পেলে তখন তারুণ্যে ভরপুর। বয়স মাত্র ১৭। জাতীয় দলে ডাক পাওয়ার খবর বিশ্বাস করতে পারেননি। ১৯৫৭ সালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে অভিষেক ম্যাচে গোল করে রেকর্ড গড়েছিলেন তিনি। এক বছর পর বিশ্বকাপ অভিষেক সুইডেনে। তাতেও বাজিমাত। জিতলেন প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ ট্রফি। ৩০ বছরের মধ্যে পেলের বিশ্বকাপ ট্রফির সংখ্যা তিনটি (১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৭০)।

মজার বিষয় হলো, বয়স ত্রিশের আগেই ব্রাজিলের আলোচিত ফুটবলাররা স্বা পেয়েছেন বিশ্বকাপের। রোনালদো, রোনালদিনহো কিংবা রোমারিও। এই নিয়ম মানলে এবার শিরোপার জেতার পালা নেইমারের। তার বয়স এখন ২৬।

কাতার বিশ্বকাপে নেইমারের বয়স দাঁড়াবে ৩০ এ। তারুণ্য বলতে যা বোঝায়, তাতে কিছুটা ভাটা পড়বে। বরং যুদ্ধে যাওয়ার এটাই উৎকৃষ্ট সময়। যা মানছেন নেইমার, সঙ্গে গোটা ব্রাজিলিয়ান শিবির। ২০১৪ ঘরের মাঠে বিশ্বকাপে ব্রাজিলের প্রত্যাশা ছিল আকাশচুম্বি। পরিচিত পরিবেশ, নেইমারের উত্তুঙ্গ ফর্ম; সব মিলিয়ে স্বপ্নটা ছিল বেশ চওড়া। এবার ‘হেক্সা’ (ছয়টি শিরোপা) হয়েই যাচ্ছে, এমন ভাবনায় বুদ ছিল পেলের উত্তরসূরীরা। কিন্তু হয়নি। সেমিফাইনালের ম্যাচটি বরং বিয়োগান্তক রূপ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ‘মিনেইরাজো’ নামে।

ঘরের মাঠ বলেই বাড়তি বিশ্বাস ছিল। তবে ব্রাজিলের সেই দলটি ছিল বড়ই নেইমারকেন্দ্রিক। নেইমার নেই মানে যেন, কিছুই নেই। যা ব্রাজিলের ফুটবলের জন্য বড়ই বেমানান। তাই হয়েছিল সেবার। কোয়ার্টার ফাইনালে কলম্বিয়ার হুয়ান জুনিগার বাজে ট্যাকলে কুকরে ওঠেন নেইমার। প্রিয় ফুটবলারের মেরদণ্ডের আঘাত যেন সব ব্রাজিলিয়ানরে বুকে শেল হয়ে বিঁধেছিল। সেমিতে খেলতে পারেননি নেইমার। পারেনি ব্রাজিলও। মানসিক ভাবে ভেঙে পড়া সেলেকাওদের পর্যদুস্ত করে ফাইনালের টিকিট পায় জার্মানি। স্কোর লাইন ছিল বিস্ময়কর, সঙ্গে লজ্জারও, ৭-১।

আশার কথা, সেই ব্রাজিল আর এবারের ব্রাজিলের মধ্যে রাজ্যের তফাত। নেইমার গত চার বছরে হয়েছেন আরও পরিণত। ড্রিবলিং, শুটিং আর ফুটবলের কারিকুরিতে এসেছে বাড়তি ছন্দ। সঙ্গে সতীর্থ হিসাবে পাশে পাচ্ছেন তুমুল ফর্মে থাকা জেসুস, ফিরমিনো, কৌতিনহোদের। আর ডাগ আউটে যিনি মনস্তাত্বিক কৌশল আটবেন, সেই তিতে তো আরও প্রেরণার উৎসব। অসুন্দর ফুটবলকে হটিয়ে তিনি জাগিয়েছেন জোগো বনিতা (সুন্দর ফুটবল)। ঠিক যেন ১৯৭০ সালের মতো। এবারের জার্সির ঔজ্জল্যও ঠিক সত্তরের মতো।

নেইমারদের বড় উজ্জ্বীবনের মন্ত্র কোচ তিতেই। নামের মধ্যে তিক্ততার রেশ থাকলেও সুন্দর ফুটবলের জয়গানই তার লক্ষ্য। গোছানো ফুটবলের মধ্যে দাপুটে জয়ের মিশেল। যা ব্রাজিলকে করেছে আরও শাণিত। আর সেটা বিশ্বকাপ বাছাই পর্ব থেকেই শুরু। লাতিন আমেরিকা অঞ্চলে এক তৃতীয়াংশ শেষে ব্রাজিলকে ছয় নম্বরে রেখে বিদায় নিয়েছিলেন জোগা বনিতা থেকে দূরে চলে যাওয়া কোচ কার্লোস দুঙ্গা। তিতে আসার পরই ব্রাজিল শিবের মিষ্টির সুবাতাস। ছয় নম্বর থেকে এক নম্বরে। চার ম্যাচ হাতে রেখে সবার আগে রাশিয়া বিশ্বকাপের টিকিট পায় ব্রাজিল।

