বাংলাদেশে সড়ক মহাসড়কে মৃত্যুর মিছিল অনেকটাই স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু আর প্রতিদিন সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন। যেন একটি রুটিন ওয়ার্ক। দেখো গেছে, দেশে প্রতিদিন গড়ে ২০-২২ জন মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন। গতবছর সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় সাড়ে সাত হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে বেশিরভাগই পথচারী। আর্থিক ক্ষতির হিসাবে বছরে এর পরিমাণ ৪০ হাজার কোটি টাকা। গত ৩ এপ্রিল ঢাকার কারওয়ানবাজারে দুই বাসের পাল্লায় তিতুমীর কলেজের ছাত্র রাজীব হোসেনের হাত কাটা পড়ার ঘটনায় আবার নতুন করে আলোচনায় এসেছে সড়ক দুর্ঘটনা। দুই বাসের মাঝে রাজীবের আটকে যাওয়া কাটা হাতের ছবি মানুষকে নাড়া দেয়। সেই ছবি ভাইরাল হয়। মানুষ আবার সড়ক দুর্ঘটনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত রাজীবকে বাঁচানো যায়নি। থামেনি বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে বা দুই বাসের চাপে যাত্রী বা পথচারীর মৃত্যুর ঘটনা। কিন্তু মানুষ কথা বলছে এই সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে। চাইছে এর অবসান।

দুর্ঘটনার নতুন কারণ সামনে এসেছে
সড়ক দুর্ঘটনার একটি কারণ সামনে এসেছে, যা প্রচলিত ধারণার বাইরে। বেপরোয়া গাড়ি চালানোর মূল কারণ কী, তা জানা গেছে। আর তা হলো মালিকদের মুনাফার লোভ। ঢাকা শহরে পরিবহণ ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন চালকদের ওপর। তাদের কোনো বেতন নেই। মালিক প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকার বিনিময়ে চালককে গাড়ি দিয়ে দেন। চালককে ওই টাকা দিন শেষে মালিককে দিতেই হবে। এর বাইরে যা আয় হবে, তা থেকেই আয় নেবেন চালক এবং বাসের কন্ডাকটার, সুপারভাইজার, হেলপার। তাই ভোর থেকে শুরু হয় প্রতিযোগিতা। কে কত বেশি ট্রিপ দিতে পারে, কত বেশি যাত্রী তুলতে পারে। একটি বাসকে আরেকটি বাসের পেছনে ফেলার প্রতিযোগিতা। একটি বাস যাত্রী তুলতে গেলে তাকে চাপিয়ে রাস্তার আরেক পাশে হটিয়ে দেওয়া। যাত্রী তোলার পাদানির কাছে আরেকটি বাস এমনভাবে অবস্থান নেয় যাতে যাত্রী সহজে উঠতে না পারে। এই প্রতিযোগিতা এবং মরণ রেসের শিকার হন যাত্রী, পথচারী সবাই।

তাহলে প্রশ্ন, দূরপাল্লার বাস মহাসড়কে কেন বেপরোয়া গতিতে চালায়? সেখানেও উত্তর একই রকম। বাসের ড্রাইভার, হেলপার বা কন্ডাকটার বাসের মাসিক বেতনের কোনো কর্মচারী নন। তাদের ভাতা বা বেতন দেওয়া হয় ট্রিপের ওপর। ট্রিপ নেই তো বেতন নেই। উল্টো যত বেশি ট্রিপ, তত বেশি টাকা। মালিকের লাভ চালকের লাভ। আর মাঝখানে মহাসড়কে বাড়ে মৃত্যুর মিছিল।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউট (এআরআই) এর পরিচালক অধ্যাপক ড. মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ‘মুনাফার লোভেই মালিক কম দামে ফিটনেসবিহীন গাড়ি রাস্তায় নামায়। ওই গাড়ি চালাতে সে কোনোভাবেই দক্ষ ড্রাইভার খুঁজবে না। সে খুঁজবে কে তাকে দিনের চুক্তির টাকা দেবে। কে তাকে বেশি ট্রিপ দেবে। তাই চালকদের দায়ী করার আগে আমাদের মালিকদের নিয়ে ভাবতে হবে। তাদের দায়িত্বশীলতা এবং আইনের মধ্যে আনতে হবে।’

