মান-অভিমান করে দল ছাড়লেও বিএনপির সঙ্গে এখনও সখ্যতা রয়েছে সাবেক রাষ্ট্রপতি ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী ও কর্নেল অলি আহমদের। আওয়ামী লীগ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর মাহমুদুর রহমান মান্নাও সরকারের সমালোচকদের দলে নিজেকে দাঁড় করিয়েছেন। আর স্বাধীন বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকারের প্রথম আইনমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন গত দুই দশক ধরে চেষ্টা চলিয়ে যাচ্ছেন একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম তৈরির। বেশ কয়েকবার উদ্যোগ নিয়েও তিনি সফল হননি।

এদিকে বছরের শেষে কিংবা ২০১৯ সালের শুরুর দিকে জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যাবেন না বলে গলা ফাটালেও ভেতরে ভেতরে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন বিএনপি নেতারা। নির্বাচনকে ঘিরে পিছিয়ে থাকতে চায় না ছোট দলগুলোও। তাদের টার্গেট অবশ্য বড় দলগুলোর সঙ্গে জোট বেঁধে নির্বাচনে যাওয়া। তবে বদরুদ্দোজার বিকল্পধারা বাংলাদেশ, ড. কামালের গণফোরাম, মান্নার নাগরিক ঐক্যের প্রতি আওয়ামী লীগের তেমন আগ্রহ নেই। নাটাইবিহীন ঘুড়িদের যে তারা দলে টানবে না সেটা এক প্রকার নিশ্চিত। আর বৃহত্তর আন্দোলনের স্বার্থে বিএনপি তাদের পাশে চায়। যদিও গত ১০ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামে এই হেভিওয়েট নেতাদের কাছে পায়নি দলটি।

ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন মহাসচিব। ২০০২ সালে চারদলীয় জোট ক্ষমতায় এলে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদ রাষ্ট্রপতি হিসেবেও সন্মানিত হন তিনি। কিন্তু দলের সঙ্গে মতৈক্য না হওয়ায় সড়ে দাঁড়ান। গড়ে তুলেন বিকল্পধারা নামে নতুন রাজনৈতিক দল। ২০০৬ সাল থেকে বিএনপির ওপর দুর্যোগ নেমে এলেও তাকে আর কাছে পাওয়া যায়নি। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে এক মঞ্চে আর কখনো দেখা যায়নি বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে।

খালেদা জিয়া এখন জেলে। তাই বিএনপির পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন ৮৮ বছর বয়সী অভিজ্ঞ এই রাজনীতিক। সম্প্রতি এক মঞ্চেই দেখা গেলো বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে। মূলত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ২৯ মে সংবাদ সম্মেলনে সাবেক এই রাষ্ট্রপতিকে ‘বদু কাকা’ বলে সম্বোধন করায় নতুন করে আলোচনায় আসেন।

তবে বিএনপির পাশে থাকলেও বদরুদ্দোজা চৌধুরী আর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথা আনছেন না। বরং সাহসী নির্বাচন কমিশন গঠনের দাবি জানিয়েছেন। বিকল্পধারার সভাপতি সম্প্রতি বলেছেন, ‘জাতীয় নির্বাচনের ১০০ দিন আগে সংসদ ভেঙে দিতে হবে। নির্বাচনের তামাশা দেখতে চাই না। সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে হবে নির্বাচনে। সাহসী নির্বাচন কমিশন গঠন করতে হবে। জাতীয় সরকার গঠন করতে হবে।’ সামনের নির্বাচনের পর দেশের মানুষকে শান্তি দিতে ৫ বছরের জন্য এই জাতীয় সরকার গঠনের দাবি তার। এই প্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগ নেতাদের দাবি, বদরুদ্দোজা আসলে ছলেবলে সরকারে নিজের জায়গা নিশ্চিত করতে চাইছেন।

