প্রথমবারের মতো লীয় প্রতীকে হওয়া খুলনা সিটি করপোরেশন (খুসিক) নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন আওয়ামী লীগ প্রার্থী তালুকার আবদুল খালেক। এর মাধ্যমে এক মেয়াদ পরই পুনরুদ্ধার করছেন নগরপিতার সেই পরিচিত চেয়ারটি।

গত নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট সমর্থিত প্রার্থী মনিরুজ্জামান মনিরের কাছে হেরে গিয়ে খুইয়েছিলেন। এবার তিনি নৌকা প্রতীক নিয়ে হারিয়েছেন বিএনপি প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জুকে।

অবশ্য এ নির্বাচনকে ভোট ডাকাতির মহোৎসব বলে অবিহিত করেছেন পরাজিত মঞ্জু।

আর খালেক বলছেন, নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ করতেই এমন মিথ্যা-অপপ্রচার।

ইসির দাবি, সার্বিক বিচারে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ ভোট হয়েছে।

এদিকে অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ উঠলেও বড় ধরনের সহিংসতা ছাড়াই সম্পন্ন হয়েছে ভোটগ্রহণ। দিনব্যাপী ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে খুলনা নগরবাসী নির্বাচন করেছেন তাদের নগরপিতা। বেসরকারিভাবে পাওয়া ফলাফলে, ২৮৯ কেন্দ্রের মধ্যে ২৮৬টিতে নৌকা প্রতীক নিয়ে লড়াই করা খালেক পেয়েছেন ১ লাখ ৭৬ হাজার ৯০২ ভোট।

নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মঞ্জু ধানের শীষে পেয়েছেন ১ লাখ ৮ হাজার ৯৫৬ ভোট। এদিকে নৌকা সমর্থকরা জোর করে ব্যালটে সিল মারে- এমন অভিযোগে তিন কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ স্থগিত করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।

রিটার্নিং অফিসার ইউনুচ আলী বলেন, ‘সার্বিক বিচারে ভোট সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হয়েছে। জাল ভোট ও বিশৃঙ্খলার কারণে আমরা তিনটি কেন্দ্রের ভোট স্থগিত করেছি। এর বাইরে তেমন কিছুই হয়নি। তবে কিছু জায়গায় ভোটকেন্দ্রের বাইরে ঝামেলা হয়েছে। সেগুলো আমরা আইনশৃঙ্খলা রাকারী বাহিনীর মাধ্যমে সুরাহা করেছি।’

এবার খুলনা সিটি নির্বাচনে পাঁচ মেয়র প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। প্রচারের শুরু থেকেই তাদের বাগ্যুদ্ধে ভোটের মাঠ ছিল উত্তপ্ত। আর ভোট শেষে বিএনপি প্রার্থী মঞ্জু অভিযোগ করেন এ নির্বাচনে প্রায় দেড়শ কেন্দ্রে ভোট কারচুপি হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘দেড় শতাধিক কেন্দ্রে ভোট ডাকাতি হয়েছে, এজেন্টদের বের করে দেওয়া হয়। তাই আমরা দাবি করব, এসব কেন্দ্রের ফল বাতিল করে পুনরায় ভোটগ্রহণের।’

আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী তালুকদার খালেক অবশ্য বলেন, ‘নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ করতেই মিথ্যা অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। আর মঞ্জু সাহেব শুরু থেকে মিথ্যা কথা বলে আসছেন। ওনার কথা আমি গুরুত্ব দিই না। ন্যূনতম একটা শিষ্টাচার থাকা উচিত যে, আমি কী বলছি আর মাঠের কী অবস্থা।’

মঞ্জুর অভিযোগের সত্যতা মেলেনি
২৫ নম্বর ওয়ার্ডে বিএনপির কোনো এজেন্ট ঢুকতে দেয়া হয়নি বলে সকালে দাবি করেন দলটির মেয়রপ্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু। তবে ওই কেন্দ্রে সরেজমিন ঘুরে ও বিএনপির এজেন্টের সঙ্গে কথা বলে এ অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি। ওয়ার্ডটির লায়নস স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, পাঁচটি বুথের মধ্যে চারটিতেই বিএনপির এজেন্ট রয়েছেন। দুই এজেন্ট সিরাজুর ইসলাম এবং ওমর ফারুক বলেন, ভোটগ্রহণের শুরু থেকেই আমরা অবস্থান করছি। কোনো ধরনের হুমকি কিংবা এখন পর্যন্ত কোনো চাপ প্রয়োগ করা হয়নি।

