দুজনেই ক্ষুধার্ত। একজনের খাবার পড়ে সামনে, আর একজন শেষ প্রাণবিন্দু দিয়ে চেষ্টা করছে খাবারের কাছে পৌঁছতে। কিন্তু পারছে না। প্রথমজন অপেক্ষা করছে কখন সেই চেষ্টা থেমে যাবে, তাহলে সে নিজের খাবার পাবে। প্রথম জন একটি শকুন, দ্বিতীয়জন অনাহারী শিশু।

এই ছবিটি বিশ্বে মাইলফলক সৃষ্টি করা ছবিগুলোর মধ্যে একটি। দুর্ভিক্ষের কারণ বা ফলাফল বা সাহায্য সংগ্রহ‚ এই ছবির মতো বাঙ্ময় বার্তা কমই আছে। ছবিটি তো দেখেছেন। জানেন কি এর নেপথ্যকাহিনী কী ? যিনি তুলেছিলেন ছবিটি তার পরিণতি কী হয়েছিল ?

ছবিটি প্রথম প্রকাশ পেয়েছিল ১৯৯৩ সালের ২৬ মার্চ নিউইয়র্ক টাইমসে। যা তুলেছিলেন কেভিন কার্টার। ৩২ বছর বয়সী কেভিন ছিলেন ফ্রিল্যান্সার। কেরিয়ারে বড় পদক্ষেপের জন্য ঠিক করলেন যুদ্ধ‚ দুর্ভিক্ষের মতো হার্ড হিটিং টপিকের ছবি তুলবেন। তারপর তা বিক্রি করবেন বিভিন্ন এজেন্সিতে ।

সে সময় আফ্রিকার সুদানের বিস্তীর্ণ অংশ গৃহযুদ্ধ ও দুর্ভিক্ষপীড়িত। দেশে ফোটোগ্রাফারদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে তৎকলীন সুদান সরকার। কিছুদিন পর সেই আগল খুলতে বাধ্য হল সুদান। জাতিসংঘ থেকে সাহায্যের পাশাপাশি এলেন চিত্রগ্রাহকও। বহু কাঠখড় পুড়িয়ে‚ টাকা জোগাড় করে সুদান পৌঁছলেন কেভিন কার্টার। জাতিসংঘের তৎকালীন ইনফরমেশন অফিসার রবার্ট হেডলি বিশেষ ভূমিকা নিয়েছিলেন যাতে কেভিন সুদান যেতে পারেন।

সুদানে কেভিনের তোলা আরেকটি বিখ্যাত ছবি

সুদানের দুর্ভিক্ষপীড়িত অঞ্চলে গিয়ে শোকে স্তব্ধ হয়ে গেলেন কেভিন। কার ছবি তুলবেন তিনি ! চারদিকে অনাহার আর মৃত্যু। তবু পেশাদার হাত চলে গেল শাটারে। পাখির চোখ আবদ্ধ লেন্সে। সুদানি শহর আয়োদের প্রাণকেন্দ্র থেকে বেশ কিছুটা দূরে একদিন সাবজেক্টের খোঁজে চষছে কেভিনের চোখ। এক জায়গায় থেমে গেল দৃষ্টি।

শুকনো মাঠে উপুড় হয়ে পড়ে কঙ্কালসার শিশু। উলঙ্গ দেহে বড় প্রকট গলায় পুঁতির মালা। মৃতপ্রায় শিশু চেষ্টা করছে হামাগুড়ি দিয়ে এগোতে। এমন বিষয় পেয়ে মোক্ষম ছবির জন্য তৈরি কেভিন। কী মনে করে‚ ভাবলেন ক্যামেরার অ্যাঙ্গল পাল্টাবেন।

শুধু অ্যাঙ্গল নয়, বদলে গেল দৃষ্টিকোণই। লেন্সের মধ্যে কেভিনের চোখ দেখছে শিশুর অদূরে ওঁৎ পেতে আছে শকুন। এক দৃষ্টে তাকিয়ে শিশুর দিকে। কখন সে জীব থেকে জড়ে পরিণত হবে। নিজের আহার পাবে সেই মৃতজীবী পাখি।

বাকিটা ইতিহাস। নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত হওয়ার পরে ছবিটা আলোচিত হয় বিশ্বের তাবড় সংবাদমাধ্যমে। সোশ্যাল মিডিয়া পূর্ব যুগে ওই ছবি যা শোরগোল ফেলেছিল তাকে আজকের ভাইরাল মাপকাঠি দিয়ে মাপা অসম্ভব। ১৯৯৪ সালে ফিচার ফোটোগ্রাফি বিভাগে পুলিৎজার পুরস্কার পান কেভিন।

এই সেই কেভিন কার্টার

কিন্তু পুরস্কারের সঙ্গেই ঘনিয়ে এল সুখের বদলে অসুখ। তীব্র সমালোচিত হলেন কেভিন। কেন তিনি ওই শিশুকে নিয়ে যাননি জাতিসংঘের ক্যাম্পে ? কারণ শোনা গিয়েছিল শিশুটি ফুড ক্যাম্পে যাওয়ার চেষ্টা করছিল।

সাফাই হিসেবে কেভিন বলেছিলেন, তিনি ছবি তোলার পরে শকুনটাকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু এটা অস্বীকার করেননি যে শিশু ও শকুনকে অজস্রবার লেন্সবন্দি করে তিনি ছুটেছিলেন অন্যত্র‚ অন্য ছবি তুলতে।

কেভিনের আরও ছবি অমর হয়ে আছে বিশ্ব দরবারে। যতদিন সাংবাদিকতা থাকবে ততদিন কেভিনের ছবি থাকবে নিজের জায়গায়। কিন্তু কেভিন নিজে থাকতে পারেননি । অহরহ‚ রাতে ঘুমের মধ্যে তাকে তাড়া করত ওই শিশু এবং অন্যরা। মনে পড়ত নিজের ছোট্ট মেয়ে মেগানের কথা। মানুষের কষ্টকে মূলধন করে তিনি বিখ্যাত হয়েছেন‚ এই অপরাধ ও পাপবোধ তাকে কুরে কুরে খাচ্ছিল। পুলিৎজার পুরস্কার পাওয়ার চারমাস পরে আত্মঘাতী হন কার্বন মনোক্সাইড বিষক্রিয়ায়। মাত্র ৩৩ বছর বয়সে।

আর ওই শিশুর কী হল ? বহুদিন পরে ২০১১ সালে জনৈক সুদানী দাবি করেন‚ ওই শিশু তার ছেলে‚ কোং নায়োগ। তাকে পরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল জাতিসংঘের ক্যাম্পে। সে যাত্রা রক্ষা পেলেও কোং মারা যায় ২০০৭ সালে জ্বরে ভুগে।

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here