রাজধানীর সড়কগুলোতে এমন দৃশ্য কারো অচেনা নয়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান এ আই মাহবুব উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘মালিকদের নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে না। ট্রিপ অনুযায়ী অথবা নির্দিষ্ট পরিমাণ দৈনিক টাকা দেওয়ার ভিত্তিতে চালকদের হাতে গাড়ি দিয়ে দেয়াই সড়ক দুর্ঘটনার মূল কারণ। চালকরা যেহেতু নির্দিষ্ট বেতন পাননা তাই তারা বেশি ট্রিপ মেরে বেশি টাকা আয় করতে চান। তার তো পরিবার আছে। তাকে তো টিকে থাকতে হবে। ফলে তার ঘুমানোর সুযোগ কম থাকে। ক্লান্ত শরীর নিয়ে গাড়ি চালায়। মালিকরা বেশি মুনাফার লোভে চালকদের এটা করতে বাধ্য করে।’

তিনি আরো বলেন, ‘এখন এই মালিকরা রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তাদের কেউ সংসদ সদস্য অথবা তারা আমলা বা পুলিশের লোক। ফলে আইন করে পরিবহণ ব্যবস্থাকে শৃঙ্খলায় আনা কঠিন। তারা মনে করে, তাতে তাদের ব্যবসা কমে যাবে। কিন্তু পরিবহণ ব্যবসায় শৃঙ্খলা আনলে তাদের মুনাফা কমবে না, বরং বাড়বে, এটা তাদের বোঝাতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা। কারণ সংসদে এখন ৭০ ভাগের বেশি ব্যবসায়ী। তাই তারা না চাইলে হবে না। আমাদের উচিত হবে তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা।’

অন্যান্য কারণ ও পরিসংখ্যান
সড়ক এবং গণপরিবহণ নিয়ে কাজ করে এ রকম প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেক গবেষণা আছে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে। তারা বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার কিছু সাধারণ কারণ নির্ণয় করেছেন। এর মধ্যে আছে: ১. ভাঙাচোরা এবং ত্রুটিপূর্ণ ও অপরিকল্পিত সড়ক, ২. ফিটনেসবিহীন যানবাহন, ৩. চালকদের অদক্ষতা ৪. মাদকাসক্তি ও চলন্ত অবস্থায় মোবাইল ফোন ব্যবহার, ৫. বেপরোয়া গতি এবং ৬. ট্রাফিক আইন সম্পর্কে অজ্ঞতা। এছাড়া যাত্রী ও পথচারীদের অসতর্কতা, মোবাইল বা হেডফোন ব্যবহার, রাস্তায় ফুটপাত না থাকার কারণেও দুর্ঘটনা ঘটে।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য মতে, ২০১৭ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৭,৩৯৭ জন। আহত হয়েছেন ১৬ হাজার ১৯৩ জন। ২০১৭ সালে ৪ হাজার ৯৭৯টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। তারা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদন তৈরি করেছে। তাদের হিসাবে, ২০১৬ সালে ৪ হাজার ৩১২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৬ হাজার ৫৫ জন নিহত ও ১৫ হাজার ৯১৪ জন আহত হয়েছিল। আগের বছরের তুলনায় ২০১৭ সালে সড়ক দুর্ঘটনা বেড়েছে ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ। নিহত ২২ দশমিক ২ শতাংশ এবং আহত ১ দশমিক ৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৭ সালে আহতদের মধ্যে হাত-পা বা অন্য কোনো অঙ্গ হারিয়ে পঙ্গু হয়েছেন ১ হাজার ৭২২ জন। খবর ডয়চে ভেলের।

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here