একাত্তরে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছিল বাংলাদেশ। মানচিত্রে স্বাধীন দেশ হিসেবে জায়গা করে নেওয়ার দিনটি এ দেশের গৌরবের ইতিহাস। মহাকাশে নিজস্ব উপগ্রহ উড়িয়ে আরেকটি গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস গড়ল বাঙালি।

শনিবার প্রথম প্রহরে, ২টা ১৪ মিনিটে সফল উৎক্ষেপণ হয়েছে দেশের প্রথম ভূস্থির উপগ্রহ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১-এর। ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হয়েছেন বাংলাদেশ ও বিশ্বের বহু মানুষ। যুক্তরাষ্ট্রের ফোরিডায় নাসার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে উড়ে যায় যোগাযোগ উপগ্রহটি। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নাম লিখিয়েছে ৫৭ দেশের এক অভিজাত কাবে যাদের নিজস্ব উপগ্রহ রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এর সফল উৎক্ষেপণের কিছুক্ষণ পরই টেলিভিশনে প্রচারিত এক সংক্ষিপ্ত ভাষণে সবাইকে শুভেচ্ছা জানান। বলেন, আমরা স্যাটেলাইট কাবের গর্বিত সদস্য হলাম। প্রবেশ করলাম নতুন যুগে।

মার্কিন বেসরকারি মহাকাশ পরিবহন সেবা প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স বাংলাদেশের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহটি উৎক্ষেপণ করে। উৎক্ষেপণের ৩৩ মিনিটের মাথায় বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ ভূস্থির পরিবহন কক্ষপথে পৌঁছে যায়। পৃথিবীকে দুই চক্কর দেওয়ার আপন কক্ষপথ ধরে কাক্সিক্ষত স্থানের দিকে এগিয়ে যাবে উপগ্রহটি। স্পেসএক্সের ফ্যালকন ৯ রকেটের সর্বাধুনিক সংস্করণ ব্লক ৫। পুনরায় ব্যবহার উপযোগী রকেট প্রযুক্তির প্রথম উৎক্ষেপণ ছিল এটি। ফলে এটি স্পেসএক্সের জন্যও বড় একটি মাইলফলক। ভবিষ্যতে এ প্রযুক্তির কারণে একই সঙ্গে কম সময়ে ও কম খরচে মহাকাশযান উৎক্ষেপণ করা সম্ভব হবে।

থেলিস অ্যালেনিয়া নামের ফ্রান্সের যে মহাকাশ সংস্থাটি বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ তৈরি করেছে, এর প্রোগ্রাম ম্যানেজার গিলস ওবাডিয়া মার্কিন গণমাধ্যম স্পেসফাইট নাউকে জানিয়েছেন, অভিযাত্রার ১১ দিনের মাথায় ভূপৃষ্ঠ থেকে ৩৫ হাজার ৮০০ কিলোমিটার ওপরের কক্ষপথে নির্ধারিত জায়গায় ‘আপেক্ষিক অর্থে স্থির’ হবে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১। এই নির্ধারিত জায়গাটি হলো ১১৯ দশমিক ১ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশ। কয়েক সপ্তাহ পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে বাংলাদেশের কাছে নিয়ন্ত্রণভার তুলে দেবে থেলিস অ্যালেনিয়া।

ওই উচ্চতায় একটা উপগ্রহের ঘোরার গতি অবিকল পৃথিবীর আহ্নিক গতির সমান হয়। অর্থাৎ প্রতি ২৪ ঘণ্টায় একবার পৃথিবীতে পাক খাবে উপগ্রহটি। এবং পৃথিবীর মতোই পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে ঘুরবে বলে উপগ্রহটিকে ভূপৃষ্ঠের নির্দিষ্ট স্থান থেকে স্থির বলে মনে হবে।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে উপগ্রহটির নাম রাখা হয়েছে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১। এর কার্যায়ু ১৫ বছর। এ উপগ্রহের মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইন্টারনেট ও টেলিযোগাযোগ সেবার সম্প্রসারণ সম্ভব হবে। দুর্যোগ পরিস্থিতি মোকাবিলা ও ব্যবস্থাপনায় নতুন মাত্রা যোগ হবে।

এর আগে শুক্রবার ভোররাতে উৎক্ষেপণের প্রথম প্রচেষ্টা ভেস্তে গিয়েছিল মাত্র ৬০ সেকেন্ড আগে। ‘এক মিনিটের আক্ষেপ’ নিয়ে বাংলাদেশিরা ঠিক ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে ফের টিভি ও ইন্টারনেট পর্দায় চোখ রাখেন। ঐতিহাসিক সেই ঘটনার সাক্ষী তারা হয়েছেনও।

বাংলাদেশের মহাকাশ জয়ের স্বপ্নদ্রষ্টার কথায়ও গতকাল এমন আশার বাণী উঠে এসেছে। বাংলাদেশের প্রথম বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু ১-এর উৎপেণ একেবারে শেষ মুহূর্তে পিছিয়ে যাওয়ায় মন খারাপ না করার পরামর্শ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ফোরিডার লঞ্চিং প্যাড থেকে স্যাটেলাইট উৎপেণের কাউন্টডাউন শেষ মিনিটে থেমে যাওয়ার পর নিজেরও যে মন খারাপ হয়েছিল, তা-ও জানিয়েছেন তিনি। গতকাল শুক্রবার বিকালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ছাত্রলীগের ২৯তম জাতীয় সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মন খারাপ আমারও হয়েছিল। মাত্র ৪৬ সেকেন্ডের জন্য আমাদের স্যাটেলাইট উঠতে পারল না।’ এরপর তিনি বলেন, ‘এ নিয়ে কারো দুশ্চিন্তার কিছু নেই। স্যাটেলাইট আমাদের অবশ্যই উৎপেণ হবে। কেউ যেন আবার মন খারাপ না করে। এটা খুবই স্বাভাবিক একটা ঘটনা।’

এর আগে উৎক্ষেপণস্থলে অবস্থানরত প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় গতকাল একই প্রসঙ্গে বলেন, উৎপেণের শেষ মুহূর্তগুলো সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। হিসাবে যদি একটুও এদিক-সেদিক পাওয়া যায়, তা হলে কম্পিউটার উৎপেণ থেকে বিরত থাকে। যেমন গতকাল নির্ধারিত সময়ের ঠিক ৪২ সেকেন্ড আগে নিয়ন্ত্রণকারী কম্পিউটার উৎপেণের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে।

তথ্য প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম গতকাল রাতে ফোরিডা থেকে টেলিফোনে বলেন, স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের সময় এমন ঘটনা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। প্রায় সময় এমনটি হয়ে থাকে। তিনি বলেন, স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের সময় আবহাওয়া এবং অনেক টেকনিক্যাল বিষয় জড়িত থাকে। আমরা জানতে পেরেছি বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের স্পেসএক্স তৈরি আছে। চিন্তিত হওয়ার মতো কিছু নেই। আশা করছি নির্ধারিত সময়ে মহাকাশ জয়ের মিশনে দেশের প্রথম স্যাটেলাইট সফলভাবে রওনা হবে। তার সেই কথা ফলেছে।

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here