গাইবান্ধা জেলার প্রত্যন্ত এক গ্রামের স্বল্পশিক্ষিত অত্যন্ত সৎ ড্রাইভার ছিলেন মফিজ। তাঁর শেষ জীবনের সঞ্চয় এবং বাবার দেয়া সামান্য জমি বিক্রি করে ঢাকা রুটের একটা পুরাতন বাস কিনে ঢাকা-গাইবান্ধা রুটে বাসটি চালু করলেন। গরিব দরদি মফিজ সাহেব দিনমজুর লোকদের স্বল্প ভাড়ায় ঢাকা নিয়ে যেতেন।

এক সময় বয়সের ভারে মফিজ সাহেব অন্য ড্রাইভার দিয়ে বাস চালানো শুরু করলেন। কিন্তু দিনমজুর শ্রেণির লোকেরা ভাড়া সাশ্রয়ের জন্য তার বাড়িতে ধর্না দেয়া শুরু করলো। তাদের উপকারের জন্য সাদা কাগজে মফিজ লিখে সুপারভাইজারকে দিতে বলতেন এবং বাসের ছাদে নামমাত্র ভাড়ায় ঢাকা যাতায়াতের সুবিধা করে দেয়ার ব্যবস্থা করতেন।

বাসের সুপারভাইজার মফিজ স্বাক্ষরযুক্ত কাগজ সংগ্রহ করে কম ভাড়া আদায় করতেন। তাই বাসের ছাদে উচ্চস্বরে সুপার ভাইজার বলতেন কয়জন মফিজ আছো ছাদে? অথাৎ কয়টা মফিজের স্লিপ আছে? আর এ ভাবে গরিবের উপকারী বন্ধু মফিজ শব্দটি চালু হয়। আজ আমরা ঠাট্টা করে অনেকে ‘মফিজ’ শব্দটি উচ্চারণ করি। কিন্তু বুকে হাত দিয়ে বলেন ‘মফিজ’ হওয়ার যোগ্যতা কি আপনার আমার আছে?

এখন আসুন মূল কথায়- ব্যাকডেটেট পিছিয়ে থাকা জনগণ ভাইভা বোর্ডে নব্বই ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে ভ্রু-কুঁচকে বলা হয়, ‘ও…! তোমার বাড়ি উত্তরবঙ্গে।’ তারপর রেজাল্ট যা হবার তাই হয়। একটা কমন চিত্র। ব্যাপারটা কি সত্যি এরকম? আসলেই কি এরা ব্যাকডেটেট? যাদের মানসিকতা এমন তারা কি আপডেটেড? আজকের প্রভাবশালী জনপ্রিয় লেখক আনিসুল হক কোথাকার? সৈয়দ শামসুল হক কোথাকার? কবি শেখ ফজলল করিম কোথাকার ছিলেন? ফকির মজনু শাহ? আব্বাস উদ্দীন? তেভাগা আন্দোলনের সফল নায়ক হাজী দানেশের বাড়ি কোন বঙ্গে ছিল? প্রফুল্ল চক্রবর্তী আর ক্ষুদিরাম বসু জানেন কোথাকার ছিল?

যে ম্যাডামটা আজকে ভাইভাতে বসে উত্তরবঙ্গকে ব্যাকডেটেট বলে, সে হয়তো ভুলে গেছে মেয়ে মানুষদের পড়াশুনার ইতিহাস? উত্তরবঙ্গের বেগম রোকেয়া না থাকলে আজ কি হতো? তানিয়া আমিররা আইনজীবী হতে পারতো না বিমানের পাইলট হতে পারতো না কানিজ ফাতেমারা ওয়াসফিয়ার হিমালয় জয় করা লাগতো না। চুলায় আগুন দিতে দিতে জীবন শেষ করতে হতো।

মৌর্য সেনদের রাজধানী কোথায় ছিল? ঢাকা তো দু- চার’শ বছর আগে রাজধানী হল। ঢাকা অনেক জুনিয়র, সিনিয়র রাজধানী তো মহাস্থানগড়! নয় বছর দেশ চালানো এরশাদ সাহেব কোথাকার? শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান কোন বঙ্গের? বগুড়ার ম্যাডাম খালেদা জিয়ার জন্ম দিনাজপুর। দেশের সংকট সময়ে সাহসী সেনাবাহিনীর প্রধানরা কোন বঙ্গের ছিল? বিখ্যাত সাংবাদিক থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হয়ে যাওয়া মশিউর রহমান যাকে আমরা যাদু মিয়া নামে চিনি তার বাড়িটাও উত্তরবঙ্গের রংপুরে। কিংকর্তব্যবিমূঢ!! বাংলাদেশের বিপদকালীন সময়ে হাল ধরা রাষ্ট্রপতিরা আর সেনাপ্রধানরা কোন বঙ্গের? পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে ১৯৫৩ থেকে ১৯৫৫ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন বগুড়ার মোহাম্মদ আলী (১৯০৯-১৯৬৩)।

