রাজধানীর মোহাম্মদপুরে মাদকের হটস্পট বলে পরিচিত জেনেভা ক্যাম্প। বাংলা মদ থেকে শুরু করে গাঁজা, ফেন্সিডিল, হেরোয়িন সবই পাওয়া যায় এই এলাকায়। তবে বর্তমানে এখানকার সবচেয়ে বেশি বিক্রিত মাদক ইয়াবা। বলা হয়, সন্ধ্যার পর এই এলাকায় গাঁজা ও ইয়াবা রীতিমতো ফেরি করে বিক্রি করা হয়। ঘিঞ্জি বস্তি আর ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও এখানকার সব জায়গায় নজরদারি চালাতে পারে না। ফলে দিন দিন আরো বেপরোয়া হয়ে উঠছে এইএলাকার মাদক সিন্ডিকেট।

সম্প্রতি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অনুসন্ধানে এই এলাকার মাদক ব্যবসার পেছনে বেশ কয়েকজন গডফাদারের নাম উঠে এসেছে। এর মধ্যে অন্যতম এলাকায় মাদকাসক্তদের কাছে ‘ইয়াবা সুন্দরী’ নামে পরিচিতি পাওয়া পাপিয়া আক্তার ও তার স্বামী জয়নাল আবেদিন ওরফে পাঁচু। ইয়াবা ব্যবসা করে এই নারী অল্পকিছুদিনের মধ্যেই রীতিমতো বাড়ি-গাড়ির মালিক হয়ে গেছেন।

জানা গেছে, পাপিয়ার ব্যবসার বৈশিষ্ট হলো, তার সঙ্গে রয়েছে এক ঝাঁক নারী। এসব নারী পাপিয়া ও তার স্বামীর কাছ থেকে ইয়াবা সংগ্রহ করে খুচরা বিক্রেতা হিসেবে কাজকরে। এমনকি ক্রেতারা অর্ডার দিলে পৌঁছে দেন বাড়িতে গিয়েও। পুলিশ বলছে, পাপিয়ার সঙ্গে থাকা নারী বিক্রেতাদের মধ্যে শীর্ষ কয়েকজন হলেন সীমা, নার্গিস, সয়রা, গান্নী, কালী রানী, বেচনি, সকিনা, কুলসুম ও রেশমা।

পুলিশ সূত্রবলছে, মোহাম্মদপুর, আদাবর, শ্যামলী এলাকা পাপিয়ার মাদক ব্যবসার মূল আখড়া হলেও আসলে দেশব্যাপী বিস্তৃত তার নেটওয়ার্ক। চট্টগ্রাম থেকে ইয়াবা আমদানি করে আনা হয় ঢাকায়। চট্টগ্রামের হোসাইন নামে এক মাদক ব্যবসায়ী তা পৌঁছে দেয় পাপিয়ার ভাসুর রাহীর কাছে। পরবর্তীতে পাপিয়া ও তার স্বামী পাচু মিলে তা ছড়িয়ে দেয় মাঠ পর্যায়ে।

সর্বশেষ গত বছরের ৪ ডিসেম্বর আদাবরের শেখেরটেকের শ্যামলী হাউজিং সোসাইটির বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয় পাপিয়াকে। এ সময় তার বাসা থেকে একটি পিস্তল ও লক্ষাধিক টাকা মূল্যের ইয়াবা জব্দ করা হয়। কিন্তু পরে জামিন নিয়ে আবার বেরিয়ে আসেন তিনি।

জানা গেছে, মোহাম্মদপুরের আজিজ মহল্লার আবু হানিফের মেয়ে পাপিয়া হাই স্কুলে পড়ার সময় এলাকার মাদক ব্যবসায়ী পাঁচুর প্রেমে পড়েন। পরে তারা বিয়ে করে সংসার পাতেন। পাঁচু ছোটবেলা থেকেই ছিঁচকে চুরিতে অভ্যস্ত ছিল। এক পর্যায়ে নিজের ভাইদের নিয়েই এলাকার মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নেয়। এই পরিবারের সবার পেশাই এখন মাদক ব্যবসা।

পাপিয়ার স্বামী জয়নাল আবেদিন ওরফে পাঁচু

পুলিশ বলছে, মোহাম্মদপুরের মাদক ব্যবসার আরেক সম্রাটের নাম ইসতিয়াক। ওই এলাকার অনেকেই আছেন ইসতিয়াকের চেহারা দেখেননি কিন্তু তার নাম জানেন। তিনি মাঝেমধ্যেই বিলাসবহুল গাড়িতে করে মাদকের পাইকারি বিক্রেতাদের কাছে আসেন। ইসতিয়াক থাকে সাভার এলাকায়। ৩৫ বছর বয়সী ইসতিয়াকের জন্ম মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পে। ছোটবেলা থেকেই চুরি-ডাকাতিতে অভ্যস্ত।

হেমায়েতপুরে রয়েছে তার ১০০ কাঠা জমি। শুধু তাই না ইসতিয়াকের রয়েছে পার্সনাল সেক্রেটারি। তার নাম আদনান তানভির। তানভির নিজেকে কখনও মানবাধিকারকর্মী ও কখনও সরকারি দলের নেতা পরিচয় দিতো। এখন সে ইসতিয়াকের বাণিজ্যের হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা।

অভিযোগ আছে মোহাম্মদপুরের স্থানীয় ৩২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাবিবুর রহমান মিজান এসব শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীদের থেকে নিয়মিত মোটা অঙ্কের টাকা পান। এ বিষয়ে খোঁজ নিতে গিয়ে জানা যায়, কাউন্সিলর মিজান বর্তমানে সৌদি আরবে রয়েছেন। তবে এর আগে একই প্রসঙ্গে তিনি অন্য গণমাধ্যমের কাছে বলেছিলেন, মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে তার কোনো যোগসাজশ নেই। তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও ক্যাম্পের কিছু লোকজন এসব অপপ্রচার চালায়।

কাউন্সিলরের ব্যক্তিগত সহকারী মর্তুজা আহমেদ খান বলেন, কাউন্সিলর ও তার নিজের মাদক ব্যবসার সঙ্গে কোনো সম্পৃক্ততা নেই। বরং তারা মাদক প্রতিরোধে কাজ করছেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে কিছু লোক তাদের বিরুদ্ধে অপবাদ দিচ্ছেন। আর সৈয়দ সাঈদ আগে মাদক ব্যবসায় সম্পৃক্ত থাকলেও কাউন্সিলরের সংস্পর্শে এসে তিনিও ভালো হয়ে গেছেন।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিচালক (গোয়েন্দা ও অপারেশনস) ডিআইজি সৈয়দ তৌফিক উদ্দীন আহমেদ বলেন, ঢাকায় মাদকের অন্তত ৩০০ ডিলার পর্যায়ের ব্যবসায়ী রয়েছে। তাদের আমরা নজরদারি করছি। অনেককে বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার করেছি। মাদক প্রতিরোধ করতে কঠোর আইন-প্রয়োগের পাশাপাশি সবাইকে সচেতনভাবে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here