ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ফেলাকে (৪০) চেনে না এমন কেউ নেই। হাসপাতালের সুপারসহ সবাই তাকে মান্য করে চলে। না তিনি কোনো নেতা বা চিকিৎসক নন, শহরের হারোকান্দির পশ্চিম পাড়ার এই বাসিন্দা মূলত একজন ভ্যানচালক। দীর্ঘদিন ভ্যানে করে লাশ আনা নেওয়া করতে করতে এখন হাসপাতাল মর্গের বড় কর্তা বনে গেছেন। তার হুকুম ছাড়া মর্গ থেকে কোনো লাশ বের করা যায় না।

শনিবার বিকেলে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হন ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার বাগাট ইউনিয়নের দাসপাড়ার বাসিন্দা ইসলাম শেখ (৬৫)। গুরুতর আহত ওই বৃদ্ধকে প্রথমে মধুখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। রাতে তার অবস্থার অবনতি হলে স্থানান্তর করা হয় ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। রাত ২টার দিকে তার মৃত্যু হয়।

অপমৃত্যু হওয়ায় রোববার সকালে ইসলাম শেখের লাশ ময়না তদন্তের জন্য হাসপাতাল মর্গে রাখা হয়। স্বজনরা তা আনতে গেলে ফেলা ৪ হাজার টাকা দাবি করেন। কিন্তু দরিদ্র এই পরিবারটির তা দেওয়ার ক্ষমতা নেই। এতে ফেলার কিছু আসে যায় না, তারা যে কথা সেই কাজ। ওই টাকা আদায় করেই লাশ হস্তান্তর করেন তিনি।

ইসলাম শেখের লাশ আনতে স্বজনদের সঙ্গে গিয়েছিলেন বাগাট ইউনিয়ন পরিষদের ৫নং ওয়ার্ডের সদস্য শওকত আলী মোল্লা। তিনি বলেন, রোববার সকালে লাশ আনতে আমিও যাই। কিন্তু যাওয়ার পর মর্গের দায়িত্বে থাকা ফেলা নামের এক ব্যক্তি টাকা না দিলে লাশের ময়নাতদন্ত হবে না, এ ধরনের ভয়ভীতি দেখিয়ে আমাদের কাছ থেকে ৪ হাজার টাকা নেয়। পরিবারটি দরিদ্র। তাই ওই টাকা আমার কাছ থেকে দিয়ে লাশ নিয়ে বাড়ি ফিরি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ফেলা নিয়োগপ্রাপ্ত নন। লাশ নিয়ে তার এই টাকা হাতানোর খবর হাসপাতাল সুপারসহ সবারই জানা। কিন্তু কেউ তাকে কিছু বলে না। উল্টো অনেকেই তাকে মান্য করে চলে। নানা ধরনের ভয়ভীতি দেখিয়ে শোকাহত স্বজনদের হয়রানি করাই তার নিত্য কাজ। হয়রানি থেকে বাঁচতে বাধ্য হয়েই টাকা দিয়ে লাশ নেন স্বজনরা। গত ১০ বছর ধরেই চলছে তার অত্যাচার। লাশ ছাড়ানোর টাকা দিয়ে ফেলা এখন লাখপতি। নির্মাণ করেছেন বাড়ি-ঘর, জমি-জমা কিনে হয়ে উঠেছেন প্রভাবশালী।

তবে নাম প্রকাশ না করা শর্তে হাসপাতালের একাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারী জানান, লাশ ছাড়ানোর টাকা শুধু ফেলা একাই খায় না, এর ভাগ হাসপাতালের অনেকের পকেটে যায়। বিশেষ করে যারা ওয়ার্ডের দায়িত্বে থাকে তারাই এ টাকার বড় একটা অংশ পায়।

হাসপাতালের পরিচ্ছন্নকর্মী প্রদীপ জামাদদার বলেন, সম্প্রতি চিঠি দিয়ে হাসপাতাল মর্গের দায়িত্ব আমাকে দেওয়া হয়। কিন্তু ফেলার দাপটে মর্গের কাছেই যেতে পারছি না। অথচ সে হাসপাতালের নিয়োগপ্রাপ্ত কোনো কর্মচারীই নয়।

ফেলার ঘনিষ্ট হিসেবে পরিচিত হাসপাতালের ওয়ার্ড মাস্টার সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ফেলা স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করে। তবে লাশ দেওয়ার সময় টাকা নেওয়ার কথা নয়। নিয়ে থাকলে সে অন্যায় করেছে।

এ বিষয়ে অভিযুক্ত ফেলা অবশ্য বলেন, লাশ ওঠা-নামা করানোর জন্য মানুষ আমাকে খুশি হয়ে কিছু দেয়। নিজে থেকে আমি কিছু চাই না।

হাসপাতাল পরিচালক অধ্যাপক ডা. কামদা প্রসাদ সাহা বলেন, ময়নাতদন্তের নামে ও হাসপাতাল থেকে কোনো লাশ নেওয়ার সময় টাকা নেওয়ার নিয়ম নেই। আসলে আমি নতুন এসেছি। বিষয়টি খতিয়ে দেখবো।

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here