বাংলাদেশে ঘোষণা দিয়ে মাদকের বিরুদ্ধে অভিযানে নেমেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এই অভিযানের অগ্রভাগে রয়েছে ব়্যাব। তবে পুলিশও কম যাচ্ছে না। অভিযানে এরইমধ্যে গত ৫ দিনে ‘বন্দুকযযুদ্ধে’ মারা গেছে অন্তত ১২ জন মানুষ। গতকাল রাতেও পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ময়মনসিংহ, বরিশাল ও ফেনিতে মারা গেছে তিন জন। পুলিশের দাবি, ফেনী ও ময়মনসিংহে নিহত দুজন মাদক ব্যবসায়ী, আর বরিশালে নিহত ব্যক্তি ডাকাত।

র‌্যাব বা পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ‘ক্রসফায়ারে’ নিহত প্রত্যেকেই মাদক ব্যবসায়ী। মাদক বহনের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে তারা মারা গেছেন। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এই কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধ’ বা ‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। মানবাধিকার কর্মীরা বিভিন্ন ‘ক্রসফায়ারের’ নিরপেক্ষ তদন্ত করতে বলছেন বহুদিন ধরে। তাদের ভাষ্য, যথাযথ আইনের মাধ্যমেই অপরাধীদের বিচার হতে হবে।

মানবাধিকার কর্মী, পুলিশের সাবেক প্রধানসহ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ক্রসফায়ারের মাধ্যমে মাদক সমস্যার সমাধান মিলবে না। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর যথাযথ অভিযান এবং আইনের সঠিক প্রয়োগ ও জনগণকে সচেতন করে সমস্যা কমিয়ে আনা সম্ভব।

পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক নুরুল হুদা বলেন, ‘বন্দুকযুদ্ধ কোনো সমাধান হতে পারে না। এটা একটা পথ, যেটা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদী সমাধান সম্ভব নয়। মাদক ব্যবসা যারা করে, তারা তো ভয়ঙ্কর লোক। সে ক্ষেত্রে অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে যদি গোলাগুলিতে কেউ মারা যায়, সেটা ঠিক আছে। কারা ব্যবসা করছে, কারা এদের মদদ দিচ্ছে, এর মূল খুঁজে বের করতে হবে। তাদের আইনের আওতায় এনে বিচারের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণের পথ খুঁজতে হবে।’

গতকালকে ঘটনাগুলোর মধ্যে ফেনীর ছাগলনাইয়ায় মারা যাওয়া ব্যক্তির নাম আলমগীর হোসেন। তার বাড়ি উপজেলার পাঠাননগর ইউনিয়নের পশ্চিম পাঠানগড় গ্রামে। ছাগলনাইয়া থানার পুলিশ জানায়, গতকাল রাতে পুলিশ উপজেলার পশ্চিম পাঠানগড় গ্রামে একটি মাদকের আস্তানায় অভিযান চালায়। এ সময় পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে মাদক ব্যবসায়ীরা পুলিশকে লক্ষ্যে করে গুলি ছোড়ে। আত্মরক্ষার্থে পুলিশও পাল্টা গুলি ছোড়ে। একপর্যায়ে মাদক ব্যবসায়ীরা পালিয়ে যায়। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে আলমগীর হোসেনকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় উদ্ধার করে। আহত আলমগীর হোসেনকে চিকিৎসার জন্য ফেনী সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। তিনি মাদক ব্যবসায়ী ছিলেন। ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ একটি বন্দুক, ৩৭টি গুলি, ১০০ বোতল ফেনসিডিল এবং ১০০০ পিস ইয়াবাবড়ি উদ্ধার করেছে।

ময়মনসিংহে নিহত ব্যক্তির নাম বিপ্লব। ডিবি পুলিশের দাবি, বিপ্লব শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী ছিলেন। তার বাড়ি ময়মনসিংহ শহরের চরপাড়া এলাকায়। চরপাড়া এলাকায় মাদকের একটি চালান বিভিন্ন এলাকায় বিক্রির জন্য ভাগাভাগি করা হচ্ছে—এমন গোপন সংবাদের ভিত্তিতে রাত সোয়া দুইটার দিকে ডিবি পুলিশ সেখানে হানা দেয়। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে নিহত বিপ্লব ও তার সহযোগীরা পুলিশকে লক্ষ করে গুলি ছুড়তে শুরু করে। পুলিশ পাল্টা গুলি করলে বিপ্লব গুলিবিদ্ধ হন। পরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক বিপ্লবকে মৃত ঘোষণা করেন। ডিবির ওসি আশিকুর রহমান বলেন, বিপ্লবের নামে কমপক্ষে ১০টি মামলা রয়েছে। বন্দুকযুদ্ধে পর নিহত বিপ্লবের দেহ তল্লাশি করে ২০০ গ্রাম হেরোইন ও ২০০টি ইয়াবা বড়ি পাওয়া গেছে।

তবে বরিশালে নিহত ব্যক্তির নাম জানা যায়নি। পুলিশের দাবি, নিহত ওই যুবক সংঘবদ্ধ ডাকাত দলের সদস্য ছিলেন। গতকাল রাত তিনটার দিকে সদর উপজেলার শায়েস্তাবাদ ইউনিয়নের দক্ষিণ চর আইচা গ্রামের বটতলাবাজার এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। ঘটনাস্থল থেকে একটি পাইপগান, একটি রামদা, একটি চাপাতি ও ৮টি গু‌লির খা‌লি খোসা উদ্ধার করা হয়েছে।

গত কয়েকদিন ধরে একের পর এক ‘ক্রসফায়ারের’ ঘটনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল রাজধানীতে পূজা উদযাপন পরিষদের সম্মেলনে শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, সরকার মাদকের বিষয়ে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অবলম্বন করেছে। তারপরও এসব ঘটনার তদন্ত করা হবে বলে প্রতিশ্রতি দেন তিনি।

ব়্যাবের ১৪ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে গত ৩ মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে ব়্যাব কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন। এরপর থেকেই ব়্যাব মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান শুরু করে। ১৮ মে পর্যন্ত দেড় হাজার মাদকসেবীকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তবে মূল অভিযান শুরু হয়েছে গত মঙ্গলবার থেকে।

পুলিশ সদরের এক হিসেবে দেখা গেছে, গত কয়েক বছরে দেশে মাদক সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা বেড়েছে। ২০১৭ সালে মাদক মামলা হয়েছে ৯৮ হাজার ৯৮৪টি। ২০১৬ সালে ১৮ হাজার ২৮৭টি, ২০১৫ সালে ৪৬ হাজার ৫১২টি, ২০১৪ সালে ৪২ হাজার ১৯০টি, ২০১৩ সালে ২৯ হাজার ৩৪টি। পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে প্রতি বছরই মামলা বাড়ছে।

‘ক্রসফায়ারে’ কি মাদক সমস্যার সমাধান সম্ভব? এমন প্রশ্নের জবাবে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক নির্বাহী পরিচালক নূর খান লিটন বলেন, ‘এভাবে সমাধান মিলবে না। সরকার বা আইন শৃঙ্খলা বাহিনী সব সময়ই শর্ট-কার্ট পদ্ধতিতে সমাধান চায়। যেটা সম্ভব নয়। বরং একটা অপরাধ নির্মূল করতে গিয়ে আরেকটা অপরাধের জন্ম দিচ্ছে। ফলে মূল সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। আমি মনে করি, আইনের সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমেই এর সমাধান সম্ভব। উৎসগুলো খুঁজে বের করে সমাধান করতে হবে।’ খবর ডয়চে ভেলের।

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here