চট্টগ্রামের সানশাইন গ্রামার স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্রী তাসফিয়া আমিনের মৃত্যুর বিষয় তদন্ত করতে গিয়ে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য পাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এরইমধ্যে পুলিশ জানতে পেরেছে তাসফিয়ার বাবা মোহাম্মদ আমিনসহ তার পুরো পরিবার জড়িত ইয়াবা ব্যবসায়। মোহাম্মদ আমিন এবং তার ছোট ভাই নুরুল আমিন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কালো তালিকাভুক্ত ইয়াবা ব্যবসায়ী। আর তাদের প্রশ্রয়েই এত অল্প বয়সে বিলাশবহুল জীবনযাপন করতো তাসফিয়া। প্রায়ই ব্যস্ত থাকতো বন্ধুদের সঙ্গে পার্টি আর শপিং নিয়ে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মাদক ব্যবসা করে কোটি কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন তাসফিয়ার বাবা মোহাম্মদ আমিন ও চাচা নুরুল আমিন। বিলাসী জীবনযাপনে অভ্যস্ত তারা। বাসা থেকে বের হওয়ার সময় স্কুলছাত্রী তাসফিয়ার হাতে ছিল আইফোন। হাতে ছিল সোনার আংটিও ছিল।

জানা গেছে, ২০১৫ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক অধিশাখা-৬-এর এক স্মারকপত্রের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের যুগ্ম সচিব ও পরিচালক (অপারেশন ও গোয়েন্দা) প্রণব কুমার নিয়োগী স্বাক্ষরিত তালিকায় ৭৬৪ জন মাদক কারবারি নাম প্রকাশ করা হয়। ওই তালিকায় রয়েছে মোহাম্মদ আমিন ও তার ছোট ভাই নুরুল আমিনের নাম। তাদের বিরুদ্ধে রয়েছে মাদক আইনেসহ নয়টি মামলা।

আমিন নিজেকে সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসায়ী পরিচয় দিলেও এ বিষয়ে কোনো প্রমাণ পুলিশের কাছে মেলেনি। তিনি মূলত ইয়াবা কেনাবেচার সঙ্গে যুক্ত। তাদের গাড়ি-বাড়ির হিসেব নেই। এছাড়া চুরির ঘটনায় ২০১০ সালের ৮ অক্টোবর কক্সবাজারের টেকনাফ থানায় দায়েরকৃত একটি মামলার আসামি মোহাম্মদ আমিন। এরপর ইয়াবা ব্যবসায় জড়ায় আমিন।

২০১৫ সালের ২২ এপ্রিল চট্টগ্রাম নগরের কোতোয়ালী থানার স্টেশন রোড়ের প্যারামাউন্ট সিটির সামনে থেকে ইয়াবাসহ গ্রেফতার হন তিনি। এ ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে দায়েরকৃত মামলায় কারাগারে যান আমিন।

এরপর জামিনে বেরিয়ে ফের ইয়াবা চোরাকারবারের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন তিনি। ২০১৬ সালের ৭ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম নগরের কোতোয়ালি থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে দায়ের করা একটি মামলায় এজাহারভুক্ত করা হয় আমিনকে। অবশ্য ২০১৫ সালে গ্রেফতার হওয়ার অনেক আগে থেকে ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে আমিনের জড়িত থাকার তথ্য রয়েছে পুলিশের কাছে।

২০১৩ সালের ৮ জানুয়ারি চট্টগ্রাম নগরের ডবলমুরিং থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে রেকর্ড করা একটি মামলায় মোহাম্মদ আমিনের নাম রয়েছে। কক্সবাজারের টেকনাফ থানায়ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে দায়েরকৃত একটি মামলায় এজাহারভুক্ত আসামি মোহাম্মদ আমিন।

এদিকে মোহাম্মদ আমিনের ছোট ভাই নুরুল আমিনও ইয়াবা চোরাকারবারের সঙ্গে জড়িত বলে তথ্য মিলেছে। স্বাক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন নুরুল আমিনের বিরুদ্ধে রয়েছে অন্তত চারটি মামলা। সবকটি মামলায় এজাহারভুক্ত আসামি তিনি। ২০১৬ সালের ৭ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম নগরের কোতোয়ালি থানাধীন কাজীর দেউড়ী এলাকা থেকে ইয়াবাসহ গ্রেফতার হন নুরুল আমিন।

এর আগে ২০১৪ সালের ২০ মার্চ টেকনাফে পুলিশের ওপর হামলা ও অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় পৃথক দুটি মামলার আসামি তিনি। ২০১৪ সালের ৬ এপ্রিল টেকনাফ থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের একটি মামলায়ও নুরুল আমিনকে আসামি করা হয়েছিল।

মাদক কেনাবেচা ও এ সব মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে তাসফিয়ার চাচা নুরুল আমিন বলেন, ‘এখন বলার কিছু নেই। মানসিক অবস্থা তেমন ভালো নেই। পরে যোগাযোগ করেন। এটা ভালো হবে।’ তাসফিয়ার বাবা মোহাম্মদ আমিনের ফোন নম্বর চাইলে তিনি বলেন, ‘ভাই এখন চট্টগ্রামে। নম্বর এই মুহূর্তে নেই।’

কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্তের ঠিক ওপারেই মিয়ানমারে ইয়াবার হাট। সেই টেকনাফের ডেইলপাড়ায় বাড়ি তাসফিয়াদের। ওই এলাকার ইয়াবা সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য তার বাবা মোহাম্মদ আমিন ও চাচা নুরুল আমিন। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের হিসেবে দেশে বছরে ছয় হাজার কোটি টাকার ইয়াবা ব্যবসার মূল জোগান হয় টেকনাফ থেকেই।

টেকনাফের বাসিন্দাদের বেশির ভাগই ছিলেন দিনমজুর, জেলে, রিকশাচালক কিংবা লবণচাষি। এই পেশাগুলোই ছিল তাদের বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন। কিন্তু গত পাঁচ বছরে এই শ্রমজীবীরাই ইয়াবার বদৌলতে বনে গেছেন কোটিপতি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) অনুসন্ধান বলছে, শুধুমাত্র টেকনাফ ও ঢাকার এমন ১৮ জন ইয়াবা ব্যবসায়ীর ২৬ কোটি টাকা লেনদেনের হদিস পাওয়া গেছে।

গত ২ মে সকালে চট্টগ্রাম নগরীর পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতের ১৮ নম্বর ব্রিজঘাটের পাথরের ওপর থেকে তাসফিয়া আমিনের মরদেহ উদ্ধার করে পতেঙ্গা থানা পুলিশ। পরে একই দিন সন্ধ্যায় নগরের খুলশী থানার জালালাবাদ হাউজিং সোসাইটি এলাকা থেকে পুলিশ অভিযান চালিয়ে তাসফিয়ার বন্ধু আদনান মির্জাকে (১৬) আটক করে। আটক আদনান মির্জা বাংলাদেশ ‍এলিমেন্টারি স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র এবং ব্যবসায়ী ইস্কান্দার মির্জার ছেলে।

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here