এ কেন্দ্রের দায়িত্বরত ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা সনজিব কর্মকার বলেন, একটি বুথের এজেন্ট আসেনি। এ ক্ষেত্রে আমাদের কিছুই করার নেই। তবে যারা এসেছেন তাদের ওপর কোনো ধরনের চাপ নেই।

পাশের আরেকটি কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, ছয়টি বুথের মধ্যে পাঁচটিতেই বিএনপির এজেন্ট রয়েছে। এ কেন্দ্রের দায়িত্বরত ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা এমএম ইসমাইল হোসেন জানান, একটি বুথে বিএনপির কোনো এজেন্ট আসেননি। তবে এ কেন্দ্রে কোনো ধরনের ঝামেলা নেই। সুষ্ঠুভাবেই ভোটগ্রহণ চলে।

জাল ভোট, ৮৫ ব্যালট বাতিল
নৌকা প্রতীকের সমর্থকরা জাল ভোট দেয়ায় ২২ নম্বর ওয়ার্ডের একটি কেন্দ্রে ৮৫টি ব্যালট পেপার বাতিল করা হয়েছে। সকাল পৌনে ১০টার দিকে ফাতিমা উচ্চ বিদ্যালয়কেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটে। এ সময় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে হট্টগোল বাধলে কেন্দ্রের দুটি বুথের ভোটগ্রহণ ১৫ মিনিট বন্ধ করে দেয়া হয়। পরে আবার ভোট শুরু হয়। কেন্দ্রের দায়িত্বরত কর্মকর্তা জিয়াউল হক ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, ‘দুই বুথের ৮৫টি ব্যালট পেপার বাতিল করা হয়েছে।’

এ কেন্দ্রে মোট ভোটার ১ হাজার ৯০৬ জন। সেটি তালুকদার আব্দুল খালেকের বাড়ির সামনে অবস্থিত। এখানে বিএনপির কোনো পোলিং এজেন্ট দেখা যায়নি। দুপুর ১টার দিকে একটি বুথে কয়েকজন যুবককে প্রকাশ্যে সিল মেরে বাক্সে ব্যালট পেপার ঢুকাতে দেখা যায়। তবে কোনো তাড়াহুড়ো ও হট্টগোল ছিল না। আবার কোনো ভোটারকে ব্যালট পেপার নিয়ে গোপন কক্ষে যেতেও দেখা যায়নি। বাক্সের সামনেই সিল মেরে ঢুকান। জানতে চাইলে এক কর্মী বলেন, ‘কনফিডেন্ট আছে, তাই প্রকাশ্যেই সিল মারছে।’

তিন কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ স্থগিত
জালভোটের অভিযোগে ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের ইকবাল নগর মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় (২০২ নম্বর ভোটকেন্দ্র), ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের লবণচরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (নিচতলা-২৭৭ নম্বর ভোটকেন্দ্র) এবং ওয়ার্ড কাউন্সিলর কার্যালয় ২৭৮ নম্বর কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের একটি কেন্দ্রে ২ হাজার ১২৪ এবং ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের দুটি কেন্দ্রে ভোটার সংখ্যা ৩ হাজার ৭০৭।

ইকবালনগর স্কুলকেন্দ্রের সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার নুরুল ইসলাম জানান, এ কেন্দ্রে সাতটি বুথ ছিল। বেলা ১১টার দিকে স্কুলের একাডেমিক ভবন ২-এর ৭ নম্বর বুথে ১৫ থেকে ২০ জনের একটি ল আসে। তারা ব্যালট বই ছিনিয়ে নিয়ে সিল মেরে বাক্সে ঢুকিয়ে দেয়। এরপর তিনি বিষয়টি কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসারকে জানান। তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর তাৎক্ষণিকভাবে ভোটগ্রহণ বাতিল করে দেন।

লবণচোরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কেন্দ্রে দুপুর ১২টার দিকে একদল যুবক ঢুকে জোর করে ব্যালট পেপারে সিল মেরে বাক্সে ভরা শুরু করে। প্রিসাইডিং অফিসার সাময়িকভাবে ওই কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ বন্ধ করে দেন। খবর পেয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সেখানে পৌঁছলে ওই যুবকরা পালিয়ে যায়। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ওই কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, অনেক ব্যালটে নৌকা প্রতীকে সিল মারা, মুড়ি বই বাঁকাতেড়াভাবে ছেঁড়া। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী চলে আসায় সিল মারা অনেক ব্যালট বাক্সে ভরতে পারেনি। কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার রোকনুজ্জামান বলেন, ‘কিছু যুবক এসে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করে। তখন আমি ওপরে (দোতলায়) ছিলাম, জানতে পারিনি।’
সিল মারা ব্যালট পেপারের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, ‘এসব ব্যালট পেপার বাতিল করা হবে।’ ওই কেন্দ্রে মোট ভোটসংখ্যা ২ হাজার ১৬। দুপুর ১২টা পর্যন্ত এক হাজারের মতো ভোটার তারে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন বলে জানান প্রিসাইডিং অফিসার। তবে ভোটকেন্দ্রের বাইরে থাকা আওয়ামী লীগ প্রার্থীর কিছু কর্মী সাংবাদিকদের জানান, এ কেন্দ্রে কোনো ঝামেলা হয়নি, সকাল থেকে শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ হয়েছে।

