ঈদের ঠিক আগ মুহূর্তেই প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় চট্টগ্রামের চার উপজেলায় অন্তত ১০ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। অনেক জায়গায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। ভেসে গেছে ঘরবাড়ি, ফসলের ক্ষেত, পুকুরের মাছ।

ভয়াবহ বন্যাকবলিত উপজেলাগুলো হলো ফটিকছড়ি, রাউজান, হাটহাজারী ও রাঙ্গুনিয়া। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বন্যাকবলিত হয়েছে ফটিকছড়ি উপজেলা। এই উপজেলার প্রায় সবগুলো ইউনিয়ন পানির নিচে তলিয়ে রয়েছে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, ফটিকছড়ি উপজেলার ১৪টি ইউনিয়ন পরিষদ এবং দুটি পৌরসভার প্রায় সব এলাকা এখন বন্যাকবলিত। গত তিনদিন ধরে টানা বর্ষণের ফলে এ অবস্থা দেখা দিয়েছে। তবে মঙ্গলবার রাত থেকে বৃষ্টি থামায় পানি এখন একটু কমতির দিকে।

এর আগে উপজেলার প্রধান নদী হালদা, ধুরুং খান, সর্তাখান, বারমাসিয়া, তেলপারই, মন্দাকিনী, ফটিকছড়ি প্রভৃতি নদী ও খালের পানি উপচে পড়ে সমগ্র উপজেলা তিন থেকে ১০ ফুট পানির নিচে তলিয়ে যায় গত সোমবার রাত থেকে। এছাড়া হালদা নদী, ধুরুংখাল এবং সর্তা খালের একাধিক স্থানে নদীর পাড় ভেঙ্গে পানিতে তলিয়ে গেছে।
হালদার ভাঙনে পুরোপুরি ধসে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে নাজিরহাট-কাজির হাট সড়ক। ধসে পড়েছে নাজিরহাট-মাইজভান্ডার সড়ক। উপজেলার অন্যতম বাণিজ্য কেন্দ্র নাজিরহাট বাজার, উপজেলা সদর বিবিরহাট, আজাদী বাজার, নারায়ণহাট বাজার, দাঁতমারা, কাজিরহাট, বৃন্দাবনহাট প্রভৃতি বাজার পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এসব বাজারের কোটি কোটি টাকার মালামাল পানিতে ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন।

এছাড়া চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি সড়কের নাজিরহাট ঝংকার মোড় থেকে বারৈয়ারহাট পর্যন্ত, নাজিরহাট-মাইজভান্ডার সড়ক পুরোটাই, ফটিকছড়ি-হেঁয়াকো সড়কের বৃন্দাবনহাট থেকে কাজিরহাট পর্যন্ত এবং একই সড়কের নারায়নহাট থেকে শান্তিরহাট পর্যন্ত এলাকা তিন থেকে ছয় ফুট পানির নিচে ডুবে থাকায় মঙ্গলবার সকালের পর থেকে এসব সড়কে সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে।

এদিকে উপজেলার ১৪ ইউনিয়ন ও পৌরসভার ৮টি ওয়ার্ড ব্যাপকভাবে বন্যা কবলিত। বাড়িঘরে, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়ে পড়েছে। ভেঙ্গে পড়েছে বহু কাঁচা বসতঘর। উপজেলার ২ লাখেরও বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ে। ভেসে গেছে শত শত পুকুরের মাছ। ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে শত শত মুরগির খামার। এছাড়া ডাবুয়া, সর্তা, খাসখালী ও বেরুলয়া খালের অসংখ্য স্থানে বাঁধ ভেঙ্গে পৌরসভার ১ থেকে ৮ নম্বর ওয়ার্ড এবং চিকদাইর, হলদিয়া, ডাবুয়া ইউনিয়নের প্রত্যেক এলাকা তলিয়ে যায়। উপজেলা সদরের ফকিরহাট এবং রাঙামাটি সড়কের বিভিন্ন স্থান প্লাবিত হয়ে পড়ায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে। বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে উপজেলার হালদা, কর্ণফুলী নদী ও বিভিন্ন খালের পানি। শত শত পরিবার গৃহহীন পড়েছে। উপজেলার সবচেয়ে বেশি বন্যাকবলিত এলাকাগুলো হচ্ছে পৌরসভার ১ থেকে ৮ নম্বর ওয়ার্ড, হলদিয়া, পূর্ব গুজরা, ডাবুয়া, চিকদাইর, সদর রাউজান ইউনিয়ন, বিনাজুরী, নোয়াজিষপুর, গহিরা, পশ্চিম গুজরা, নোয়াপাড়া, উরকিরচর।

ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলায় স্থানীয় সংসদ সদস্য এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বৈঠক করে এবং বন্যাকবলিত এলাকা ঘুরে ত্রান সহয়তা প্রদান শুরু করেছেন। এলাকাবাসীর পাশে রয়েছেন সাংসদ ফজলে করিম, উপজেলা চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্ট এলাকার জনপ্রতিনিধিরা। বন্যার্তদের সহায়তায় রাউজান উপজেলায় তাৎক্ষনিকভাবে ২০ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে রাঙ্গুনিয়া উপজেলার প্রায় ১০টি ইউনিয়ন বন্যা কবলিত হয়েছে। এই উপজেলাতেও প্রায় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে মঙ্গলবার থেকে। উপজেলার চন্দ্রঘোনা, উত্তর রাঙ্গুনিয়া, পোমরা, বেতাগী, মরিয়মনগর, রাজানগর, শান্তিরহাটসহ বিভিন্ন এলাকার হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে ভয়াবহ দুর্যোগময় পরিস্থিতি মোকাবেলা করছেন। স্থানীয় সাংসদ ড. হাছান মাহমুদ , উপজেলা চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী শাহসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বন্যাকবলিত এলাকা ঘূরে ত্রান সহায়তা প্রদান করছেন।

এ ছাড়া চট্টগ্রামের হাটহাজারী, সীতাকুন্ড, বোয়ালখালী, আনোয়ারা, সাতকানিয়া বিভিন্ন উপজেলায়ও বন্যাকবলিত হয়ে লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে আছে।

এদিকে ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে ফেনীতে মুহুরী নদীর বাঁধে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এতে পানি বেড়ে ফেনীর ফুলগাজী ও পরশুরামের ১১ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এ ছাড়া ছাগলনাইয়া, সোনাগাজী ও ফেনী সদর উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।

বুধবার সকাল থেকে মুহুরী নদীর পানি বেড়ে বিপদসীমার ৮০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

**রাজনৈতিক, ধর্মবিদ্বেষী ও খারাপ কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকুন।**

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here