২০১২ সালের আগস্টে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ইন্ডিপেনডেন্ট টিভির অপরাধ অনুসন্ধানমূলক অনুষ্ঠান ‘তালাশ’-এর মাদক নিয়ে একটি পর্বে কাউন্সিলর একরামুল হককে টেকনাফের ইয়াবা গডফাদার হিসেবে উল্লেখ করে৷

অনুষ্ঠানটির উপস্থাপক মঞ্জুরুল করিম এবং প্রতিবেদক ছিলেন অপূর্ব আলাউদ্দিন৷ প্রতিবেদনে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তালিকার সূত্রের কথা বলে আরও ছয় জনের সঙ্গে একরামকে ‘টেকনাফের ইয়াবা গডফাদার’ হিসেবে দেখানো হয়৷

একরামের ছবি দিয়ে পরিচিতিতে বলা হয়, ‘টেকনাফ যুবলীগের সভাপতি৷ ইয়াবা ব্যবসা করে একরামের যে সম্পদ হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে- গাড়ি ২টি আর টেকনাফে ২টি এবং চট্টগ্রামে ১টি বাড়ি৷ এছাড়া ঢাকায় আছে ফ্ল্যাট।

প্রতিবেদনে টেকনাফের কয়েকজনের বিলাসবহুল বাড়ি দেখিয়ে তাদের বক্তব্য প্রচার করা হলেও একরামের বাড়ি-ঘর দেখানো হয়নি৷ তার বক্তব্যও প্রচার করা হয়নি৷

সেখানেই শেষ নয়৷ দুই বছর পর ২০১৪ সালের আগস্টে যমুনা টেলিভিশন তাদের অপরাধ অনুসন্ধানমূলক অনুষ্ঠান ‘৩৬০ ডিগ্রি’তে মাদক ইয়াবা নিয়ে প্রতিবেদনে আবারো একরামুল হককে মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে দেখায়৷ এই অনুষ্ঠানের উপস্থাপক ছিলেন সুপন রায়৷ আর প্রতিবেদক একই, সেই অপূর্ব আলাউদ্দিন৷ অপূর্ব আলাউদ্দিন ততদিনে ইন্ডিপেনডেন্ট টেলিভিশন ছেড়ে যমুনা টেলিভিশনে যোগ দিয়েছেন৷

‘৩৬০ ডিগ্রি’তে উপস্থাপক ২০১০ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকার কথা বলেন৷ তার কিছু নমুনাও দেখানো হয়৷ আর সেই সূত্রে একরামুল হককে আরো তিনজনের সঙ্গে ইয়াবা ব্যবসায়ী হিসেবে দেখানো হয়৷ ছবি দিয়ে পরিচিতি দেওয়া হয়, কেকে পাড়ার একরামুল হক হিসেবে৷ সঙ্গে এ-ও দাবি করা হয়, এরা সাধারণ অবস্থা থেকে এখন কোটি কোটি টাকার মালিক৷

এই প্রতিবেদনে টেকনাফের মৌলভী পাড়ার আরেকজন একরামুল হকের কথাও বলা হয়৷ দেখানো হয়, তার বিলাসবহুল বাড়ি৷ কিন্তু ইন্ডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের ‘তালাশ’ অনুষ্ঠানের মতো এ অনুষ্ঠানেও কাউন্সিলর একরামের কোনও বাড়ি-ঘর দেখানো বা তার বক্তব্য প্রচার করা হয়নি৷ একরামুলের যে ছবি ‘৩৬০ ডিগ্রি’তে দেখানো হয় সেটাও হুবহু এক৷ একই ছবি এর আগে ২০১২ সালে ‘তালাশ’ অনুষ্ঠানেও দেখানো হয়েছিল৷

যে কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ তুললে, তার পক্ষে কিছু প্রমাণ থাকতে হয়৷ কোনও তথ্য উপস্থাপন বা পরিবেশনের আগে তা যাচাই করাও যে কোনও সংবাদমাধ্যম এবং সাংবাদিকের কাছে প্রাথমিক প্রত্যাশা৷ কিন্তু দুই দুইবার দুই দুইটি প্রতিবেদনে কেন এর ব্যত্যয় হলো তা জানতে চাওয়া হয়েছিল প্রতিবেদক অপূর্ব আলাউদ্দিনের কাছে৷

টেলিফোনে তিনি জার্মানভিত্তিক এ বিশ্বগণমাধ্যম ‘ডয়চে ভেলে’কে বলেন, ‘হ্যাঁ আমি ২০১২ সালে ইন্ডিপেনডেন্ট টিভিতে ওই প্রতিবেদনের প্রতিবেদক ছিলাম৷ পরে আমি যমুনা টেলিভিশনে যোগ দেই৷ সেখানে ২০১৪ সালের প্রতিবেদনটিও আমার করা৷ তবে আমি নেতৃত্ব দিলেও আমরা টিমে ছিলাম মোট ৩ জন৷ তবে দুই জন এখন সাংবাদিকতা পেশা ছেড়ে দিয়েছেন।