গণফোরাম সভাপতি ও জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার আহ্বায়ক ড. কামাল হোসেনও কোনো কূল খুঁজে পাননি। বারবার একটি শক্তিশালী ঐক্য গড়ে তোলার কথা বললেও পালে হাওয়া লাগেনি। এখনও বক্তৃতা ও গণমাধ্যম নির্ভর রাজনীতি করে যাচ্ছেন এই সংবিধান প্রণেতা। সর্বশেষ গত ৬ মে জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক আলোচনা সভায় সরকারকে উদ্দেশ্য করে ড. কামাল বলেছেন, ‘সবাই এত কথা বলছে, কোন কিছুই তাদের গায়ে লাগে না। এই গায়ে না লাগানো এমন পর্যায়ে চলে গেছে, সেখান থেকে উত্তরণে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।’

জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া গড়ে তুলতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ‘আগামীতে এমন প্রতিনিধি নির্বাচন করবো, যারা হবেন আমাদের সত্যিকারের প্রতিনিধি। যারা টাকা দিয়ে মনোনয়ন কেনেন, তারা যেন আমাদের প্রতিনিধি না হন।’ জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করতে তিনি এখনও কাজ করে যাচ্ছেন। তবে শেখ হাসিনার অধীনে আগামী নির্বাচনে অংশ নিবে কিনা, সে বিষয়ে এখনও সিদ্ধান্ত নেয়নি গণফোরাম।

২০০৬ সালে বিএনপি ক্ষমতা ছাড়ার মধ্যবর্তী সময়ে দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন সাবেক মন্ত্রী কর্নেল অলি আহমদ বীর বিক্রম। গড়েন নতুন দল লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি)। কিছুদিন বদরুদ্দোজা চৌধুরীর সঙ্গে এক হয়ে দল চালালেও পরে আলাদা হয়ে যান। যুক্ত হন বিএনপি জোটে। তবে বর্তমানে রাজনীতি থেকে তিনি কিছুটা দূরে।

অলির ঘনিষ্ঠরা জানান, এখন ধর্ম কর্মেই সময় কাটাচ্ছেন তিনি। বেশির ভাগ সময় কাটে ঢাকার ডিওএইচএসের বাসায়। মাঝে মধ্যে নিজ শহর চট্টগ্রামে যান। আগামী নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নিলে জোটের শরীক দল হিসেবে এলডিপির অংশগ্রহণের সম্ভাবনাও ক্ষীণ।

এক সময়কার ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান মান্না ছাত্রলীগ থেকে জাসদ, বাসদ, জনতা মুক্তি পার্টি হয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছিলেন। তবে ২০০৭ সালে ওয়ান-ইলেভেনের মাইনাস ফর্মূলার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে দল থেকে ছিটকে পড়েন। এরপর থেকে সরকারের সমালোচনা এবং প্রগতিশীল ব্যানারে নিজের অবস্থান তৈরি করেন মান্না।

নাগরিক ঐক্য নামের একটি সংগঠনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন এখন। এরই মধ্যে বিএনপি নেতা সাদেক হোসেন খোকার সঙ্গে তার আলাপচারিতার একটি অডিও ফাঁস হয়ে যায়। যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশৃঙ্খলা তৈরির পরিকল্পনার অভিযোগে জেলও খাটতে হয় দীর্ঘদিন। জেল থেকে বেরিয়েও খুব বেশি সুবিধা করতে পারেননি তিনি। ড. কামাল ও বদরুদ্দোজা চৌধুরী ছাড়া পাশে খুব বেশি কাউকে পাননি। তার কর্মকাণ্ডে সহমত প্রকাশ করলেও সরাসরি মান্নার সঙ্গে রাজনীতিতে যাবেন কিনা, সেটিও খোলাসা করেননি কেউ। ফলে এখন সভা-সেমিনার করেই সময় কাটছে আওয়ামী লীগের এই সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদকের। তবে এও শোনা যাচ্ছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি থেকে সরে গিয়ে আগামী নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে মান্নার।

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here