একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার আসামি মুহাম্মদ ওয়াহিদুল হকের সঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজের বৈঠক নিয়ে চলছে তোলপাড়। আর সেই বৈঠকে চলা পৌনে তিন ঘণ্টার কথোপকথনের অডিও রেকর্ড বুধবার আইন মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছেন প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ সীমন, মোখলেছুর রহমান বাদল ও সাহিদুর রহমান। সেই সঙ্গে তুরিনের বিষয়ে তদন্ত সংস্থার যাবতীয় প্রতিবেদনও জমা দেওয়া হয়েছে।

সম্প্রতি অভিযোগ উঠে, যুদ্ধাপরাধ মামলার আসামি জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক (ডিজি) ওয়াহিদুল হকের সঙ্গে গোপনে বৈঠক করেন তুরিন। ওই আসামির কাছে মামলার স্পর্শকাতর কিছু তথ্য সরবরাহ করেছেন বলেও জানা যায়। আর সে কারণেই ট্রাইব্যুনালের সব ধরনের মামলা থেকে তাকে অব্যাহতি দিয়েছে প্রসিকিউশন। যদিও তুরিন আফরোজ বলছেন- যা কিছু করেছি, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশেই।

জানা গেছে, গত ১১ নভেম্বর ওয়াহিদুল হকের বিরুদ্ধে করা মামলাটি পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয় প্রসিকিউটর তুরিন আফরোজকে। এর এক সপ্তাহ পর তিনি মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে ওয়াহিদুল হকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চান। তাকে যে কোনো দিন আটক করা হতে পারে বলেও কথোপকথনকালে জানান তুরিন। এরপর ১৮ নভেম্বর দ্বিতীয়বার কথা বলেন। ওইদিন প্রথমে নির্ধারণ হয় ১৯ নভেম্বর সন্ধ্যায় মুহাম্মদ ওয়াহিদুল হকের গুলশানের বাসায় তাদের সাক্ষাৎ হবে। এ সময় ড. তুরিন আফরোজ জানান, সহকারী ফারাবী বিন জহির অনিন্দকে নিয়ে স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে বোরকা পরে তারা দুজন ওয়াহিদুল হকের বাসায় যাবেন।

তবে পরবর্তী সময়ে সাক্ষাতের স্থান পরিবর্তন হয়। তারা গুলশানে অলিভ গার্ডেন নামের একটি রেস্টুরেন্টে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় তারা প্রায় তিন ঘণ্টা মামলার নথিপত্র নিয়ে আলোচনা করেন। তুরিন আফরোজের সহকারী ফারাবী তখন মুহাম্মদ ওয়াহিদুল হককে বলেন- আপনি যে পদে ছিলেন, তাতে তো ২০-২৫ কোটি টাকা এমনিতেই ক্যাশ থাকার কথা। এ সময় ওয়াহিদুল হকের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ এবং তাকে গ্রেপ্তারের আদেশের অনুলিপি নিয়েও আলোচনা হয় বলে জানা গেছে। বিষয়টি সামনে এলেই ফেঁসে যান ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ।

বৈঠকের পুরো অডিও রেকর্ড তদন্ত সংস্থার মাধ্যমে প্রসিকিউশন অফিসে এলে তুরিন আফরোজকে ৭ মে আসামি ওয়াহিদুল হকের মামলার দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহারের আদেশ দেন চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু। পরদিন ট্রাইব্যুনালের সব মামলার কার্যক্রম থেকে প্রত্যাহারের আদেশ দেওয়া হয়।

প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ সীমন বলেন, তদন্ত সংস্থা থেকে তুরিন আফরোজ সম্পর্কে আমাদের কাছে অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছিল। পৌনে তিন ঘণ্টার অডিও রেকর্ড ও তদন্ত সংস্থা থেকে পাওয়া অন্যান্য প্রতিবেদন আইন মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। এখন মন্ত্রণালয়ই বিধি মোতাবেক তুরিনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে।

এ বিষয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, তুরিন আফরোজের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আইনে যেটা বলা আছে সেটাই হবে।

ট্রাইব্যুনাল সূত্রে জানা গেছে, অভিযোগ প্রমাণ হলে বিধি মোতাবেক বরখাস্ত হতে পারেন ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ। এ ছাড়া সরকারের পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপও নেওয়া হতে পারে। বার কাউন্সিল বাতিল করতে পারে তার পেশাদারি সনদ।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সরকারের পক্ষে মামলা পরিচালনার জন্য প্রসিকিউটর হিসেবে ২০১৩ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ব্যারিস্টার ড. তুরিন আফরোজকে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরে জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী এবং বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীসহ শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে মামলা পরিচালনা করে বেশ সুনাম কুড়ান এই আইনজীবী।

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here