প্রতিবদেনে একরামের যে সম্পদের কথা বলা হয়েছে সরেজমিন অনুসন্ধানে তার সত্যতা পেয়েছেন কিনা জানতে চাইলে প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যান অপূর্ব আলাউদ্দিন৷ তিনি বলেন, তখন মোট তিন জনে ভাগ করে কাজ করেছি৷ কেউ একরামের বাড়িতে গিয়েছিল কিনা তা এখন আমার মনে নেই৷ তার বক্তব্য নেওয়া হয়েছে কিনা তা-ও মনে করতে পারছি না।

প্রতিবেদনে একরামের ব্যাপারে সরেজমিন অনুসন্ধানের কোনও কথা নেই, এমনকি দুইটি প্রতিবেদনের একটিতেও তার বক্তব্য নেয়া হয়নি জানানোর পরও অপূর্ব আলাউদ্দিনের একই মন্তব্য, এতদিন পর আমার মনে নেই৷

২০১৪ সালে যমুনা টেলিভিশনের ‘৩৬০ ডিগ্রি’তে আবারো কাউন্সিলর একরামুল হককে ইয়াবা ব্যবসায়ী হিসেবে দেখানো প্রসঙ্গে অপূর্ব আলাউদ্দিন বলেন, এই প্রতিবেদনটিও আমরা ২০১০ সালের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকার ভিত্তিতে দেখাই৷ তবে তখন তালিকা থেকে তার নাম বাদ পড়ে৷ আমরা তাকে এই অনুষ্ঠানে ইয়াবার গডফাদার হিসেবে দেখাইনি৷ ইয়াবার ছোট ব্যবসায়ী এবং সহযোগী হিসবে দেখিয়েছি।

তালিকা থেকে বাদ পড়ার পরও কেন দেখানো হলো তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা প্রতিবেদনে বলেছি, এই তালিকা থেকে কারো কারো নাম বাদ পড়েছে।

একরামের নাম যে তালিকা থেকে বাদ পড়েছে তা প্রতিবেদনে সরাসরি বলা হয়েছিল কিনা জানতে চাইলে অপূর্ব বলেন, না, তা বলিনি৷

কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত পৌর কাউন্সিলর একরামুল হত্যা নিয়ে করা প্রতিবেদনে ডয়চে ভেলে আরও বলছে, একরামুল হকের বিশেষ কোনো সম্পত্তির খবর কেউ জানেন না। অথচ সাত বছর আগে সংবাদমাধ্যমের একটি অংশ প্রচার করেছিল, তিনি নাকি অনেক সম্পত্তির মালিক৷ একরামুলকে তুলে ধরা হয়েছিল ‘ইয়াবা গডফাদার’ হিসেবে৷ এখন কী বলেন তারা?

এদিকে একরাম নিহত হওয়ার পর সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন কক্সবাজার এবং টেকনাফের পৌর মেয়র, স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও সাধারণ মানুষ৷

তাদের মতে, একরাম কোনও ভাবেই মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত নন৷ আর টেকনাফ পৌর এলাকায় একরাম গত ১০ বছরেও নিজের সাধারণ মানের বাড়ির কাজ শেষ করতে পারেননি৷ তিনি পরিবার নিয়ে তার বাবার বাড়িতেই থাকতেন৷

কক্সবাজার পৌর মেয়র এবং জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মাহাবুবুর রহমান চৌধুরী ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কাছে লেখা খোলা চিঠিতে বলেছেন, ‘প্রশাসনকে ভুল তথ্য দিয়ে আজন্ম আওয়ামী লীগ পরিবারের অহংকার টেকনাফ যুবলীগের সাবেক সভাপতি ও পরপর তিনবার নির্বাচিত কাউন্সিলর একরামকে হত্যা করা হয়েছে।

চিঠিতে তিনি আরও বলেন, শুনেছি, ২০০৮ সালে একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তার সঙ্গে একরামের ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব ছিল৷ সেই সময় তার বিরুদ্ধে মাদকের মামলাও হয়েছিল৷ যদিও মামলাটিতে একরাম নির্দোষ প্রমাণিত হয়৷ অথচ সেই মামলার সূত্রে ২০১০ সালে নাম ওঠে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রথম তালিকাতে৷ কিন্তু ওই গোয়েন্দা কর্মকর্তার বদলির পর সেটা সংশোধন হওয়ায় নিরপরাধ এ জনপ্রিয় কমিশনারের নাম হালনাগাদ সব তালিকা থেকে বাদ পড়ে।

কক্সবাজার পৌর মেয়র এবং জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মাহাবুবুর রহমান চৌধুরী তার খোলা চিঠিতে চারটি বিষয় স্পষ্ট করেন- একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তার সঙ্গে ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের কারণে ২০০৮ সালে একরামের বিরুদ্ধে মাদকের মামলা হয়, যাতে তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছিলেন; অথচ ওই মামলার সূত্র ধরে ২০১০ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকায় একরামের নাম ওঠে; গোয়েন্দা কর্মকর্তার বদলির পর হালনাগাদ সব তালিকা থেকে একরামের নাম বাদ পড়ে ও একরাম নিরপরাধ।

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here