নির্বাচন সামনে। তাই ভারতবিরোধী মনোভাব ত্যাগ তরে দেশটির সঙ্গে আবার সুসম্পর্ক তৈরির মিশন নিয়ে কাজ শুরু করেছে বিএনপি। এরইমধ্যে ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির কয়েকজন প্রভাবশালী নেতার সঙ্গে দেখা করে কথাবার্তাও বলে এসেছেন বিএনপি নেতৃবৃন্দ। বাংলাদেশে আগামীতে সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে ভারতের একান্ত সহযোগিতা প্রয়োজন বলেও বিজেপি নেতাদের জানিয়েছেন বিএনপির নেতারা।

গত শুক্রবার ভারতের প্রভাবশালী দৈনিক দ্য হিন্দুতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বিএনপি নেতাদের এই মিশনের কথা জানা গেছে। প্রতিবেদনে জানানো হয়, বেজেপি নেতাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল আওয়ার মিন্টু এবং আন্তর্জাতিক বিষয়ক সহ-সম্পাদক হুমায়ুন কবির এখন ভারত অবস্থান করছেন। মূলত আওয়ামী লীগকে মোকাবেলা করতেই বিএনপি ভারতের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্ক তৈরির এই মিশনে রয়েছে।

বাংলাদেশে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি ভারত সফর করলে সেটা ঘটা করে জানিয়ে করা হয়। কিন্তু বিএনপির প্রতিনিধি দল পাঠানোর বিষয়টি গণমাধ্যমে আসেনি, বিএনপির নেতারাও এই বিষয়ে কিছুই বলেননি।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাংলাদেশ ভবন উদ্বোধন এবং সম্মানসূচক ডি লিড ডিগ্রি গ্রহণে পশ্চিমবঙ্গ সফর নিয়ে বিএনপির নেতারা টিপ্পনি কেটেছেন। তারা বলেছেন, ক্ষমতায় টিকে থাকতে এই সফর।

অথচ প্রধানমন্ত্রী ভারত থেকে ফেরার দুই সপ্তাহের মধ্যেই সে দেশটিতে অনেকটাই গোপনে গেলেন বিএনপির তিন নেতা।

দ্য হিন্দু জানিয়েছে, এই সফরে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ-অনুযোগ জানিয়ে এসেছেন বিএনপি নেতারা। বিএনপি নেতারা বলছেন, তারা ভারতের সঙ্গে ‘নতুন’ সম্পর্কে আগ্রহী। তবে এই ‘নতুন’ সম্পর্ক বলতে কী বোঝায় সে বিষয়ে কিছু লেখা হয়নি।

ভারতের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের যে কোনো বিষয়ে বিএনপি বরাবরই সন্দিহান। এমনকি ৯০ দশকের শেষ দিকে ঢাকা-কলকাতা রুটে বাস চালুর পর সার্বভৌমত্ব চলে যাবে অভিযোগ করে ৭২ ঘণ্টার হরতাল ডেকেছিল দলটি। আবার ২০১৩ সালের মার্চে ভারতীয় রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির ঢাকা সফরের সময় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া তার সঙ্গে সাক্ষাৎ বাতিল করেন জামায়াতের হরতালে নিরাপত্তাহীনতার কথা বলে। এই বিষয়টিও ভারত ভালোভাবে নেয়নি।

আবার ভারত মনে করে, বিএনপি সরকারের আমলে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদী বিভিন্ন গোষ্ঠীর আস্তানা তৈরি হয়েছিল বাংলাদেশে। যারা এখান থেকে গিয়ে ভারতে নানা আক্রমণ চালিয়েছে। উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় সাত রাজ্যের বিচ্ছিন্নতাবাদী বহু নেতাকে শেখ হাসিনা সরকার ভারত সরকারের হাতে তুলে দিয়েছে-এটি প্রকাশ্যেই জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

তবে বিএনপির প্রতিনিধি দলের সদস্য ও তারেক রহমানের উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির ‘দ্য হিন্দু’কে বলেন, ‘আমরা পেছনের সব ভুলে সামনে এগোতে চাই। আর আশি নব্বই দশকের রাজনীতি এখন অতীত।’

এছাড়াও শেখ হাসিনা বাংলাদেশে একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চান বলেও দেশটির নেতৃস্থানীয়দের কাছে বিএনপি নেতারা অভিযোগ করেছেন বলে জানিয়েছে দ্য হিন্দু। দুনীতির মামলায় কারাদণ্ড পাওয়া চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে কারাগার থেকে মুক্ত করার পাশাপাশি ডিসেম্বরের জাতীয় নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদি সরকারের সহযোগিতাও চেয়েছেন তারা।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ তাদের বড় প্রতিবেশীকে গঠনমূলক ভূমিকায় দেখতে চায়। বাংলাদেশে একটি ভুল ধারণা রয়েছে যে, ভারত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের সকল কাজকে সমর্থন করে। যদি বাংলাদেশে গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়, তাহলে যে কেউ জয়ী হবে। এটি ভারতের জন্যও একটি জয়।’

দ্য হিন্দু বলেছে, ঐতিহাসিক কারণেই আওয়ামী লীগের সঙ্গে সুসম্পর্ক ভারতের। কারণ, ১৯৭১ সালের মু্ক্তিযুদ্ধে শেখ হাসিনার পিতা এবং জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান এবং মুক্তিবাহিনীকে সমর্থন করেছিলো ভার। পরে ১৯৭৭-১৯৮১ সাল পর্যন্ত খালেদা জিয়ার স্বামী জিয়াউর রহমান বাংলাদেশকে ইসলামপন্থী পথে পরিচালিত করেছিলেন। যা অনেকটা পাকিস্তানি সামরিক শাসনের মতো ছিল।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৪ সালে বিএনপি নির্বাচন বয়কট করে। সে সময় থেকেই তারা ক্ষমতা হারানোর ফলে সংগ্রাম করছে। এরই মধ্যে হাসিনা সরকার বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ৭৮ হাজার মামলা করেছে। সেকথা তুলে ধরে সেসময়ে বিএনপি নেতারা অভিযোগ করে বলেছিলেন, এসব মামলায় প্রায় ১৮ লাখ নেতাকর্মীকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। অনেককে গ্রেফতার করা হয়েছে।

দ্য হিন্দুকে খসরু বলেন, বাংলাদেশে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন না হলে এবং গণতন্ত্র অনুপস্থিত থাকলে অনেকগুলো গোষ্ঠী তৈরি হবে, যারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হবে। তাই বাংলাদেশে নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের অধীনে নিরপেক্ষ ও স্বাধীন নির্বাচনের ক্ষেত্রে একমাত্র উপায় হলো ভারতকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নেতৃত্ব দেওয়া এবং পর্যবেক্ষণ করা।’

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here