একবার বাংলা একাডেমিতে আঞ্চলিক বিতর্ক হচ্ছে। এই বিতর্ক নিজের অঞ্চলের ভাষায় করতে হয়। একটু মজাও করতে হয়। রংপুরের পক্ষে বিতর্কের যে অংশটুকু চ্যানেল আই-এ দেখানো হল সেটি ছিল সংক্ষেপে এরকম-

‘হামার দ্যাশের জনক বঙ্গবন্ধুর ছাওয়া শেখ হাসিনা। বিয়ার জন্যে পাত্র খুজিবার নাগচে। কোনোটে ভালো পাত্র পায় নাই। শ্যাষে সবারচাইতে ভালো পাত্র কোটে পাইচে কন তো বাহে? হামারঅমপুরে!’ বাদ দেন সারা দেশে শতসহস্র ছেলে থাকতে বঙ্গবন্ধু ওনার মেয়েকে উত্তরবঙ্গের ছেলের সাথে বিয়ে দিল কেন? কারন বঙ্গবন্ধু জানতেন ওয়াজেদ জিনিয়াস, হু ইজ রিয়েলি স্মার্ট!!” দেশ চালায় কোন বঙ্গের মানুষ? কোন বঙ্গের পুত্রবধু? সাবধান।

মজলুম জননেতা মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, জাতীয় চার নেতার এক নেতা ক্যাপ্টেন মনসুর, জেনারেল জে এন চৌধুরী (সাবেক ভারতীয় সেনাপ্রধান), সাবেক বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) এ কে খন্দকার, বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ ঔষধ প্রস্তুতকারি প্রতিষ্ঠান স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা স্যামসন এইচ চৌধুরী, সঙ্গীতশিল্পী তপন মাহমুদ, বাপ্পী লাহিড়ী, ডলি সায়ন্ত্বনী, বাদশা বুলবুল, খ্যাতিমান উপস্থাপক ফজলে লোহানী, বাংলা গদ্যরীতির সার্থক রূপকার সাহিত্যিক প্রমথ চৌধুরী, কবি বন্দে আলী মিয়া, জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা সুচিত্রা সেন, টিভি ব্যক্তিত্ব চঞ্চল চৌধুরী, জাহিদ হাসান, তৌকির আহমেদ, নায়ক আলি রাজ, বৃন্দাবন দাস- এরা কোথাকার? স্বপ্নাতুর কবি সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী, বিজ্ঞানী আবদুল্লাহ আল মুতী শরফুদ্দিন, মাওলানা খোন্দকার আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ, মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান, যাদব চন্দ্র চক্রবর্তী, রজনী কান্ত সেন, ফতেহ লোহানী, কন্ঠশিল্পি কনকচাঁপা, মুসা ইব্রাহীম একজন বাংলাদেশি পর্বতারোহী এবং সাংবাদিক, যিনি প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে মাউন্ট এভারেস্ট জয় করেছেন। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মুহাম্মদ নাসিম এরা সকলেই উত্তরবঙ্গের সন্তান।

ভুলে যাবেন না সজীব ওয়াজেদ জয় একজন রংপুর সন্তান। হাসের মত প্যাকপ্যাক করে ভাইভা বোর্ডে উত্তরবঙ্গের মফিজ বলে সবাইকে তাড়িয়ে দিলে প্রেসিডেন্ট জিয়া, জেনারেল এরশাদ, খালেদা জিয়া, আনিসুল হকদের পেত না এই বাংলাদেশ। ভারতসহ বিশ্বে ১৫০টির বেশি দেশে পণ্য রপ্তানি করে সারা বিশ্বে দেশের সুনাম আনছে প্রাণ আর এফ এল গ্রুপ, দুঃখিত ভাই এটাও উত্তরবঙ্গের, সারাবিশ্বে ফ্যাশন দুনিয়ার রানি বলে সমাদৃত বিবি রাসেল, এই মানুষটার বাড়ি রংপুর।

অসংখ্য রহিমুদ্দি, করিমুদ্দি ভরসা কিংবা আমজাদ খান চৌধুরী পুরা উত্তরবঙ্গ জুড়ে। মেধার অভাব উত্তরবঙ্গে নেই কিছু কিছু চেয়ারে বসা বিচারকের “সুস্থ মানসিকতার” অভাব আছে। কথিত মহান ব্যক্তিরা উত্তরবঙ্গ বলে যখন কাউকে পাঠিয়ে দিলেন তারা হয়তো তখন ভাসানী, ক্যাপ্টেন মনসুর একজন আনিসুল হককে কিংবা ভবিষ্যত কোনো রাষ্ট্রপতিকে হারিয়ে ফেললেন। সাথে সাথে এক ধাপ পিছিয়ে গেল বাংলাদেশ। আমি একটা কথা সবসময় বলি, ”মনে রাখবেন রাষ্ট্র শাসনের নবাবীত্ব উত্তরবঙ্গ থেকেই এসেছে। তাই উত্তরবঙ্গের মানুষকে মফিজ বলার আগে এই কথাগুলো একবার ভেবে দেখবেন। (সংগৃহীত)

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here