ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ এলাকার একটি হিন্দু পরিবারের সদস্যরা ৯ দিন নিখোঁজ থাকার পর পুলিশ শনিবার বিকেলে উদ্ধার করলেও তারা আবার বাড়ি ছেড়ে আত্মীয়ের বাড়ি গিয়ে উঠেছেন। পুলিশ তথ্য গোপন করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

গত ৪ মে শুক্রবার কালীগঞ্জ উপজেলার জামাল ইউনিয়নের পারখালকুলা গ্রাম থেকে চার সদস্যের হিন্দু পরিবারটি নিখোঁজ হয় বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। পরিবারের প্রধান সুকুমার বিশ্বাস। অন্য সদস্যরা হলেন সুকুমার বিশ্বাসের স্ত্রী রেনু রানী, পুত্রবধূ রিপা রানী ও নাতি সনদ বিশ্বাস। তিন মাস আগে নিখোঁজ সুকুমারের একমাত্র ছেলে স্বপন কুমার ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। তারা হিন্দু রাজবংশী সম্প্রদায়ের।

ঘটনার পাঁচদিন পর ৯ মে বুধবার বিকেলে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন কমিটির কালীগঞ্জ উপজেলা শাখার পক্ষ থেকে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়ে এই নিখোঁজের সংবাদটি জানানো হয়। প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে নেতারা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, সুকুমার বিশ্বাসের পানের বরজসহ ৮ বিঘা সম্পত্তি নামমাত্র মূল্যে ক্রয় দেখিয়ে আত্মসাতের জন্য এলাকার চিহ্নিত ভূমিদস্যরা বিভিন্ন সময় তার ওপর মানসিক নির্যাতন চালিয়েছে।

তাদের এই নিখোঁজের পেছনে স্থানীয় এসব ভূমিদস্যুর যোগসূত্র থাকতে পারে। তারা নিখোঁজ পরিবারটিকে উদ্ধার করে নিরাপদে নিজ বাড়িতে শান্তিতে বসবাসের ব্যবস্থা করে দেওয়ার দাবি জানান। অন্যথায় সুকুমার বিশ্বাস ও তার পরিবারকে উদ্ধারে গণআন্দোলন গড়ে তোলার কথা বলেন।

ওইদিনই সাংবাদিক নয়ন খন্দকার সুকুমার বিশ্বাসের বাড়িতে গিয়ে তাদের ঘর তালাবদ্ধ দেখতে পান। তিনি জানান, স্থানীয়দের সঙ্গে আমি তখন কথা বলে জানতে পারি যে, প্রভাবশালীদের ভয়ে ওই পরিবারটি এলাকা ছেড়ে চলে গেছে। কারণ তাদের আট বিঘা জমি প্রভাবশালীরা নামমাত্র দামে লিখে দেয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করে আসছিলেন। তারা নানা ধরণের হুমকি দিয়ে আসছিলেন। চাপ এড়াতেই তারা সপরিবারে বাড়ি থেকে পালিয়ে যান।

এদিকে কালিগঞ্জ থানার ওসি মিজানুর রহমান জানান, ওই পরিবারটিকে শনিবার বিকেলে ঝিনাইদহ শহর থেকে উদ্ধার করে তাদের গ্রামের বাড়িতে দিয়ে আসা হয়েছে। তারা ঝিনাইদহ শহরে তাদের এক আত্মীয়ের বাড়িতে গিয়েছিলেন। কেন গিয়েছিল জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বেড়াতে গিয়েছিল। দাওয়াত খেতে গিয়েছিল।’

কিন্তু ওসির কথার সঙ্গে মিল পাওয়া যায়নি ওই এলাকার প্রশান্ত কুমার খা’র কথার। প্রশান্ত জানান, পুলিশ পরিবারটিকে শনিবার রাতে বাড়িতে নিয়ে আসলেও সকালে আবার চলে গেছেন। সুকুমার বিশ্বাস ও স্ত্রী রেনু রানী চিকিৎসার কথা বলে ঝিনাইদহ শহরে তার আত্মীয়ের বাড়িতে চলে গেছেন। আর তার পুত্রবধূ নিজের ছেলেকে নিয়ে বাপের বাড়ি চলে গেছেন।

তিনি জানান, অল্প সময়ের জন্য তারা বাড়িতে ছিলেন। এখন আবার বাড়িতে তালামারা। হয়তো আবার ফিরে আসবেন। তাদের অনেক জোত জমি আছে। ৪ মে রাতে দুইজন মুখোশধারী লোক সুকুমার বিশ্বাসকে ডেকে কাছেই নদীর তীরে নিয়ে যায়। সেখানে তাকে গলায় ধারালো অস্ত্র ধরে জমি লিখে দিতে বলে। তিনি তখন জানতে চান কাকে লিখে দেব। তখন ওই মুখোশধারীরা বলে, নাম পরে জানবি,লিখে দিবি কিনা বল। তিনি তখন লিখে দিতে রাজি হলে তাকে ছেড়ে দেয়। এরপর তিনি বাড়ি ফিরে ঘরে তালা মেরে পাঁচ মিনিটের জন্য পরিবারের সবাইকে নিয়ে বের হয়ে যান।

প্রশান্ত কুমার বলেন, ‘নয়দিন তিনি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে পালিয়ে বেড়িয়েছেন। প্রথমে তারা বদুরগাছায় আশ্রয় নেন, তারপর ঝিকরগাছা ও চৌগাছায় ছিলেন। সর্বশেষ ঝিনাইদহের আবারপুরে তাদের পাওয়া যায়। আরাবপুরে জীবন বাবু নামের তাদের এক আত্মীয়ের বাড়িতে তারা সর্বশেষ আশ্রয় নিয়েছিলেন।’

এদিকে ওই পরিবারটির সঙ্গে নানাভাবে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাদের কারো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। প্রশান্ত জানান, ‘তারা মোবাইল নাম্বার বন্ধ করে দিয়েছেন।’

এই তথ্য ধরে আবারো ওসি মিজানুরকে ফোন করলে তিনি বলেন, ‘ওই পরিবারে সদস্যদের হুমকি দেওয়া হয়েছে বা জমি দখলের চেষ্টা হয়েছে এমন কোনো প্রত্যক্ষদর্শী স্বাক্ষী পাইনি। আর পরিবাররি কেউ অভিযোগও করেনি। তারপরও এরকম কিছু ঘটেছে কিনা তা আমরা তদন্ত করে দেখছি।’

অভিযোগ রয়েছে হিন্দু পরিবারটি হুমকি এবং জমি দখলের পিছনে স্থানীয় একজন ইউপি চেয়ারম্যানের হাত আছে। এ নিয়ে স্থানীয় জামাল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. মোদাচ্ছের হোসেন দাবি করেন, তাদের জমি জমা তেমন নাই। চার-পাঁচ বিঘা থাকতে পারে। আর তারা বলেছে তাদের কেউ জোর করেনি বা হুমকি দেয়নি।

পরিবারটি কোথায় গিয়েছিল এবং এখন কোথায় আছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তারা বেড়াতে গিয়েছিল। উদ্ধার করার পর ওসি সাহেবকে বলে আবার আত্মীয়ের বাড়ি চলে গেছে তারা।

তবে ওই পরিবারটি আবারো যোগাযোগ বিচ্ছিন অবস্থায় আছে বলে স্থানীয় সাংবাদিকরা জানিয়েছেন। খবর ডয়চে ভেলের।

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here