বাংলাদেশে চলমান মাদকবিরোধী অভিযানে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ শতাধিক নিহত ও সহস্রাধিক মানুষকে আটক বা গ্রেফতারের বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো এরইমধ্যে উদ্বেগ জানিয়েছে। অনেকেই বরছেন, বন্দুকযুদ্ধের নামে বাংলাদেশে ঢালাওভাবে বিচারবর্হিভূত হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তবে এবার ব্রিটিশ পত্রিকা গত শুক্রবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দাবি করেছে, বাংলাদেশে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডগুলোকে আড়াল করার জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে সরকারের মাদকবিরোধী যুদ্ধ। টেলিগ্রাফের তিন সাংবাদিক বেন ফার্মার, সুজানা স্যাভেজ এবং নিকোলা স্মিথ প্রতিবেদনটি লিখেছেন।

প্রতিবেদনের শুরুতেই উঠে আসে চট্টগ্রামে বিরোধীদলীয় রাজনৈতিক কর্মী হাবিবুর রহমানের মৃত্যুর ঘটনা। এতে বলা হয়, গত মাসে হাবিবুর রহমান যখন বাংলাদেশের আধাসামরিক এলিট টাস্কফোর্সের (র‌্যাব)’ গুলিতে নিহত হন, তখন বাহিনীর কর্মকর্তারা হাবিবুরের মৃত্যুর ব্যাপারে একটি চমৎকার কাহিনী বর্ণনা করেছিলেন। তারা জানিয়েছিলেন, মাদক ব্যবসায়ী হাবিবুর এবং তার সহযোগীরা তাদের গোপন আস্তানায় কোণঠাসা হয়ে পড়লে প্রথমে তারা পুলিশের উপর গুলি চালায়। পরে বাহিনীর সদস্যরা গুলি ছুড়লে বন্দুকযুদ্ধে সে প্রাণ হারায়।

মাদক ব্যবসার বিরুদ্ধে সরকারের সর্বাত্মক যুদ্ধ ঘোষণার পর এরকম বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা বাংলাদেশে এখন প্রতিদিনকার ঘটনা। ফিলিপাইনে প্রেসিডেন্ট রডরিগো দুতার্তের মাদকবিরোধী যুদ্ধের সঙ্গে সমভাবে তুলনা করা হচ্ছে এই অভিযানকে।

দুই সপ্তাহের অভিযানে ১২০ জনেরও বেশি নিহত হয়েছে এবং কয়েক হাজারকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এটাকে দেশটি ইয়াবা ব্যবসার মূলোৎপাটনের জন্য যুদ্ধ হিসেবে দাবি করছে। এসব মৃত্যুতে অভিযোগ জোরদার হচ্ছে যে, আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের জনসমর্থন আদায়ের জন্যই এই অভিযান চালানো হচ্ছে।

মাদকবিরোধী অভিযানে আটক

প্রধান বিরোধী দলের (বিএনপি) কর্মী হাবিবুর রহমানের পরিবার টেলিগ্রাফের কাছে দাবি করেছে, স্থানীয় মসজিদ থেকে আসার সময় সরকারি বাহিনীর সাদা পোশাকের সদস্যরা তাকে তুলে নিয়ে যায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাবিবুরের একজন নিকটাত্মীয় বলেন, ‘মসজিদ থেকে বের হওয়ার পরই তাকে তুলে নেওয়া হয়। পুলিশি হেফাজতে থাকা অবস্থায়ই তাকে হত্যা করা হয়। সে কোনো মাদক বিক্রেতা বা মাদকাসক্তও ছিল না। এটা এই কারণেই করা হয়েছে যে, সে সরকারবিরোধী রাজনীতির সাথে জড়িত ছিল এবং জমি সংক্রান্ত বিরোধের প্রতিবাদ করেছিল।’

রক্তপাতের মাত্রা দেখে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস হত্যা বন্ধে উদ্বেগ জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে। রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট বলেন, ‘এত সংখ্যক মানুষের মৃত্যুতে আমি অবশ্যই উদ্বেগ প্রকাশ করছি। গণতন্ত্রে সকলের অধিকার রয়েছে যথাযথ প্রক্রিয়ার সুবিধা পাওয়ার। যদি সহিংস সংঘর্ষ চলতে থাকে তাহলে জনগণের কাছে তা গ্রহণযোগ্য হবে না। তবে লক্ষ্য হওয়া উচিত জিরো টলারেন্স। সকলকে বিচারের আওতায় আনা উচিত।’

বাংলাদেশ ৭০ লাখ লোককে মাদকাসক্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যার চার-পঞ্চমাংশই ইয়াবায় আসক্ত। আর এই ইয়াবা উৎপাদন হয় মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী এলাকাতে থাকা কারখানাগুলোতে।

অনেকেই মাদকবিরোধী অভিযানের চরম সমালোচনা করেছেন

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল অবশ্য বিচারবহির্ভূত হত্যার কথা অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘এগুলো বিচারবহির্ভূত হত্যা নয়। আমাদের বাহিনীর সদস্যরা আত্মরক্ষার্থেই অস্ত্র ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে।’

তবে বিভিন্ন সূত্র টেলিগ্রাফকে জানিয়েছে, মাদকের লাভজনক কারাবারের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে রাজনীতি এবং পুলিশের দুর্নীতি। এই অভিযান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নিধন ও যারা সরকারের অনেক কিছু জানে তাদের চুপ করিয়ে দিতে বাহিনীগুলোকে সুযোগ করে দেবে।

মৃত্যু ছাড়াও এই অভিযানে নয় হাজার মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং সাত হাজারেরও বেশিজনকে মোবাইল কোর্টের সংক্ষিপ্ত বিচারে সাজা দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া চলমান অভিযান সম্পর্কে বলেন, ‘এই অভিযান অবৈধ। পুলিশ একই সঙ্গে বিচারক এবং জল্লাদের ভূমিকা পালন করছে। এই অভিযান মাদক বন্ধে খুব অল্পই ভূমিকা রাখবে। কারণ এই ব্যবসা অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছে। বরং সম্ভবত আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রতিপক্ষকে দমনের জন্যই এই অভিযানের ছক আঁকা হয়েছে।’

সুপ্রিম কোর্টের এই আইনজীবী আরও বলেন, ‘নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কিংবা অন্যান্য অজুহাতে ততবেশি লোককে হত্যা করা হবে।’

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here