খুলনার রিটার্নিং অফিসার মো. ইউনুচ আলী জানান, অনিয়মের অভিযোগে প্রিসাইডিং অফিসারের পরামর্শে তিনটি কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়।

কেন্দ্র দখল ঠেকাতে ফাঁকা গুলি
নগরীর ৭ নম্বর ওয়ার্ডে ক্ষমতামীন লের কর্মী-সমর্থকরা উত্তর কাশিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র দখলে নিতে গেলে পুলিশ ১৩ রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়ে। এতে কেউ হতাহত হয়নি। এ ছাড়া নগরীর ১০ নম্বর ওয়ার্ডের মাওলানা ভাসানী বিদ্যাপীঠ কেন্দ্রে সরকার দলীয় কর্মী-সমর্থকরে সঙ্গে পুলিশের হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এ সময় পুলিশের একটি অস্ত্রের বাঁট (হাতল) ভেঙে যায়। ওই ঘটনায় দুজনকে আটক করা হয়েছে।

লাইনে ভোটার, নেই ব্যালট পেপার
দুপুর ১২টা। রূপসা বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দেয়ার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন অনেক ভোটার। কিন্তু তারে জানানো হয়, ব্যালট পেপার শেষ, অপেক্ষা করতে হবে, ব্যালট পেপার এলে আবার ভোট নেওয়া শুরু হবে।

এ বিষয়ে কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা কয়েকজন জানান, সকাল ১১টার দিকে একল যুবক ওই কেন্দ্রে ঢুকে সব ব্যালট কেড়ে নিয়ে সিল মেরে বাক্সে ভরেছে। এরপর যারা ভোট দিতে গেছেন, তারা ব্যালট পাননি। কেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তা মো. ইবনুর রহমান বলেন, ‘কিছু যুবক এসে জাল ভোট দেয়ার চেষ্টা করলে ভোটগ্রহণ সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়। পরে আবারও ভোটগ্রহণ শুরু হয়।’

কম ভোটার ও বিএনপির এজেন্টশূন্য কেন্দ্র
খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ২২ নম্বর ওয়ার্ডে ১৭৯ নম্বর খুলনা জেলা স্কুলকেন্দ্রে দুপুরে ভোটার এবং বিএনপির কোনো এজেন্ট পাওয়া যায়নি। বেলা পৌনে ১টার দিকে সরেজমিন গিয়ে খো যায়, কেন্দ্রে আটটি বুথের কোনোটির সামনেই ভোটার নেই। কিছুণ পরপর দু-একজন ভোটার আসতে দেখা যায়।

নাসিমা আক্তার নামে এক ভোটার অভিযোগ করেন, তার ভোটটি নাকি আগেই দেয়া হয়ে গেছে। এ সময় নৌকার ব্যাজ পরা কয়েকজন যুবককে দুটি বুথের মধ্যে অবস্থান করতেও দেখা যায়। গণমাধ্যমকর্মীদের দেখে অবশ্য তারা বেরিয়ে যান। বাকি বুথে কোনো ভোটার দেখা যায়নি।

কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার আতিয়ার রহমান জানান, আট বুথের মধ্যে ৬ নম্বরটিতে সকাল ৯টা ৫০ মিনিটের দিকে বিএনপির একজন এজেন্ট দিলেও এক ঘণ্টা থেকেই তিনি চলে যান। দুপুর পৌনে ১টার দিকে ৩০ শতাংশ ভোট পড়ে বলে জানান তিনি। ভোটার উপস্থিতি কম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ভোটাররা না এলে কী করার আছে?’

খুলনা জেলা স্কুলের অপর প্রান্তে রয়েছে ১৮০ নম্বর কেন্দ্র। সেখানেও একই চিত্র দেখা যায়। বাইরে নৌকা সমর্থকদের উপস্থিতি থাকলেও ভোটকেন্দ্র ছিল ফাঁকা।

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here