল সূত্রে জানা গেছে, অভিযোগ প্রমাণ হলে বিধি মোতাবেক বরখাস্ত হতে পারেন ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ। এ ছাড়া সরকারের পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপও নেওয়া হতে পারে। বার কাউন্সিল বাতিল করতে পারে তার পেশাদারি সনদ।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সরকারের পক্ষে মামলা পরিচালনার জন্য প্রসিকিউটর হিসেবে ২০১৩ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ব্যারিস্টার ড. তুরিন আফরোজকে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরে জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী এবং বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীসহ শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে মামলা পরিচালনা করে বেশ সুনাম কুড়ান এই সাহসী আইনজীবী।

একটি সূত্র জানায়, অভিযোগ ওঠায় তুরিন আফরোজকে প্রথমে রংপুরের ওয়াহিদুল হকের মামলা থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর। এরপর তার বিরুদ্ধে প্রাপ্ত অভিযোগ পর্যালোচনা করে মঙ্গলবার সব মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তার কাছে থাকা সব নথিপত্র প্রসিকিউশনে জমা দেওয়ার লিখিত নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্ত সংস্থা থেকে প্রাপ্ত অভিযোগ বুধবার সকালে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। কারণ তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ার মন্ত্রণালয়ের।

একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) এবং পাসপোর্ট অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক (ডিজি) মুহাম্মদ ওয়াহিদুল হককে গত ২৪ এপ্রিল গ্রেপ্তার করা হয়। পরদিন ট্রাইব্যুনাল তাকে কারাগারে পাঠান।
ওয়াহিদুল হকের বিরুদ্ধে করা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মতিউর রহমান।

জানা গেছে, গত ১১ নভেম্বর ওয়াহিদুল হকের বিরুদ্ধে করা মামলাটি পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয় প্রসিকিউটর তুরিন আফরোজকে। এর এক সপ্তাহ পর তিনি মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে ওয়াহিদুল হকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চান। তাকে যে কোনো দিন আটক করা হতে পারে বলেও কথোপকথনকালে জানান তুরিন। প্রথমে নির্ধারণ হয় ১৯ নভেম্বর সন্ধ্যায় মুহাম্মদ ওয়াহিদুল হকের গুলশানের বাসায় তাদের সাক্ষাৎ হবে। এ সময় ড. তুরিন আফরোজ জানান, সহকারী ফারাবী বিন জহির অনিন্দকে নিয়ে স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে বোরকা পরে তারা দুজন ওয়াহিদুল হকের বাসায় যাবেন।

তবে পরবর্তী সময়ে সাক্ষাতের স্থান পরিবর্তন হয়। তারা গুলশানে অলিভ গার্ডেন নামের একটি রেস্টুরেন্টে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় তারা প্রায় তিন ঘণ্টা মামলার নথিপত্র নিয়ে আলোচনা করেন। তুরিন আফরোজের সহকারী ফারাবী তখন মুহাম্মদ ওয়াহিদুল হককে বলেন- আপনি যে পদে ছিলেন, তাতে তো ২০-২৫ কোটি টাকা এমনিতেই ক্যাশ থাকার কথা। এ সময় ওয়াহিদুল হকের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ এবং তাকে গ্রেপ্তারের আদেশের অনুলিপি নিয়েও আলোচনা হয় বলে জানা গেছে।

বিষয়টি সামনে এলেই ফেঁসে যান ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ। তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে ট্রাইব্যুনালের সব ধরনের মামলা থেকে। তবে তুরিন আফরোজ বলেন, ‘অব্যাহতি দেওয়ার কোনো চিঠি আমি এখনও পাইনি। এ ছাড়া প্রসিকিউশন টিমে যোগদানের পর থেকে আমি যা কিছু করেছি, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশেই।’ তার এই বক্তব্যে তিনি কী বুঝাতে চাইছেন? তাহলে কী ওপরের নির্দেশেই তিনি ওয়াহিদুল হকের সঙ্গে গোপন বৈঠক করেছেন?

তদন্ত সংস্থা জানায়, ওয়াহিদুল হক মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদস্য ছিলেন। ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বরে দেশে ফিরে দুই বছর পর পুলিশে যোগ দেন। নব্বইয়ের দশকে তিনি জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার দায়িত্ব পান। এর পর গত শতকের শেষ দিকে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হন। একাত্তরের ২৮ মার্চ রংপুর ক্যান্টনমেন্টে পাঁচ থেকে ছয়শ নিরস্ত্র বাঙালি ও সাঁওতালের ওপর মেশিনগান দিয়ে গুলি চালিয়ে হত্যা ছাড়াও মানবতাবিরোধী নানা অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন ওয়াহিদুল হক। এসব তথ্যের ভিত্তিতেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here