সেখান থেকেই তিতের জনপ্রিয়তার শুরু। এখন পর্যন্ত তার অধীনে ১৯ ম্যাচ খেলেছে ব্রাজিল। হার একটি, আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে প্রীতি ম্যাচে। শুধু আক্রমণ নয়, রক্ষণেও অটল সেলেকাও শিবির। এই ১৯ ম্যাচে মাত্র পাঁচটি গোল হজম করে তারা।

বিশ্বকাপের আগে নেইমারের চোট ছিল আলোচনায়। কিন্তু চোটকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ছন্দে ফিরেছেন তিনি। দুটি ম্যাচেই গোলের দেখা পেয়েছেন রোমারিওকে স্পর্শ করা নেইমার যা জুনিয়র। যদিও পুরোপুরি ফিট তাকে বলা যাচ্ছে না। তবে কোচের আশাবাদ, ফিট হয়েই মাঠে নামবেন নেইমার। যারা কুসংস্কার মানেন, বিশ্বকাপের আগে নেইমারের চোট অনেকের মতো মঙ্গলজনকই। ইতিহাস ঘাটলে তা যেন আরও স্পষ্ট। বিশ্বকাপের আগে ইনজুরি যেন সুপ্রসন্ন ভাগ্যের ইঙ্গিত দেয়। ইনজুরি নিয়ে অভিষেক বিশ্বকাপ জিতেছিলেন পেলে। ১৯৫৮ সুইডেন বিশ্বকাপের আগে চোটে পড়েছিলেন ফ্রান্সের জাস্ট ফন্টেইন। সেমিতে পেলের হ্যাটট্রিকে ব্রাজিলের কাছে তার দল হারলেও এক অমর কীর্তির মালিক তিনি। এই বিশ্বকাপে ১৩ গোল করে জিতেছিলেন গোল্ডেন বুট। এক বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড এখনও ফন্টেইনের অধীনে।

দূরে কেন। কাছেই আছে অনেক উদাহরন। ২০০২ বিশ্বকাপের আগে চোটের শিকার রোনালদো। যেতে হয়েছিল ডাক্তারদের ছুরি-কাচির নিচে। কিন্তু বিশ্বকাপে ফিরেই রোনালদো কী করেছিলেন, তা সবার জানা। বিশ্বকাপ ট্রফির সঙ্গে ৮ গোল করে গোল্ডেন বুট জয়। তারপর থেকে ব্রাজিল আর জেতেনি বিশ্বকাপ। আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জেতেনি ৩২ বছর, ব্রাজিলের অপেক্ষা ১৬ বছরের।

শিরোপা জয়ের রেকর্ড বিস্তৃত করতে নেইমারে সওয়ার ব্রাজিল সমর্থকরা। চাপ সামলে ভক্তদের আশ্বস্ত করছেন নেইমারও, ‘ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন দেখে আসছি। এটাই আমার লক্ষ্য (চ্যাম্পিয়ন)। খুব করে চাইছি, এবারের বিশ্বকাপটা যেন আমার হয়।’

শিরোপা জেতার লক্ষ্যের পেছনে আরও একটি কারণ আছে নেইমারের। এবার ব্রাজিল চ্যাম্পিয়ন হতে না পারলে বিয়েটাই ভেস্তে যেতে পারে নেইমারের। ছয় বছর ধরে নেইমারের প্রেম যার সঙ্গে, সেই ব্রাজিলিয়ান মডেল ব্রুনা মারকেজিন সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, বিশ্বকাপ না জিততে পারলে নেইমারকে বিয়ে করবেন না তিনি। অপেক্ষা করতে হবে আরও চারটি বছর।

কী সাংঘাতিক শর্ত! তবে বিষয়টি রসিকতা হলেও, নেইমার কিন্তু সিরিয়াস। বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন কে না হতে চায়। এর উপর ঘরের মানুষের প্রেমময় প্রচ্ছন্ন হুমকি। সব মিলিয়ে নেইমারের চোখ এক ঢিলে দুই পাখি। হেক্সার আনন্দে উন্মাতাল হোক গোটা ব্রাজিল, সঙ্গে ব্রুনা মারকেজিনও, পারবেন তো নেইমার?

-তাসনিয়া প্রিয়ন্তী

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here