আগ্রাসী ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অনেকদিন থেকেই স্বাধীকারের লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে ফিলিস্তিনিরা। এই লড়াই চালাতে গিয়ে কত শত তরুণকে যে প্রাণ খোয়াতে হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। কিন্তু তবুও ইসরায়েলের রক্তপিপাসা থামেনি। রোববারও জেরুজালেমে মার্কিন দূতাবাস স্থানান্তরের বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখর ফিলিস্তিনিদের ওপর গুলি চালিয়ে ৬০ জনেরও বেশি মুক্তিপাগল মানুষকে হত্যা করেছে ইসরায়েলি সেনারা। এই শহীদ ব্যক্তিদের মধ্যেই অন্যতম ২৯ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি তরুণ ফাদি আবু সালাহ।

ইসরায়েলি সৈন্যদের উন্নত অস্ত্রের বিরুদ্ধে শুধুমাত্র গুলতি হাতে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন দুই পা বিহীন এই অকুতভয় বীর। হুইল চেয়ারে বসেই গুলতি দিয়ে লড়তে লড়তে শহীদ হয়েছেন তিনি।

এর আগে গত বছরের ডিসেম্বরে জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে অস্বীকৃতি জানিয়ে বিক্ষোভে ইব্রাহিম আবু সুরিয়া (২৯) নামের আরেক পঙ্গু ফিলিস্তিনি তরুণ গাজা উপত্যকায় নিহত হয়েছিলেন। তার নিহতের সংবাদ সে সময় আন্তর্জাতিকভাবে তুমুল আলোচিত হয়।

ইসরায়েলি সেনাদের উন্নত অস্ত্রের বিরুদ্ধে গুলতি হাতে রুখে দাঁড়ান ফাদি আবু সালাহ

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম জানায়, তরুণ আবু সালাহ কিশোরকাল থেকেই ইসরাইলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। ইসরায়েলি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে এক সময় জেলেও গিয়েছিলেন তিনি। পরবর্তীতে মুক্ত হয়ে মাতৃভূমিকে ইহুদি শক্তির হাত থেকে উদ্ধার করতে আবারও নেমে পড়েন। তবে এবার ইসরাইলি সেনাদের গুলিতে পা হারিয়ে পঙ্গুত্বকেই বরণ করে নিতে হয় তাকে। তবুও আবু সালাহর মুক্তি স্পৃহা থামেনি। রোববার জীবনের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে দেশের জন্য লড়ে গেছেন সংগ্রামী এ তরুণ।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, ইসরায়েলি দখলকৃত পশ্চিম তীরের জেনিন শহরের কাছেই আরাবাহ নামক গ্রামের বাসিন্দা আবু সালাহ সবসময়ই ছিলেন সেখানকার তরুণদের মধ্যে আদর্শ। তিনি ফিলিস্তিনি তরুণদের প্রতি সবসময় আহবান করতেন, প্রতিমুহূর্তে আমাদের প্রতিরোধ জারি রাখতে হবে।

অল্প বয়সেই বিয়ে করা এ তরুণ একটা সময়ে ইসরায়েলি কারাগারে বন্দি ছিলেন বেশ কয়েক বছর। পরবর্তীতে এক মার্কিন সমঝোতায় ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের প্রচেষ্টায় ইসরাইলি কারাগার থেকে মুক্তি পান আবু সালাহ। তার সাথে আরও ৮৯ জন ফিলিস্তিনি বেরিয়ে আসে দখলদারদের কারাগার থেকে।

শহীদ সালাহর লাশ

২০০৮ সালে গাজায় তিন সপ্তাহ ব্যাপী ইসরাইলি সেনা ও হামাসের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক যুদ্ধে প্রাণ হারায় বিপুল সংখ্যক ফিলিস্তিনি। পরবর্তীতে ছয় মাস ধরে চলা এক ইসরাইলে আগ্রাসানে এক হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি শহীদ হন। সে সময় ইসরাইলি সেনাদের গুলিতে পা হারান ফাদি আবু সালেহ। ডিসেম্বরে নিহত ইব্রাহিম আবু সুরিয়াও সে সময় পা হারিয়েছিলেন।

সুরিয়ার মতোই ইসরাইলি সেনার গুলির জবাবে গুলতি নিয়ে তার পাথর নিক্ষেপের ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে আবু সালাহর এ লড়াইয়ের কাহিনী। পরবর্তীতে নিহতের ছবিও আলোচনায় ওঠে আসে একইভাবে।

স্ত্রী-সন্তান নিয়ে সুখের সংসার ছিল সালাহরও

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদে দেখা যাচ্ছে, এ বছরেরও কয়েকমাস ধরে চলমান বিক্ষোভে স্ত্রী-সন্তান ও পরিবার নিয়ে অংশগ্রহণ করেন তিনি। পশ্চিম তীর থেকে এসে গাজাতেই আশ্রয় নেন তাঁবু গেড়ে। চার শিশু সন্তানকে নিয়ে সেখানেই অস্থায়ীভাবে সংসার গাড়েন তিনি।

ইসরাইলে মার্কিন দূতাবাস তেল আবিব থেকে জেরুজালেমে স্থানান্তর ও ইসরাইলি আগ্রাসনে ফিলিস্তিনি উচ্ছেদের নাকবা দিবস উপলক্ষে গত এক সপ্তাহ ধরে গাজায় জড়ো হতে থাকেন ফিলিস্তিনিরা।

১৯৪৮ সালের ১৫ মে ইহুদিবাদী ইসরাইল সাড় সাত লাখের বেশি ফিলিস্তিনিকে তাদের বাড়ি-ঘর থেকে উচ্ছেদ করে তা দখল করে নেয়। এদিনটি নাকবা দিবস হিসেবে গত ৭০ বছর ধরে পালন করে আসছে ফিলিস্তিনিরা।

গতকাল জড়ো হওয়া প্রায় ৫০ হাজার ফিলিস্তিনিদের বিক্ষোভে সকাল থেকেই হুইল চেয়ারে করে নেমে পড়েন সালাহ। একটা পর্যায়ে শান্তিপূর্ণ এ বিক্ষোভে ইসরাইলি সেনারা নির্বিচারে গুলি চালালে তিনিও প্রতিরোধ করা শুরু করেন। দুপুরের পরেই ইসরাইলি সেনাদের গুলিতে নিহত হন এ লড়াকু ফিলিস্তিনি।

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here