মিয়ানমার থেকে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শিশুদের জন্য বিশ্ববাসীকে হৃদয় খুলে দিতে আহ্বান জানিয়েছেন অভিনেত্রী প্রিয়াংকা চোপড়া। জাতিসংঘ সংস্থা ইউনিসেফের শুভেচ্ছাদূত হিসেবে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প ঘুরে এসে গতকাল রাজধানীর লা মেরিডিয়ান হোটেলে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ আহ্বান জানান।

প্রিয়াঙ্কা চোপড়া বলেন, ‘শরণার্থী শিশুদের দায়িত্ব পুরো পৃথিবীকে নিতে হবে। কারণ তাদের যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। আগামী বিশ্বের ভবিষ্যৎরা খুব বাজে অবস্থায় আছে। যারা আগামীতে বিশ্বকে নেতৃত্ব দেবে তারা আজ পরিবারের সঙ্গে ঘুমোতে পারছে না। তাদের সামনে এমন নৃশংসমূলক কর্মকা- ঘটেছে, যেগুলো মুছে ফেলতে পারছে না, ঘুমের মধ্যেও তারা ভয় পাচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘এমন পরিস্থিতি কি ভাবা যায়? আমাদের এ বিষয়ে এখনই সোচ্চার হতে হবে। শিশুদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। হৃদয় খুলে দিন, আপনারা মনে সহমর্মিতা আনুন। এই শিশুদের নিজের সন্তানদের মতো দেখুন।’

প্রিয়াংকা আরও বলেন, ‘আমার এই ট্রিপ ছিল শিশুদের জীবন বদলের ট্রিপ। সেই বার্তা নিয়েই বাংলাদেশে এসেছি। নিরাপদে-নির্বিঘ্নে বেড়ে ওঠার অধিকার প্রতিটি শিশুরই রয়েছে।’ রোহিঙ্গা শিশুদের এই সংকটের জন্য যেসব দেশ দায়ী তাদেরকে আপনি কোনো চাপ দিবেন কি না? সাংবাদিকরা জানতে চাইলে সাবেক এই বিশ্ব সুন্দরী বলেন, ‘আমি কোনো রাজনৈতিক কর্মী নই। আমি অভিনেত্রী এবং আমি আমার জায়গা থেকে শিশুদের জন্য কাজ করছি।’

গেল সোমবার বাংলাদেশে আসা এই অভিনেত্রী উখিয়া ও টেকনাফের ১০টি শরণার্থী ক্যাম্প এবং সীমান্তের কাছের রোহিঙ্গাদের আসার ট্রানজিট পয়েন্ট ঘুরে দেখেন। এ সফরে তিনি রোহিঙ্গা শিশুদের সঙ্গে সময় কাটিয়ে তাদের বাস্তবতা ও সংকটাপন্ন জীবনযাপনকে উপলব্ধির চেষ্টা করেন। ওই শিশুদের আঁকা চিত্রকর্মও দেখেন তিনি। ছোট্ট শিশুদের চিত্রকর্মের বিষয়বস্তু দেখে অবাক প্রিয়াংকা বলেন, ‘তারা দেখেছে মাথার ওপর রকেট লঞ্চার, পায়ের তলায় মাইন। তারা সেটা মনে রেখেছে এবং এঁকেছে।’

রোহিঙ্গাদের জন্য সীমান্ত উন্মুক্ত করে দেওয়ায় বাংলাদেশের প্রশংসা করেন প্রিয়াংকা। বলেন, ‘মানবিকতার জন্য বাংলাদেশ সীমান্ত খুলে দিয়েছে, যে মানবিকতা সারা বিশ্বের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।’ সংবাদ সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন ইউনিসেফের বাংলাদেশ প্রতিনিধি সীমা সেন গুপ্ত, কমিউনিকেশনস চিফ জ্যঁ জ্যাক সিমন।

এর আগে বিকালে গণভবনে শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন প্রিয়াংকা। রোহিঙ্গা শিশুদের আশ্রয় ও শিার ব্যবস্থা করে দেওয়ায় প্রধানমন্ত্রীকে কৃতজ্ঞতা জানান। সেই সঙ্গে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে তার অভিজ্ঞতার কথা প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেন ইউনিসেফের এই শুভেচ্ছাদূত। চার দিনের সফরে বাংলাদেশে আসা প্রিয়াংকা টেকনাফ ও শামলাপুর রোহিঙ্গা ক্যাম্প, উখিয়ার বালুখালী, জামতলী এবং কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেন।

কক্সবাজার থেকে ঢাকায় আসার আগে গতকাল সকালে রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে ফেসবুক লাইভে রোহিঙ্গা শিশুদের সহায়তায় সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান প্রিয়াংকা চোপড়া। সেখানে শিশুদের করুণ অবস্থা বর্ণনা করেছেন তিনি। পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রোহিঙ্গাদের নিয়ে করা ভক্তদের প্রশ্নের জবাবও দেন। প্রায় ১৪ মিনিটের বক্তব্যে তিনি নানা সমস্যার কথা তুলে ধরেন বিশ্ববাসীর সামনে।

শিশুদের জন্য নির্ধারিত ক্যাম্প থেকে প্রিয়াংকা বলেন, ‘এখানে শৌচাগার ও পানির টিউবওয়েলের জায়গা পাশাপাশি। ফলে বৃষ্টি হলে শৌচাগার থেকে পানি উপচে পড়ে এবং দূষিত হয়ে যায়। এতে নানা রোগজীবাণু ছড়িয়ে পড়ে।’ ভক্তদের উদ্দেশে প্রিয়াংকা বলেন, ‘শিশুদের ধর্ম কী, বাবা-মা কে, এদের পরিচয় কী- এগুলো বড় বিষয় নয়। এখন এদের দরকার আপনার সহানুভূতি।’

এক ভক্তের প্রশ্নের জবাবে বলিউড অভিনেত্রী বলেন, ‘শিশুদের আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম- তোমাদের স্বপ্ন কী? তাদের সবাই বলে ওঠে, আমি স্কুলে যেতে চাই। কেউ কেউ বলে, সাংবাদিক হতে চাই। এই শিশুরা তাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কিছুই জানে না। কিন্তু এখন তারা মৌলিক শিা পাচ্ছে। তাদের বার্মিজ, ইংলিশ ও গণিত শেখানো হচ্ছে।’

ইউনিসেফ পরিচালিত শিশুবান্ধব কেন্দ্রে এসে ঘণ্টাখানেক সময় কাটান প্রিয়াংকা। শিশুদের সঙ্গে কিছুক্ষণ লুডু খেলেন। তাদের আঁকা ছবি নিয়ে গল্প করেন। খেলনা চায়ের কাপ নিয়েও শিশুদের সঙ্গে আনন্দে মেতে ওঠেন। পরে প্রায় মিনিট ১৫ হেঁটে লোকজনের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় শেষে শিবির ছাড়েন। তার আগে তিনি শিশুদের হিন্দিতে স্কুলে যাবে কিনা জানতে চান। এরপর প্রিয়াংকা তাদের স্কুলে যেতে বলেন, নিজের দিকে খেয়াল রাখার কথাও বলেন। সবার শেষে ‘খোদা হাফেজ’, ‘আবার দেখা হবে’ বলে বিদায় নেন।

কক্সবাজার জেলা পুলিশের মুখপাত্র ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আফরাজুল হক টুটুল জানান, বলিউড অভিনেত্রী প্রিয়াংকা চোপড়া ইউনিসেফের শুভেচ্ছাদূত হয়ে রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্প পরিদর্শনে আসার কারণে পুলিশের পক্ষ থেকে ছিল ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা।

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here